যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেবল বছরের উৎপাদন মোট যোগফলকে আমাদের নজরে রাখি, ততক্ষণ পর্যন্ত পুনরুৎপাদনের বাৎসরিক প্রক্রিয়াটি সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু এই মোট উৎপাদনের প্রত্যেকটি উপাদানকে অবশ্যই এক-একটি পণ্য হিসাবে বাজারে আনতে হবে, এবং ঠিক সেখান থেকেই হয় সমস্যার সূত্রপাত। আলাদা আলাদা মূলধনগুলির এবং ব্যক্তিগত আয়সমূহের চলাচল পরস্পরকে ছেদ করে, পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় এবং সাধারণ স্থান-পরিবর্তনের মধ্যে হারিয়ে যায়। এই ঘটনায় দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে এবং এমন সমস্ত জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে যেগুলির সমাধান খুব দুরূহ। দ্বিতীয় গ্রন্থের তৃতীয় অংশে আমি এই সব তথ্যের আসল তাৎপর্য ব্যাখ্যা করব। ফিজিওক্র্যাট দের এটা একটা বড় কৃতিত্ব যে, তাঁদের অর্থনৈতিক সারণী’-তে (Tebleau economique’) তারাই প্রথম বাৎসরিক উৎপাদনকে এমন আকারে চিত্রিত করতে চেষ্টা করেছিলেন, যে-আকারে তা সঞ্চলন-প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পার হয়ে আমাদের কাছে উপস্থাপিত হয়। [৬]
বাকি বিষয় সম্পর্কে বলা যায়, এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে ধনিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্ব আডাম স্মিথের এই মতবাদটিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়নি যে, উদ্ধত উৎপন্ন-দ্রব্যের সেই অংশ যা রূপান্তরিত হয় মূলধনে, তার সমস্তটাই পরিভুক্ত হয় শ্রমিক শ্রেণীর দ্বারা।
————
১. যেমন ব্যালজাক, যিনি অর্থগৃঃ,তার যাবতীয় রূপ এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অনুশীলন করেছিলেন, তিনি, বুড়ো কুসীদজীবী ‘গবসেক’ যখন পণ্যের মজুদ জমিয়ে তুলতে লাগল, তখন তাকে আঁকলেন যেন সে উপনীত হয়েছে তার দ্বিতীয় শৈশবে।।
২. স্তুপীকৃত স্টক”অ-বিনিময় অতি-জনসংখ্যা। (টমাস করবেট, ‘অ্যান ইনকুইয়ি”ওয়েলথ অব ইনডিভিজুয়ালস’, পৃঃ ১০৪)।
৩. এই অর্থে নেকার বলেন “objets de faste et de somptuosite of which “le temps a grossi l’accumulation and which “les lois de propriete ont rassembles dans une seule classe de la societe.” (Oeuvres de M. Necker, paris and Lausanne, 1789, t ii p. 291 ),
৪. রিকার্ডো, ঐ, পৃঃ ১৬৩, টাকা।
৫. তাঁর লজিক’ সত্ত্বেও জন স্টুয়ার্ট মিল তার পূর্ববর্তী যেসব ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণ করে গেছেন; সেগুলি ধরেন না, যেমন এটিকে ধরেন নি; অথচ এটি এমন একটি বিশ্লেষণ, যা এমনকি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান সম্পর্কে বুর্জোয়া দৃষ্টিকোণ থেকেও সোচ্চাকে সংশোধন দাবি করে। প্রত্যেক ক্ষেত্রে শিষসুলভ গোঁড়ামি নিয়ে তিনি তার গুরুদের চিন্তা ভাবনার বিভ্রান্তিগুলিই আবৃত্তি করে গিয়েছেন। যেমন এখানের “মূলধন নিজেই শেষ পর্যন্ত মজুরিতে পরিণত হয়ে যায়, এবং যখন উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রয়ের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তখন আবার মজুরি হয়ে যায়।”
৬. পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং সঞ্চয়নের বিবরণে অ্যাডাম স্মিথ যে-কোনও. অগ্রগতি করেন নি, তাই নয়, এমনকি তার পূর্বগামীদের তুলনায়, বিশেষ করে, ফিজিওক্র্যাটদের তুলনায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিলেন। পাঠাংশে উল্লিখিত বিভ্ৰমটির সঙ্গে সংযুক্ত সেই সত্য সত্যই বিস্ময়কর গোঁড়া-বক্তব্যটি, যা তিনি দিয়ে গিয়েছেন রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বকে তার উত্তরাধিকার হিসাবে—যে গোঁড়া বক্তব্যটি অনুযায়ী পণ্যের দাম গঠিত হয় মজুরি, মুনাফা (সুদ) ও খাজনা অর্থাৎ মজুরি ও উদ্বৃত্ত-মূল্য নিয়ে। এই ভিত্তি থেকে শুরু করে স্টর্চ সরল মনে স্বীকার করেন, ‘n est impossible de resoudre le prix necessaire dans ses elements les plus simples.’ (Storch : ‘Cours & Economic politique,” Petersb. Edit. 1815, t i, 141, note.) এ এক অপূর্ব অর্থনৈতিক বিজ্ঞান যা ঘোষণা করে যে পণ্যের দামকে তার সরলতম উপাদানসমূহে পর্যবসিত করা অসম্ভব। তৃতীয় খণ্ডে বি) ল ভাগে এই বিষয়টি আবার আলোচিত হবে।
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ –মূলধন ও প্রত্যাগমে (আয়ে) উদ্বৃত্ত-মূল্যের বিভাজন। ভোগ-সংবরণ তত্ত্ব।
পূর্ববর্তী অধ্যায়টিতে আমরা উদ্বৃত্ত-মূল্যকে (বা উদ্বৃত্ত-উৎপন্নকে) গণ্য করেছি কেবল সরবরাহের ভাণ্ডার হিসাবে। এই অধ্যায়টিতে আমরা এ পর্যন্ত তাকে গণ্য করেছি কেবল সঞ্চয়নের ভাণ্ডার হিসাবে। কিন্তু তা প্রথমটিও নয়, দ্বিতীয়টিও নয়; তা একসঙ্গে দুটিই। একটি অংশ ধনিকের দ্বারা পরিভুক্ত হয় আয় হিসাবে, অন্য অংশটি নিয়োজিত হয় মূলধন হিসাবে,[১] হয় সঞ্চয়ীকৃত।
তা হলে উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ যদি নির্দিষ্ট থাকে, এই দুটি অংশের মধ্যে একটি যত বৃহত্তর হবে, অন্যটি হবে তত ক্ষুদ্রতর। Cacteris Paribus, এইগুলির অংশ অনুপাত সঞ্চয়নের আয়তন নির্ধারণ করে। কিন্তু বিভাজনটি সম্পাদিত হয় একক ভাবে ঐ উদ্বৃত্ত-মূল্যের মালিকের দ্বারাই, ধনিকের দ্বারাই। এটা তার বিবেচনা-প্রসূত কাজ। তার দ্বারা আদায়ীকৃত করের যে-অংশটি সে সঞ্চয়ীকৃত করে, সে অংশটি সে বাঁচিয়েছে বলে বলা হয় কারণ সে তা খায়নি, অর্থাৎ সে পালন করেছে ধনিকের ভূমিকা এবং নিজেকে করেছে সমৃদ্ধতর।
মূলধনের, ব্যক্তিত্বায়িতরূপ ছাড়া ইতিহাসে ধনিকের আর কোনো মূল্য নেই, ইতিহাসে স্থান পাবার কোনো অধিকার নেই; লিচনাওস্কির রসালো ভাষায় বলা যায়, যা কোনো স্থান তারিখ পায়নি। এবং ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির জন্য অচিরস্থায়ী প্রয়োজন সাধনে যতটা চাই, ততটাই কেবল তার নিজের অচিরস্থায়ী অস্তিত্বের আবশ্যকতা। কিন্তু যখন সে ব্যক্তিত্বায়িত মূলধন তখন ব্যবহার-মূল্য ও তার বৃদ্ধি সাধনই তাকে কাজে প্রণাদিত করে। মূল্যের আত্ম-সম্প্রসারণ ঘটাবার উদ্দেশ্যে উন্মত্ত তৎপরতায়, সে মানবজাতিকে বেপরোয়া ভাবে বাধ্য করে উৎপাদনের জন্যই উৎপাদন করতে; এই ভাবে সে সমাজের উৎপাদিকা শক্তিসমূহের বিকাশকে সবলে ত্বরান্বিত করে এবং সেই সমস্ত বাস্তব অবস্থার সৃষ্টি করে, একমাত্র যে-অবস্থাসমূহ পারে সমাজের একটি উন্নততর সাপের আসল ভিত্তি গড়ে তুলতে এমন এক উন্নততর সমাজ যেখানে প্রত্যেকটি ব্যক্তির পরিপূর্ণ ও অবাধ বিকাশই হবে অধিনিয়ন্তা নীতি। কেবল ব্যক্তি-রূপায়িত মূলধন হিসাবেই ধনিক শ্রদ্ধাভাজন। ধনিক হিসাবে সেও সম্পদের জন্যই কৃপণের যে-লালসা, তার শরিক। কিন্তু কৃপণের ক্ষেত্রে যা কেবল একটা নিছক খেয়াল, ধনিকের ক্ষেত্রে তাই হল সামাজিক যন্ত্রের ফলস্বরূপ, সে নিজে যে-যন্ত্রের একটি চক্ৰমাত্র। অধিকন্তু, ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের বিকাশের ফলে একটি নির্দিষ্ট শিল্প-সংস্থায় মূলধনের পরিমাণকে নিরন্তর বাড়িয়ে যাবার প্রয়োজন হয় এবং প্রতিযোগিতা প্রত্যেকটি ধনিককে বাধ্য করে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের অন্তর্নিহিত নিয়মগুলিকে বহিঃস্থিত বাধ্যতামূলক নিয়ম হিসাবে অনুভব করত। তা তাকে বাধ্য করে তার মূলধনের নিরন্তর বিস্তার সাধন করতে যাতে তাকে সংরক্ষা করা যায়। কিন্তু বিস্তার সাধন করতে সে পারে না ক্রমবর্ধমান পরিমাণে সঞ্চয়নের মাধ্যমে ছাড়া।
