নতান্ত্রিক সম্পত্তির অবলুপ্তি সাধন করবেন। ‘
৮. মূলধন অর্থাৎ সঞ্চয়ীকৃত সম্পদ, যা মুনাফায় উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হয়েছে। (ম্যালথাস, ঐ)। আয় থেকে সঞ্চিত সম্পদ, যা মুনাফার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাই মূলধন। (আর. জোন্স,‘অ্যান ইন্টেডাকটরি লেকচার অন পলিটিক্যাল ইকনমি’, লণ্ডন, ১৮৩৩, পৃঃ ১৬)।
৯ ‘উক্ত উৎপন্ন বা মূলধনের অধিকারী। (দি সোর্স অ্যাণ্ড রেমিডি অব দি ন্যাশনাল ভিফিকালটিজ। এ লেটার টু লর্ড জন রাসেল, লণ্ডন, ১৮২১)।
১০. সঞ্চিত মূলধনের প্রত্যেকটি অংশের উপরে চক্রবৃদ্ধি হারে সু সমেত মূলধন এমন সর্বগ্রাসী যে, বিশ্বের সমস্ত সম্পদ, যা থেকে আয়ের উদ্ভব ঘটে, তা অনেক কাল আগেই মূলধন বাবদ সুদে পরিণত হয়ে গিয়েছে। (লন, ইকনমি, ১৯ জুলাই ১৮৫১)।
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ —ক্রমবর্ধমান আয়তনে পুনরুৎপাদন সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা।
সঞ্চয়ন বা উদ্বৃত্ত-মূল্যের মূলধনে রূপান্তরণ সম্পর্কে আরো অনুসন্ধানের আগে আমরা চিরায়ত অর্থতাত্ত্বিকদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি বিভ্রান্তিকে পরিষ্কার করে নেব।
উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি অংশের সাহায্যে নিজের পরিভোগের যে পণ্যদ্রব্যাদি ধনিক ক্রয় কৰে, তা যেমন খুব সামান্যই মূল্য উৎপাদন ও সৃজনের উদ্দেশ্য সাধন করে, তার স্বাভাবিক ও সামাজিক প্রয়োজনাদি মেটাবার জন্য সে যে শ্রম ক্রয় করে, তা ঠিক তেমন। সামান্যই উৎপাদনশীল শ্রম হয়। উদ্বৃত্ত-মূল্যকে মূলধনে রূপান্তরিত করার পরিবর্তে সে উল্টোটাই করে—ঐসব পণ্য-দ্রব্য ও ঐ শ্ৰম ক্রয় করে সে তা আয় হিসাবে পরিভোগ বা ব্যায় করে। পুরনো সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত সম্প্রদায়ের অভ্যস্ত জীবন-যাত্রা পদ্ধতির বিরোধিতায় যা পরিচালিত হয়, যেমন হেগেল সঠিক ভাবেই বলেন, “হাতের কাছে যাই পাও, ভোগের কাজে তাই লাগাও” এই নীতির সাধনায় এবং আরো বিশেষ ভাবে যা নিজেকে জাহির করে ব্যক্তিগত পরিচারক পোষণের বিলাসিতায়, বুর্জোয়া অর্থতত্ত্বের পক্ষে চরম গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই মতবাদটি ঘোষণা করা যে, প্রত্যেক নাগরিকের প্রথম কর্তব্য হল মূলধনের সঞ্চয়ন, এবং অবিশ্রান্ত ভাবে প্রচার করা যে, শ্রমিকদের বাবদে যা ব্যয় হয়, তার চেয়ে বেশি তারা এনে দেয়; সুতরাং আরো বেশি সংখ্যায় উৎপাদনশীল শ্রমিক নিয়োগের জন্য তার আয়ের একটা ভাল অংশ ব্যয় না করে, সে যদি গোটা আয়টাই খেয়ে ফেলে, তা হলে সে সঞ্চয় করতে পারে না। অন্য দিকে, অর্থতাত্ত্বিকদের সংগ্রাম করতে হয়েছিল সাধারণের এই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে যা মজুদ করাকে গুলিয়ে ফেলে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে এবং কল্পনা করে নেয় যে সঞ্চিত সম্পদ যাকে তার উপস্থিত আকারে বিনষ্ট করা থেকে অর্থাৎ পরিভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে আর, নয়তো, তা সেই সম্পদ যাকে তুলে রাখা হয়েছে সঞ্চলন থেকে। সঞ্চলন থেকে টাকার বাদ পড়া মানে, সেই সঙ্গে, মূলধন হিসাবে তার আত্ম-সম্প্রসারণ থেকেও বাদ পড়া, অন্য দিকে, পণ্যসম্ভারের আকারে একটা মজুদ জমিয়ে ভোলা হচ্ছে একটা নিরেট ভাড়ামি।[১] বিরাট বিরাট পরিমাণে পণ্যসামগ্রীর পুঞ্জীভবন, হয়, অতি-উৎপাদনের, নয়তো, সঞ্চলন বন্ধ হয়ে যাবার পরিণাম।[২] এটা সত্য যে, এক দিকে ধনী লোকদের ক্রমে ক্রমে পরিভোগর জন্য জমানো জিনিসের স্তূপ[৩], এবং অন্য দিকে, সংরক্ষিত ভাণ্ডার’ (রিজার্ভ স্টক’-এর সংগঠন—এই দৃশ্য জনমানসে দারুণ রেখাপাত করে। এই দ্বিতীয়টি সর্বপ্রকার উৎপাদন-পদ্ধতিরই অভিন্ন ঘটনা; যখন সঞ্চলনের বিশ্লেষণে যাব, তখন এই সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করব। সুতাং চিরায়ত অর্থতত্ত্ব যখন বলে যে, অনুৎপাদনশীল শ্রমের দ্বারা পরিভোগর পরিবর্তে উৎপাদনশীল শ্রমের দ্বারা পরিভোগই হল সঞ্চয়ন-প্রক্রিয়ার একটি চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, তখন তা সম্পূর্ণ সঠিক কথাই বলে। কিন্তু ঠিক এই বিন্দুতেই আবার ভুলগুলিরও সূচনা হয়। উৎপাদনশীল শ্রমিকদের দ্বারা উত্ত-উৎপন্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়, এমন ভাবে সঞ্চয়নকে উপস্থাপিত করা অ্যাডাম স্মিথের কাছে একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার মানে দাঁড়ায় এই যে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের মূলধনীকরণ হচ্ছে কেবল উদ্বৃত্ত-মূল্যকে শ্রমশক্তিতে রূপায়িতকরণ। রিকার্ডো প্রমুখ অর্থতাত্ত্বিকেরা কি বলেন, সেটা দেখা যাক : “এটা বুঝতে হবে যে একটা দেশের সমস্ত উৎপাদনই পরিভুক্ত হয়; কিন্তু সেগুলি কি তাদের দ্বারা পরিভুক্ত হল, যারা একটা মূল্য পুনরুৎপাদন করে, না কি তাদের দ্বারা পরিভুক্ত হল, যারা কোনো মূল্য পুনরুৎপাদন করেনা—এই ব্যাপারটাই কল্পনীয় সমস্ত পার্থক্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যের কারণ হয়ে ওঠে। যখন আমরা বলি যে, আয় সঞ্চিত হল এবং মূলধনের সঙ্গে সংযুক্ত হল, তখন আমরা যা বোঝাই তা হল এই যে, আয়ের যে অংশ মূলধনের সঙ্গে সংযুক্ত হল বলে বলা হয়, সে অংশ উৎপাদনশীল শ্রমিকদের দ্বারা পরিভুক্ত হয়, অনুৎপাদনশীল শ্রমের দ্বারা নয়। মূলধন বর্ধিত হয় অ-পরিভোগের দ্বারা—এর চেয়ে বৃহৎ ভুল ধারণা আর কিছু হতে পারে না।”[৪] “আয়ের যে-অংশ মূলধনের সঙ্গে সংযুক্ত হয় বলে যা বলা হয়, সেই অংশ উৎপাদনশীল শ্রমিকদের পরিভুক্ত হয়” রিকার্ডো, এবং অ্যাডাম স্মিথের পরবর্তী সমস্ত অর্থতাত্ত্বিক যে কথাটার পুনরাবৃত্তি করে চলেন, তার চেয়ে বৃহত্তর ভুল ধারণা আর কিছু হতে পারে না। এই বক্তব্য অনুসারে, সমস্ত উদ্বৃত্ত-মূল্য, যা পরিবর্তিত হয় মূলধনে, তা হয়ে পড়ে অস্থির মূলধন। সুতরাং, এই রকম হওয়া তো দূরের কথা, উদ্বৃত্ত-মূল্য, প্রারম্ভিক মূলধনেরই মত, নিজেকে বিভক্ত করে স্থির মূলধনে এবং অস্থির মূলধনে, উৎপাদনের উপায়ে এবং শ্রমশক্তিতে। শ্রমশক্তিই হল সেই বিশিষ্ট রূপ, যার অন্তরালে অস্থির মূলধন উৎপাদন-প্রক্রিয়া চলাকালে অবস্থান করে। এই প্রক্রিয়াতেই খোদ শ্রমশক্তিই পরিভুক্ত হয় খনিকের দ্বারা যখন উৎপাদনের উপায়গুলি পরিভুক্ত হয় কর্ম-সম্পাদনে অর্থাৎ শ্রমে ব্যাপৃত শ্রম শক্তির দ্বারা। একই সময়ে শ্রম-শক্তি ক্রয়ের জন্য প্রদত্ত-অর্থ রূপান্তরিত হয় অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীতে, যেগুলি পরিভুক্ত হয় “উৎপাদনশীল শ্রমের দ্বারা নয়, “উৎপাদনশীল শ্রমিকের দ্বারা। একটি আমূল বিকৃত বিশ্লেষণের মাধ্যমে অ্যাডাম স্মিথ এই আজগুবি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, যদিও প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত মূলধন বিভক্ত হয় স্থির ও অস্থির অংশে, সমাজের মূলধন কিন্তু নিজেকে পর্যবসিত করে কেবল অস্থির মূলধনে অর্থাৎ ব্যয়িত হয় একান্ত ভাবেই কেবল মজুরি দেবার জন্য। ধরা যাক, একজন কাপড়-কল মালিক ১,০০০ পাউণ্ডকে মূলধনে রূপান্তরিত করে। এক অংশ সে নিয়োগ করে তন্তুবায়দের ক্রয় করতে, বাকি অংশটা উল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ক্রয় করতে। কিন্তু যেসব লোকজনের কাছ থেকে সে উল ও যন্ত্রপাতি কেনে, তারা শ্রমের জন্য মজুরি দেয় কেনার টাকার একটা অংশ দিয়ে, এবং এই ভাবেই চলতে থাকে যে-পর্যন্ত সমগ্র ২,০০০ পাউণ্ডই মজুরি বাবদ খরচ না হয়ে যায়, অর্থাৎ ২,০০০ পাউণ্ড যে-উৎপন্ন-সামগ্রীর প্রতিনিধিত্ব করে, তার সমগ্রটাই উৎপাদনশীল শ্রমিকের দ্বারা পরিভুক্ত না হয়ে যায়। এটা স্পষ্ট যে এই চুক্তিটির গোটা সারমর্মটা নিহিত রয়েছে এই কটি কথার মধ্যে এবং এই ভাবেই চলতে থাকে, যা আমাদের কেবল খুঁটি থেকে থামে ঠেলে দেয়। সত্য কথা এই যে, ঠিক যেখানে সমস্যা দেখা দেয়, ঠিক সেখানেই অ্যাডাম স্মিথ তার অনুসন্ধানের ছেদ ঘটিয়ে দেন।[৫]
