আজকের কর্মরত মূলধন যত দীর্ঘ সময়ক্রমিক পুনরুৎপাদন এবং পূর্ববর্তী সঞ্চয়ন সমূহের মধ্য দিয়েই অতিক্রান্ত হোক না কেন, তা সব সময়েই তার প্রারম্ভিক কুমারীত্ব বজায় রাখে। যত কাল পর্যন্ত বিনিময়ে নিয়মাবলী বিনিময়ের প্রত্যেকটি কার্যে পালিত হয়, তত কাল পর্যন্ত পণ্যোৎপাদনের আনুষঙ্গিক সম্পত্তিগত অধিকারগুলিকে ক্ষুন্ন না করেই, আত্মীকরণের পদ্ধতিটিকে বিপ্লবায়িত করা যায়। সেই সূচনাকালে, যখন উৎপন্ন-দ্রব্যের মালিক থাকে উৎপাদনকারী স্বয়ং, সমমূল্যের বিনিময় অনুসারে যে নিজেকে ধনী করতে পারে কেবল তার নিজের শ্রমের দৌলতে, এবং এই ধনতন্ত্রের কালে যখন সামাজিক সম্পদ ক্রমবর্ধমান হারে পরিণত হয় তাদেরই সম্পদে, যারা ক্রমাগত এবং নিত্য-নোতুন করে অপরের মজুরি-বঞ্চিত শ্রম আত্মসাৎ করতে পারে –এই উভয় কালেই সেই একই অধিকারসমূহ বলবৎ থাকে।
যে মুহূর্তে স্বয়ং শ্রমিক তার শ্রম-শক্তিকে পণ্য হিসাবে অবাধে বিক্রয় করে, সেই মুহূর্ত থেকে এটাই হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী রূপ। কিন্তু কেবল খন থেকেই আবার পণ্যোৎপাদন সাধারণীকৃত হয় এবং উৎপাদনের প্রতিরূপে পরিণত হয়। কেবল তখন থেকেই, প্রথম থেকেই, প্রত্যেকটি উৎপন্ন-দ্রব্য উৎপাদিত হয় বিক্রয়ের জন্য এবং উৎপাদিত সকল দ্রব্য সঞ্চলনের মধ্যে দিয়ে অতিক্রান্ত হয়। কেবল যখন এবং যেখানে মজুরি-এমই ভিত্তিস্বরূপ, তখন এবং সেখানেই পণ্য উৎপাদন নিজেকে আরোপ করে সমগ্র ভাবে সমাজের উপরে, এবং কেবল তখন এবং সেখানেই তা তার সমস্ত লুক্কায়িত সম্ভাবনাগুলিকে উদ্ঘাটন করে দেয়। মজুরি-শ্রমের প্রক্ষেপণ পণ্যোৎপাদনকে ভেজালদুষ্ট করে-এ কথা বলাও যা, পণ্যোৎপাদনকে যদি ভেজালমুক্ত রাখতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই বিকশিত হতে দেওয়া হবে না—সে কথা বলাও তা। যতদূর পর্যন্ত পণ্যোৎপাদন, তার নিজের অন্তর্নিহিত নিয়মাবলীর দরুন, আরো বিকশিত হয় গনতান্ত্রিক উৎপাদনে, ততদূর পর্যন্ত পণ্যোৎপাদনের সম্পত্তি-সংক্রান্ত নিয়মাবলীও পরিবর্তিত হয় ধনতান্ত্রিক আত্মীকরণের নিয়মাবলীতে।[৭]
আমরা দেখেছি, এমনকি সরল পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রেও, সমস্ত মূলধন, তার মূল উৎস যাই হোক না কেন, রূপান্তরিত হয় সঞ্চয়ীকৃত মূলধনে, মূলধনীকৃত উদ্বৃত্ত-মূল্যে। কিন্তু উৎপাদনের প্লাবনে প্রারম্ভে অগ্রিম-প্রদত্ত সমস্ত মূলধনই, প্রত্যক্ষ ভাবে সঞ্চয়ীকৃত মূলধনের সঙ্গে তুলনায় অর্থাৎ মূলধন পুনঃরূপান্তরিত উদ্বৃত্ত-মূল্য বা উদ্বৃত্ত-উৎপন্নের তুলনায়, তা তার সঞ্চয়নকারীর হাতেই কাজ করুক বা অন্যান্যের হাতেই কাজ করুক— পরিণত হয় একটি শূন্যে পরিণীয়মান রাশিতে ( magnitudo evanescens’, গাণিতিক অর্থে) এই থেকেই রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্ব মূলধনকে সাধারণ ভাবে বর্ণনা করে “সঞ্চয়ীকৃত সম্পদ” (রূপান্তরিত উদ্বৃত্ত-মূল্য বা আগম) হিসাবে, যাকে আবার নিয়োগ করা হয় উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন”[৮], এবং ধনিককে বর্ণনা করা হয় “উদ্বৃত্ত-মূল্যের মালিক” হিসাবে।[৯] এটা কেবল এই কথাটাই ভিন্ন ভঙ্গিতে বলা যে, সমস্ত বিদ্যমান মূলধনই হল সঞ্চয়ীকৃত কিংবা মূলধনীকৃত সুদ, কেননা সুদ হল উদ্বৃত্ত-মূল্যেরই একটি ভগ্নাংশ মাত্র।[১০]
————
১. মূলধনের সঞ্চয়ন : আয়ের একাংশ মূলধন হিসাবে নিয়োগ।” (ম্যালথাস, ‘ডেফিনিশনস ইত্যাদি’, কাজেনোভ সংস্করণ, পৃঃ ১১)। “আয়ের মূলধনে রূপান্তর।”
(ম্যালথাস : “প্রিন্সিপলস : ইকনমি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮৩৬, পৃঃ ৩২)।
২. আমরা এখানে রপ্তানি-বাণিজ্যকে আদৌ হিসাবে ধরছিনা, যার সাহায্যে একটি জাতি বিলাসদ্রব্যাদিকে উৎপাদনের উপায়ে বা জীবনধারণের উপকরণে রূপান্তরিত করতে পারে—এবং বিপরীতটাও। সমস্ত রকমের ব্যাঘাতজনক গৌণ ঘটনাবলী থেকে মুক্ত করে, আমাদের অনুসন্ধানের বিষয়টিকে তার স্বয়ংগত সমগ্রতায় পরীক্ষা করে দেখার জন্য, আমরা গোটা বিশ্বকে একটি জাতি হিসাবে গণ্য করব এবং ধরে নেব যে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন সর্বত্রই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং শিল্পের প্রত্যেকটি শাখায় তার অধিকার স্থাপন করেছে।
৩. সিম দির সঞ্চয়ন-সংক্রান্ত বিশ্লেষণের একটা বড় ত্রুটি এই যে, তিনি আয়ের মুলধনে রূপান্তরণ নিয়ে নিজেকে অত্যধিক মাত্রায় তৃপ্ত রেখেছেন অথচ এই কম প্রক্রিয়ার বাস্তব অবস্থাবলী অনুধাবনের চেষ্টা করেন নি।
৪. “Le travail primitif auquelson capital a du sa naissance.” Sismondi 1. c. ed. Paris, t. I., p. 109.
৫. “মূলধন এমকে নিল্লোগ করার আগে শ্রম সুলক্ষনকে সৃষ্টি কৰে।” ই. জি. ওয়েকফিল্ড, ইংল্যান্ড অ্যাও আমেরিকা, কণ্ডন, ১৮৩৩, বিজয় খণ্ড, পৃ ১১।
৬. অপরের শ্রমজাত সামগ্রীতে ধনিকের সম্পত্তি হচ্ছে ‘আত্মীকরণের নিয়মটির সুনির্দিষ্ট ফলশ্রুতি, যার মৌল নীতি কিন্তু ছিল বিপরীত—নিজেকে শ্ৰমজাত সামগ্রীতে প্রত্যেক শ্রমিকের একান্ত স্বত্বাধিকার। (cherbuliez, Richesse ou pauvrete’, Paris, 1848, p. 58; সেখানে অবশ্য, দ্বান্দ্বিক প্রতিবর্তন ঠিক ভাবে ব্যাখ্যাত হয়নি।
৭. সুতরাং, আমরা প্রধোর চালাকিতে বেশ আশ্চর্য বোধ করতে পারি যে, পণ্যোৎপাদনের উপরে ভিত্তিশীল সম্পত্তি-সংক্রান্ত শাশ্বত নিয়মাবলী বলবৎ করে তিনি
