বিনিময়ের নিয়মটি দাবি করে কেবল পরস্পরের সঙ্গে বিনিময়-কৃত পণ্যসমূহের সমতা। গোড়া থেকেই তা ধরে নেয় তাদের ব্যবহার-মূল্যের মধ্যে পার্থক্য এবং তাদের পরিভোগর সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই; পরিভোগ তো শুরু হয় লেন দেনটি সম্পাদিত ও সমাপ্ত হবার পরে।।
অতএব, অর্থের মূলধনে প্রারম্ভিক রূপান্তরণ সম্পন্ন হয় পণোৎপাদনের অর্থনৈতিক নিয়মাবলীর সঙ্গে এবং তজ্জনিত সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা যথাযথ সুসঙ্গতি অনুসারে। যাই হোক, ফল দাঁড়ায় এইঃ
(১) উৎপ-ফলটির মালিক হয় ধনিক, শ্রমিক নয়;
(২) অগ্রিম-প্রদত্ত মূল্য ছাড়াও, এই উৎপন্ন-ফুলটি ধারণ করে উদ্বৃত্ত-মূল্য যার বদলে শ্রমিকের খরচ হয় শ্রম, কিন্তু ধনিকের খরচ হয় কিছুই না, এবং যা তৎসত্ত্বেও ধনিকেরই সম্পত্তি;
(৩) শ্রমিক তার শ্রমশক্তিকে বজায় রেখেছে এবং তা সে নোতুন করে
বিক্রি করতে পারে, যদি একজন ক্রেতা পায়। সরল পুনরুৎপাদন হচ্ছে এই প্রথম কর্মকাণ্ডটিরই সময়ক্রমিক পুনরাবৃত্তি, প্রত্যেক বারেই অর্থ নোতুন করে রূপান্তরিত হয় মূলধনে। সুতরাং নিয়মটি ভাঙা হচ্ছে না। বরং, নিয়মটিকে সক্ষম করা হচ্ছে কেবল নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যেতে। “বিনিময়ের কয়েকটি উত্তরোত্তর কার্য কেবল সর্বশেষটিকে সক্ষম করেছে সর্বপ্রথমটিকে প্রতিফলিত করতে।’ (সিসমদি, “Nouveaux Principes, etc.” পৃ: ৭০)।
এবং তবু আমরা দেখেছি যে, একটি বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হিসাবে দেখলে, এই প্রথম কর্মকাণ্ডটিকে একটি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত চরিত্র দিয়ে ছাপ মেরে দিতে সরল পুনরুৎপাদনই যথেষ্ট। “যারা নিজেদের মধ্যে জাতীয় আয় ভাগাভাগি করে নেয়, তাদের মধ্যে একটি পক্ষ (মজুরেরা প্রতি বছরই নোতুন কাজের দ্বারা তাদের ভাগের উপরে নতুন অধিকার অর্জন করে। অন্যান্যরা (ধনিকেরা) প্রারম্ভে কত কাজের দ্বারা তাদের ভাগের উপরে আগেই অর্জন করেছে চিরস্থায়ী অধিকার (সিম দি, ঐ পৃঃ ১১০ ১১১)। এটা বাস্তবিকই একটা কুখ্যাত ব্যাপার যে, শ্রমই একমাত্ৰ ক্ষেত্র নয় যেখানে জ্যেষ্ঠত্বের অধিকার ভেলকি ঘটায়।
সরল পুনরুৎপাদন যদি সম্প্রসারিত আয়তনে পুনরুৎপাদনের দ্বারা, সঞ্চয়নের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তাতেও কিছু এসে যায় না। প্রথম ক্ষেত্রে ধনিক গোটা উদ্বৃত্ত মূল্যটাকেই বিলাস-ব্যসনে উড়িয়ে দেয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে তার কেবল একটা অংশ পরিভোগ করে, বাকি অংশটা টাকায় রূপান্তরিত করে এবং এই ভাবে তার বুর্জোয়া চরিত্রগুণের প্রমাণ দেয়।
উদ্বৃত্ত-মূল্য ধনিকের সম্পত্তি; তা কখনো অন্য কারো মালিকানায় থাকেনি। যদি সে উৎপাদনের উদ্দেশ্যে তা আগাম দেয়, তা হলে সেই আগাম তার নিজের তহবিল থেকেই আসে, ঠিক সেই দিনটিতে যেদিন সে প্রথমে বাজারে প্রবেশ করল। এই উপলক্ষ্যে উক্ত তহবিল যে তার মজুরদের মজুরি-বঞ্চিত শ্রম থেকে সংগৃহীত হয় হয় এই ঘটনায় তার আদৌ কোনো ইতর-বিশেষ হয় না। যদি মজুরি-‘ক’ যে উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করেছে, তা থেকে মজুর-‘খ’-কে তার মজুরি দেওয়া হয় তা হলে প্রথমত, ‘ক’ সেই উদ্বৃত্ত-মূল্য সরবরাহ করেছিল তার পণ্যের ন্যায্য দাম থেকে একটি হাফপেনিও না-কাটা অবস্থায়, এবং, দ্বিতীয়ত এই লেন-দেনটি নিয়ে ‘খ’-এর কোনো মাথাব্যথা নেই। যা দাবি করে, এবং যা দাবি করার অধিকার তার আছে, তা এই যে ধনিক তাকে তার শ্রমশক্তির মূল্য দেবে। দু জনেই তবু লাভ হচ্ছে, মজুরের লাভ হচ্ছে, কেননা তার শ্রমের ফল সে অগ্রিম পেয়ে যাচ্ছে” (পড়া উচিত। অন্যান্য মজুরের বেতন-বঞ্চিত শ্রমের ফল) “তার নিজের কাজটি সম্পন্ন হবার আগেই (পড়া উচিত। আর নিজের শ্রম ফল প্রসব করার আগেই); এবং নিয়োগ কর্তার (le maitre’) লাভ হচ্ছে, কেননা এই মজুরের শ্রম ছিল তার মজুরির তুলনায় বেশি মূল্যাহ (পড়া উচিত : এই মজুরের শ্রম তার মজুরির তুলনার বেশি মূল্য উৎপাদন করেছিল) (সিসম দি, ঐ পৃঃ ১৩৫)।
আরো নিশ্চয় করে বলা যায়, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম দেখায়—যদি আমরা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনকে তার পুননবীভবনের অব্যাহত প্রবাহের মধ্যে লক্ষ্য করি এবং যদি, ব্যক্তিগত ধনিক এবং ব্যক্তিগত মজুর হিসাবে না দেখে, দেখি তাদের সমগ্রতা, যেখানে ধনিক শ্রেণী এবং মজুর শ্রেণী পাড়ায় পরস্পরের মুখোমুখি। কিন্তু তা করতে গিয়ে আমাদের প্রয়োগ করতে হয় এমন সব মান, যা পণ্যোৎপাদন ব্যবস্থার একেবারে বহির্ভূত।
পণ্যোৎপাদনে কেবল ক্রেতা এবং বিক্রেতা স্বাধীন ভাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয়। যে দিন তাদের সম্পাদিত চুক্তিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, সেই দিনই তাদের সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়। যদি লেনদেনটির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তা হলে ঘটে একটি নোতুন চুক্তি অনুসারে, আগেকার চুক্তিটির সঙ্গে যার কোন সম্পর্কই নেই এবং যা কেবল ঘটনাচক্রে একই বিক্রেতাকে সেই একই ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ ঘটায়।
সুতরাং, যদি পণ্যোৎপাদনকে কিংবা তার একটি সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক নিয়মাবলীর দ্বারা বিচার করতে হয়, তা হলে, আমাদের তা করতে হবে, পূর্ববতী বা পরবর্তী কোনো বিনিময়-ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে, প্রত্যেকটি বিনিময় ক্রিয়াকে আলাদা আলাদা করে। এবং যেহেতু বিক্রয় এবং ক্রয় সম্পূর্ণত দুটি বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে দরাদরির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, সেই হেতু এখানে দুটি সমগ্র সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজার অবকাশ নেই।
