১নং অতিরিক্ত মূলধন যা দিয়ে তৈরি, সেই উদ্বৃত্ত-মূল্যটি যেহেতু প্রারম্ভিক মূলধনের অংশ দিয়ে শ্রমশক্তি ক্রয়ের ফল, যেমকার্যটি সম্পন্ন হয় পণ্য-বিনিময়ের নিয়মাবলীর সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গতি অনুযায়ী, এবং যা, আইনের দৃষ্টিতে, শ্রমিকের দিক থেকে তার নিজের শক্তি সামর্থ্যের এবং অর্থ বা পণ্যের মালিকের দিক থেকে তার নিজের মালিকাধীন মূল্যসমূহের স্বাধীন আদান-প্রদানের অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই ধরে নেয়না; যেহেতু ২নং অতিরিক্ত মূলধনটি ১নং মূলধনেরই ফল-মাত্র এবং সেই কারণে উল্লিখিত শর্তগুলির পরিণতি; যেহেতু প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা লেনদেন অনিবার্য ভাবেই পণ্য-বিনিময়ের নিয়মাবশীর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে, ধনিক শ্রম জয় করে এবং শ্রমিক তা বিক্রয় করে, এবং আমরা ধরে নেব যে তা করে তার আসল মূল্যে, যেহেতু এটা সুস্পষ্ট যে, আত্মীকরণৱ নিয়মাবলী তা ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিয়মাবলী-যে-নিয়মাবলীর ভিত্তি হল পণ্যের উৎপাদন ও সঞ্চলন—সেই নিয়মাবলী তাদের অন্তর্নিহিত ও অমোঘ দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার জন্য পরিবর্তিত হয় তাদের প্রত্যক্ষ বিপরীতে। আমরা শুরু করেছিলাম ‘সমমূল্যের সঙ্গে সমমূল্যের বিনিময়’-এই প্রারম্ভিক কর্মকাণ্ডটি থেকে; সেটা এখন এমনি ভাবে ঘুরে গিয়েছে যে পরিণত হয়ে গিয়েছে মাত্র একটি বাহ্যিক বিনিময়ে। এর কারণ এই যে প্রথমত, শ্রমশক্তির সঙ্গে যে-মূলধনের বিনিময় ঘটে, তা নিজেই অপরের শ্রম-ফলের একটা অংশ, যেমকে আত্মীকৃত করা হয়েছে সম-পরিমাণ প্রতিমূল্য ব্যতিরেকেই, এবং দ্বিতীয়ত, কেবল এই মূলধনই তার উৎপাদকের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হলে চলবে না, তা প্রতিস্থাপিত হতে হবে তার সঙ্গে সংঘোজিত উদ্বৃত্ত সহ। ধনিক এবং শ্রমিকের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কটি পরিণত হয় সঞ্চলনের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত কেবল একটি বাহ্যিক সাদৃশ্যে, কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রূপে—যা উপস্থিত লেনদেনটির আসল প্রকৃতির পক্ষে বহিরাগত এবং যা কেবল তাকে রহস্যময় করে তোলে। শ্রমশক্তির বারংবার পুনরাবর্তিত ক্রয় এবং বিক্রয় এখন কেবল আনুষ্ঠানিক রূপ মাত্র; আসলে যা ঘটে, তা এই: সম-মূল্য ব্যতিরেকেই ধনিক বারংবার অন্যান্যের অতীতের বাস্তবায়িত শ্রমের একটি অংশকে আত্মীকৃত করে, এবং একটি বৃহত্তর পরিমাণ জীবন্ত শ্রমের সঙ্গে তার বিনিময় করে। প্রথমে সম্পত্তির অধিকারকে মনে হত মানুষের নিজের শ্রমের উপরে প্রতিষ্ঠিত অধিকার বলে। অন্ততঃপক্ষে, এই ধরনের একটা কিছু ধরে নেওয়া দরকার ছিল, কেননা কেবল সমান অধিকার-সম্পন্ন পণ্য-মালিকেরাই পরস্পরের মুখোমুখি হত, এবং একমাত্র যে-উপায়টির মাধ্যমে একজন লোক অন্যান্যের পণ্য-সমূহের উপরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারত, তা হল তার নিজের পণ্যসমূহের পরীকরণ; এবং সেগুলির প্রতিস্থাপন করা যেত একমাত্র শ্রমের দ্বারা। এখন, কিন্তু, ধনিকের কাছে সম্পত্তি পরিণত হয়েছে। অন্যান্যে মজুরি-বঞ্চিত শ্রম বা তার ফল আত্মীকরণের অধিকারে এবং শ্রমিকের কাছে তা পরিণত হয়েছে তার নিজেরই উৎপন্ন-ফল আত্মীকরণের অসম্ভব ঘটনায়। যে নিয়মটি বাহ্যতঃ উদ্ভূত হয়েছিল শ্রম ও সম্পত্তির মধ্যে অভিন্নতা থেকে, সেই নিয়মটিরই আবশ্যিক পরিণতি ঘটল শ্রম থেকে সম্পত্তির ভিন্নতাসাধমে।[৬]
অতএব, * ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি যতই পণ্যোৎপাদনের মূল নিয়মাবলীর খোলাখুলি অবাধ্যতা করুক না কেন, তৎসত্ত্বেও কিন্তু এই নিয়মাবলীর লংঘন থেকে নয়, বরং সেগুলির প্রয়োগ থেকেই তার উদ্ভব। আসুন, গতি-প্রক্রিয়ার পরপর পর্যায়গুলিকে সংক্ষেপে পর্যালোচনা করে আরেকবার ব্যাপারটিকে পরিষ্কার করে নিই; এই পর্যায়-পরম্পরারই চুড়ান্ত বিন্দু হল ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়ন। [* এই অনুচ্ছেদটি (৩১১ পৃষ্ঠার “ধনতান্ত্রিক আত্মীকৱণে নিম”) চতুর্থ জার্মান সংস্করণ অনুযায়ী ইয়জী পাঠে ফুক্ত করা হয়েছে। সংস্করণ।]
প্রথমত, আমরা দেখেছিলাম যে, একটি মূল্যসমষ্টির মূলধনে প্রারম্ভিক রূপান্তরণ সম্পাদিত হয়েছি বিনিময়-নিয়মাবলীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ভাবে। চুক্তিকারী দুটি পক্ষের মধ্যে একটি পক্ষ তার শ্রম-শক্তি বিক্রয় করে, অপরটি তা ক্রয় করে। প্রথম পক্ষটি তার পণ্যের মূল্য পায়, যার ব্যবহার-মূল্য-শ্ৰম—তদ্বারা ক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হয়ে যায়। উৎপাদনের উপায়-উপকরণ, যার মালিক আগে থেকেই দ্বিতীয় পক্ষটি, সেগুলি তখন তারই সমান মালিকানাধীন শ্রমের সাহায্যে তার দ্বারা রূপান্তরিত হয় একটি নোতুন উৎপন্নে, আইনগত ভাবে সে-ই যার মালিক।
এই উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে একটি উদ্বৃত্ত-মূল্য সমেত শ্রমশক্তির মূল্যের সমমূল্য। তার কারণ এই যে শ্রমশক্তির মূল্য—যা বিক্রি হয় এক দিন বা এক সপ্তাহ ইত্যাদির মত একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য–সেই সময়কালের মধ্যে তার ব্যবহার দ্বারা সৃষ্ট মূল্য অপেক্ষা অল্পতর। কিন্তু শ্রমিক তার শ্রমশক্তির জন্য বিনিময় মূল্য পেয়ে গিয়েছে এবং তা পেয়ে গিয়ে ঐ শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্যও হস্তান্তরিত করে দিয়েছে প্রত্যেক ক্রয়-বিক্রয়েই এই রকম ঘটে থাকে।
শ্রমশক্তি নামধেয় এই বিশেষ পণ্যটি যে শ্রম-সরবরাহের এবং এই কারণেই মূল্য সৃজনের বিশিষ্ট ব্যবহার-মূল্যটির অধিকারী—এই ঘটনা পণ্যোৎপাদনের সাধারণ নিয়মটিকে ক্ষুন্ন করতে পারে না। সুতরাং, মজুরি বাবদে অগ্রিম প্রদত্ত মূল্যের আয়তনটি-মাত্র আবার উৎপন্ন-ফলে পাওয়া না গিয়ে যদি সেখানে পাওয়া যায় উদ্ব মূল্যের দ্বারা বিবর্ধিত আয়তনে, তার কারণ এই নয় যে, বিক্রেতাকে প্রতারণা করা হয়েছে, কেননা সে তো আসলে তার পণ্যের মূল্য পেয়েই গিয়েছে। তার একমাত্র কারণ এই যে, এই পণ্যটি ক্রেতার দ্বারা পরিভুক্ত হয়ে গিয়েছে।
