এখন, এই উপাদানগুলিকে মূলধন হিসাবে কাজ করবার অবকাশ দিতে হলে, ধনিক শ্রেণীর চাই অতিরিক্ত শ্রম। যদি ইতিপূর্বে নিযুক্ত শ্রমিকদের শোষণ ব্যাপকতার দিক থেকে বা নিবিড়তার দিক থেকে বৃদ্ধি না করা যায়, তা হলে অবশ্যই অতিরিক্ত শ্রমশক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রণালী আগে থেকেই, শ্রমিক শ্রেণীকে মজুরি-নির্ভর একটি শ্রেণীতে পরিণত করে, শ্রেণীর সংস্থান রাখে, যার মামুলি মজুরি কেবল তার জীবনধারণের পক্ষেই যথেষ্ট নয়, তার সংখ্যাবৃদ্ধির পক্ষেও যথেষ্ট। মূলধনের পক্ষে যা করণীয়, তা হল শ্রমিক শ্রেণী প্রতি বৎসর সকল বয়সের শ্রমিকের আকারে যে-অতিরিক্ত শ্রমশক্তি সরবরাহ করে, তাকে বাৎসরিক উৎপাদনের মধ্যে বিধৃত উদ্বৃত্ত-উৎপাদন-উপায়সমূহের সঙ্গে কেবলমাত্র সমন্বিত করে দেওয়া; এবং তা হলেই উদ্বৃত্ত-মূল্যের মূলধনে রূপান্তরণ সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে, সঞ্চয়ন নিজেকে পরিণত করে ক্রমবর্ধমান আয়তনে মূলধনের পুনরুৎপাদনে। যে-বৃত্তাকারে সরল পুনরুৎপাদন সঙ্কলিত হয়, তা আর আকার পরিবর্তন করে এবং সিম দির ভাষায় বলা যায়, ঘোরানো সিড়ির আকার ধারণ করে। [৩]
এবার আমাদের উদাহরণটিতে ফিরে যাওয়া যাক। এটা সেই পুরানো কাহিনী। আব্রাহাম জন্ম দিলেন ইশাকের, ইশাক জন্ম দিলেন আব্রাহামের, এবং এই ভাবেই চলতে থাকল। ১০,০০০ পাউণ্ডের প্রারম্ভিক মূলধন আনল ২০০০ পাউণ্ডের উদ্বৃত্ত-মূল্য, যা মূলধনায়িত হল। ২০০০ পাউণ্ডের নতুন মূলধন আনল ৪০০ পাউণ্ডের উদ্বৃত্ত-মূল্য, তা-ও আবার মূলধনায়িত হল, রূপান্তরিত হল একটি দ্বিতীয় অতিরিক্ত মূলধনে, যা আবার পালাক্রমে উৎপাদন করল ৮০ পাউণ্ডের আরো উদ্বৃত্ত-মূল্য। এবং এই ভাবেই বলটি গড়িয়ে চলল।
উদ্বৃত্ত-মূল্যের যে-অংশটি ধনিক পরিভোগ করে, আমরা তাকে বিবেচনার মধ্যে আনছি না। অতিরিক্ত মূলধনটি কি প্রারম্ভিক মূলধনের সঙ্গে যুক্ত হল স্বতন্ত্র ভাবে কাজ করার জন্য বিযুক্ত রইল, যে ধনিক তা সঞ্চয়িত করেছিল, সে নিজেই তা নিয়োগ করল কিংবা অন্য কারো হাতে হস্তান্তর করল, তা এই মুহূর্তে আমাদের সামান্যই কাজে আসে। শুধু এই কথাটা ভুললে চলবেনা যে, নব-গঠিত মূলধনের পাশাপাশি প্রারম্ভিক মূলধনটিও নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে, উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করতে থাকে, এবং এটা সমস্ত সঞ্চয়ীকৃত মূলধনের ক্ষেত্রেই এবং তার দ্বারা প্রজনিত অতিরিক্ত মূলধনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
প্রারম্ভিক মূলধন গঠিত হয়েছিল অগ্রিম-প্রদত্ত ১০,০০০ পাউণ্ড দিয়ে। মালিক কিভাবে এই টাকাটার অধিকার পেয়েছিল? রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের মুখপাত্রবৃন্দ সমম্বরে উত্তর দেবেন, তার নিজের শ্রম এবং তার পূর্বপুরুষদের শ্রমের দ্বারা।”[৪] এবং বস্তুত তাদের এই ধারণাটাই পণ্য-উৎপাদনের নিয়মাবলীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একমাত্র তথ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
কিন্তু ২,০০০ পাউণ্ড অতিরিক্ত মূলধনের বেলায় ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকার। সেটার উৎপত্তি কি ভাবে হল, তা আমরা সকলেই জানি। এই মূলধনটির মধ্যে এমন এক কণা মূল্যও নেই যা তার অস্তিত্বের জন্য মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের কাছে ঋণী নয়। উৎপাদনের উপকরণাদি, যার সঙ্গে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি সংযোজিত হয়, এবং অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রী, যা দিয়ে শ্রমিকরা পরিপোষিত হয়—এগুলি উদ্বৃত্ত-উৎপন্নের অঙ্গগত অংশ ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণীর কাছ থেকে ধনিক শ্রেণী কর্তৃক আদায়ীকৃত বাৎসরিক কর ছাড়া, আর কিছুই নয়। যদিও ধনিক শ্রেণী ঐ করের একটা অংশ দিয়ে এমনকি পুরো দামেও অতিরিক্ত শ্রমশক্তি ক্রয় করে, যাতে করে সমমূল্যের সঙ্গে সমমূল্যের বিনিময় ঘটে, তা হলেও ঐ লেনদেনটা হল কেবল প্রত্যেক বিজেতার সেই চিরপুরার কৌশল; বিজিতদের কাছ থেকে সে পণ্য ক্রয় করে অদের কাছ থেকেই লুষ্ঠিত অর্থের সাহায্যে।
যদি এই অতিরিক্ত মূলধন সেই ব্যক্তিটিকেই নিয়োগ করে যে তাকে উৎপন্ন করেছিল, তা হলে এই উৎপাদনকারী কেবল প্রারম্ভিক মূলধনকেই বাড়িয়ে যেতে থাকবে না, সেই সঙ্গে সে তার পূর্ববর্তী শ্রমের ফলগুলিকে ফেরত কিনে নেবে-সেগুলি বাবদে যে শ্রম খরচ হয়েছিল, তার চেয়ে অধিকতর শ্রম দিয়ে। যখন ধনিক শ্রেণী আর শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে লেনদেন হিসাবে ব্যাপারটাকে দেখা হয়, তখন অতিরিক্ত শ্রমিকেরা যে মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের সাহায্যে নিযুক্ত হল, তাতে কোনো পার্থক্য হয় না। ধনিক এই অতিরিক্ত মূলধনকে রূপান্তরিত করতে পারে একটি মেশিনে, যার ফলে ঐ মেশিন যারা উৎপাদন করেছে, তারাও কর্মচ্যুত হয় এবং তাদের স্থান পূরণ করে কয়েকজন শিশু। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই শ্রমিক শ্রেণী এক বছরের উদ্বৃত্ত-শ্রম দিয়ে যেমূলধন সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী বছরে অতিরিক্ত শ্রম নিয়োগের জন্য উদ্দিষ্ট।[৫] আর একেই বলা হয়, মূলধন থেকে মূলধন সৃষ্টি করা।
২,০০০ পাউণ্ডের প্রথম অতিরিক্ত মূলধনটি পুচিত করে যে, ১০,০০০ পাউণ্ড মূল্য আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, নিজের “আদিম-শ্রম”-এর কল্যাণে ধনিক যে-মূল্যের মালিক ছিল এবং যা সে অগ্রিম হিসাবে দিয়েছিল। উটো ভাবে ৪০০ পাউণ্ডের দ্বিতীয় অতিরিক্ত মূলধনটি কেবল সূচিত করে যে, আগে থেকেই ২,০০০ পাউণ্ড সঞ্চয়ীকৃত ছিল, যার মধ্যে ৪০০ পাউণ্ড হল মূলধনায়িত উদ্বৃত্ত-মূল্য। সুতরাং, তখন থেকে অতীতের মজুরি-বঞ্চিত শ্রমই হয়ে আসছে নিরন্তর ভাবে কম-ধমান আয়তনে জীবন্ত মজুৰি-বঞ্চিত শ্রমের আত্মীকরণের একমাত্র শর্ত। ধনিক যত বেশি সঞ্চয়ন করেছে, আরো তত বেশি সঞ্চয়নের ক্ষমতা সে লাভ করেছে।
