কারখানা মালিকদের মনোনীত মুখপাত্র পটার দু ধরনের “মেশিনারি”-র মধ্যে পার্থক্য করেন, যে-দুটির প্রত্যেকটিরই মালিক হচ্ছে ধনিক এবং যাদের মধ্যে একটি থাকে কারখানায় এবং অন্যটি রাতের বেলায় ও রবিবারে থাকে কারখানার বাইরে কুঁড়ে ঘরে। একটি নির্জীব, অন্যটি সজীব। নির্জীব মেশিনারিটি দিনের পর দিন কেবল ক্ষয় প্রাপ্ত ও অবচিতই হয় না, নিরন্তর কারিগরি অগ্রগতির দরুন তার একটা বড় অংশ এত অথব হয়ে পড়ে যে, তাকে কয়েকমাস পরে অবসর দিয়ে তার বদলে নোতুন মেশিনারি বসানো ভাল। অপর পক্ষে সজীব মেশিনারিটি কিন্তু যত দিন যায় তত আরো ভাল হয়, এবং সেই অনুপাতে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত করার দক্ষতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই তুলো-নবাবের জবাবে ‘টাইমস পত্রিকা যা বলে তা এই :
“তুলো-মালিকদের অসাধারণ ও অদ্বিতীয় গুরুত্ব সম্পর্কে মিঃ পটার এত আস্থাবান যে, এই শ্রেণীটিকে রক্ষা করতে এবং তাদের বৃত্তিটিকে নিত্যস্থায়ী করতে তিনি চান শ্রমিক শ্রেণীর পাঁচ লক্ষ লোককে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক কর্ম-নিবাসে আবদ্ধ করে রাখতে। মিঃ পটার প্রশ্ন করেন শিল্পটিকে কি টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে? উত্তরে আমরা বলি, “নিশ্চয়ই আছে, সমস্ত সাধু উপায়ে। তিনি আবার প্রশ্ন করেন, ‘মেশিনারিটিকে সঠিক অবস্থায় রাখার কি কোন মূল্য আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাদের দ্বিধা আছে। মেশিনারি বলতে মিঃ পটার বোঝাচ্ছেন মনুষ্যরূপ মেশিনারিটিকে, কেননা তার পরেই তিনি বলেছেন যে, তিনি তাদের সর্বতোভাবে সম্পত্তি হিসাবে, ব্যবহার করতে চান না। আমরা স্বীকার করছি, মনুষ্য-রূপ মেশিনারিটিকে সঠিক অবস্থায় রাখার অর্থাৎ যত দিন তার প্রয়োজন না হয়, তত দিন তাকে বন্ধ করে রাখার ও তেল দেবার কোন মূল্য আছে’ বলে, বা তা করা সম্ভব বলে, আমরা মনে করিনা। কর্মহীন অবস্থায় থাকলে মনুষ্য-রূপ মেশিনারি অবশ্যই মরচে ধরবে, যতই তাকে তেল দিন আর মাজাঘষা করুন না কেন। তা ছাড়া, মনুষ্য-মেশিনারি, যেমন আমরা সদ্য সদ্য দেখেছি, আপনা-আপনিই বাম্পায়িত হয়ে উঠবে, এবং হয়, ফেটে পড়বে বা আমাদের বড় বড় শহরগুলিকে তছনছ করে দেবে। যে কথা মিঃ পটার বলেন, শ্রমিকদের পুনরুৎপাদন করতে কিছু সময় লাগতে পারে, কিছু হাতের কাছে মেশিন-বিদ ও ধনিক সুপ্রাপ্য হওয়ায়, আমরা সব সময়েই এমন সমস্ত মিতব্যয়ী, সংকল্পবদ্ধ ও পরিশ্রমী ব্যক্তিকে পেতে পারি, যাদের সাহায্যে আমরা চিরকালের প্রয়োজনের চেয়েও বেশিসংখ্যক কারখানা মালিক চটপট তৈরি করে নিতে পারি। মিঃ পটার এক, দুই বা তিন বছরের মধ্যে শিল্প-পুনর্জাগরণের কথা বলেন এবং তিনি আমাদের অনুরোধ করেন যেন আমরা শ্রমকারী শক্তিকে দেশান্তর গমনে উৎসাহ বা অনুমতি না দিই। তিনি বলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক যে শ্রমিকেরা দেশান্তরে যেতে চাইবে; কিন্তু তিনি মনে করেন যে, তাদের ইচ্ছা সত্বেও জাতির কর্তব্য হবে এই ৫ লক্ষ কর্মীকে তাদের ৭ লক্ষ পোয় সহ তুলে-প্রধান জেলাগুলিতে আটক করে রাখা এবং তার পরিণাম হিসাবে, তিনি। নিশ্চয়ই মনে করেন যে, জাতীয় কর্তব্য হবে বল প্রয়োগ করে তাদের বিক্ষোভকে দমন করা এবং ভিক্ষা দিয়ে তাদের জীইয়ে রাখা—কেননা দৈবক্রমে একদিন তুলো-মালিকরা তাদের চাইতে পারে। সময় হয়ে গিয়েছে, যখন এই দ্বীপপুঞ্জের জনমতের সক্রিয় হওয়া। উচিত এই শ্রমকারী শক্তিকে ওদের হাত থেকে বাঁচাবার, যারা এই শক্তির সঙ্গে এমন ভাবে ব্যবহার করতে চায়, যেমন তারা করে থাকে লোহা আর কয়লা আর তুলোর সঙ্গে।”
‘টাইমস’ পত্রিকার নিবন্ধটি কেবল একটি jeu desprit’। বস্তুত পক্ষে, বিপুল জনমত ছিল মিঃ পটার-এর এই মতের সমর্থক যে, কারখানা-কর্মীরা হল কারখানার অস্থাবর উপকরণাদির অংশবিশেষ। সুতরাং তাদের দেশান্তর-গমন নিবারণ করা হল।[১৬] তুলো-প্রধান জেলাগুলিতে “নৈতিক কর্মভবনে তালাবদ্ধ করা হল, এবং, আগের মত, এখনো তারা থেকে গেল ল্যাংকাশায়ারের তুলো-কলমালিকদের “শক্তি”-স্বরূপ।
অতএব, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন নিজ থেকেই শ্রমশক্তি এবং শ্রম-উপকরণের মধ্যে বিচ্ছেদের পুনরুৎপাদন করে। এইভাবে তা শ্ৰমিক-শোষণের অবস্থাটির পুনরুৎপাদন ও নিত্যসাধন করে। তা শ্রমিককে অবিরাম বাধ্য করে বেঁচে থাকবার জন্য তার শ্রম শক্তিকে বিক্রি করতে এবং ধনিককে সক্ষম করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলবার জন্য সেই শ্রম-শক্তি ক্রয় করতে। [১৭]ধনিক এবং শ্রমিক যে বাজারে পরস্পরের মুখোমুখি হয়, সেটা একটা আপতিক ঘটনা নয়। স্বয়ং প্রক্রিয়াটিই শ্রমিককে তার শ্রমশক্তির ফেরিওয়ালা হিসাবে অবিরাম বাজারে ছুড়ে দেয় এবং তার নিজের উৎপন্ন ফলকে এমন একটি উপায়ে রূপান্তরিত করে, যার দ্বারা আর একজন ব্যক্তি তাকে ক্রয় করতে পারে। তার অর্থ নৈতিক দাসত্বের কারণ,[১৮] নিজেকে পালাক্রমে বেচে দেওয়া তার মালিকের অদল বদল হয়া, এবং শ্রমশক্তির বাজার-দরে ওঠা-নামার এই ঘটনাগুলি এবং আবার তা ঢেকে রাখারও আবরণ।[১৯]
অতএব, একটি অবিচ্ছিন্ন সুসংবদ্ধ প্রক্রিয়ার, পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়ার আকৃতিতে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন কেবল পণ্য সামগ্রীই উৎপাদন করে না; তা সেই সঙ্গে ধনতান্ত্রিক সম্পর্কও উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে। এক দিকে ধনিক এবং অন্য দিকে শ্রমিক।[২০]
