বিষয়টি একটি সম্পূর্ণ অন্য চেহারা ধারণ করে, যখন আমরা একক ধনিক ও একক শ্রমিকের কথা বিবেচনা না করে, বিবেচনা করি ধনিক শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর কথা; উৎপাদনের একটি বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়াকে বিবেচনা না করে, বিবেচনা করি ধনতান্ত্রিক উৎপাদনকে তার পূর্ণ মাত্রায় এবং যথার্থ সামাজিক আয়তনে। তার মূলধনের অংশ বিশেষকে শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত করে, ধনিক তার সমগ্র মূলধনের মূল্যকে বর্ধিত করে। এক ঢিলে সে দুটি পাখি মারে। শ্রমিকের কাছ থেকে যা সে পায় কেবল তা থেকেই নয়, শ্রমিককে যা সে দেয় তা থেকেও মুনাফা করে। শ্রমশক্তির বিনিময়ে যেমূলধন দেওয়া হয়, তা রূপান্তরিত হয় অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীতে, যা পরিভোগ করে বর্তমান শ্রমিকের পেশী, স্নায়ু, অস্থি, মস্তিষ্ক, পুনরুৎপাদিত হয় এবং নোতুন শ্রমিকদের জন্ম হয়। অতএব, যা কঠোরভাবে আবশ্যক তার মাত্রার মধ্যে, শ্ৰমিক-শ্রেণীর ব্যক্তিগত পরিভোগ হচ্ছে, শ্রমশক্তির বিনিময়ে মূলধনের দ্বারা প্রদত্ত জীবনধারণের উপকরণ সমূহের শোষণের উদ্দেশ্যে ধনিকের ইচ্ছানুসারে ব্যবহারের জন্য, নোতুন শ্রমশক্তিতে পুনঃরূপান্তর-সাধন। ধনিকের কাছে এত অপরিহার্য যে-উৎপাদনের উপায়টির উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন, সেই উৎপাদনের উপায়টি হল স্বয়ং শ্রমিক। শ্রমিকের ব্যক্তিগত পরিভোগ, তা কর্মশালার ভিতরেই চলুক বা বাইরেই চলুক, তা উৎপাদন-প্রক্রিয়ার অংশ হোক বা না হোক, সেটা মূলধন উৎপাদনের ও পুনরুৎপাদনের একটি উপাদান রচনা করে, ঠিক যেমন ‘ক্লিনিং মেশিনারি করে থাকে, তা মেশিনারিটি যখন চালু আছে তখনি করুক, কিংবা যখন সেটি দাড়িয়ে আছে তখনি করুক। শ্রমিক তার জীবনধারণের উপায়-উপকরণ পরিভোগ করে ধনিকের মনোরঞ্জনের জন্য নয়, নিজের প্রয়োজন-সাধনের জন্য—এই ঘটনায় কোন প্রভাব ব্যাপারটির উপরে পড়ে না। যেহেতু পশু যা খায়, তা সে উপভোগ করে; তৎসত্ত্বেও একটি ভারবাহী পশু কর্তৃক খাদ্যের পরিভোগ উৎপাদন-প্রক্রিয়ার একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ই থেকে যায়। শ্রমিক শ্রেণীর ভরণ-পোষণ ও পুনরুৎপাদন মূলধনের পুনরুৎপাদনের জন্য এখনো আছে একটি আবশ্যক শর্ত এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু ধনিক তা নির্ভাবনায় শ্রমিকদের আত্ম সংরক্ষণের ও প্রজননের প্রবৃত্তির উপরে ছেড়ে দিতে পারে। ধনিক যার জন্য মাথা ঘামায় তা হল শ্রমিকের ব্যক্তিগত পরিভোগকে নিতান্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির যথাসম্ভব নূ্যনতম মাত্রায় নামিয়ে আনা, এবং যে পাশবিক দক্ষিণ আমেরিকাবাসীরা তাদের এমিকদের অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের তুলনায় বরং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য করে, তাদের চেয়ে সে অনেক দূরে থাকে।[৯]
অতএব, ধনিক এবং তার ভাবাদর্শগত প্রতিনিধি তথা অর্থনীতিক উভয়েই শ্রমিকের ব্যক্তিগত পরিভোগের সেই অংশকে উৎপাদনশীল বলে গণ্য করে, যা সেই শ্রেণীর নিত্য স্থায়িত্বের জন্য আবশ্যক, এবং যা অবশ্যই সুনিশ্চিত করতে হবে যাতে করে ধনিক তার পরিভোগর জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি পেতে পারে; সেই অংশের বাইরে শ্রমিক নিজের আনন্দের জন্য যা পরিভোগ করে, তাই অনুৎপাদনশীল পরিভোগ।[১০] যদি মূলধনের সঞ্চয়নের ফলে মূলধন কর্তৃক শ্রমশক্তির পরিভোগ বৃদ্ধি না পেয়ে, মজুরিতে বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের পরিভোগ বৃদ্ধি ঘটত, তা হলে অতিরিক্ত মূলধনটি পরিভুক্ত হত অনুৎপাদনশীল ভাবে।[১১] বস্তুত শ্রমিকের ব্যক্তিগত পরিভোগ তার পক্ষে অনুৎপাদন শীল, কেননা তা অভাবী ব্যক্তিটিকে ছাড়া আর কিছুই পুনরুৎপাদন করে না; এটা ধনিকের পক্ষে এবং রাষ্ট্রের পক্ষে উৎপাদনশীল, কেননা তাদের সম্পদ উৎপাদন করে যে-শক্তি, এটা সেই শক্তিকেই উৎপাদন করে। [১২]
সুতরাং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমিক-শ্রেণী, এমনকি যখন সে শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ভাবে নিযুক্ত না-ও থাকে, তখনো সে শ্রমের মামুলি উপকরণগুলির মতই মূলধনের একটি স্বরূপ। এমনকি তার ব্যক্তিগত পরিভোগও, কয়েকটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে, উৎপাদন-প্রক্রিয়ার একটি উপাদান মাত্র। সেই প্রক্রিয়াটি অবশ্য বিশেষ দৃষ্টি রাখে যাতে করে এই আত্ম-সচেতন উপকরণগুলি তাকে পথে না বসায়, কারণ তা তাদের উৎপন্ন দ্রব্য তৈরি হবার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে তাদের মেরু থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে, মূলধনের মেরুতে অপসারিত করে। এক দিকে, ব্যক্তিগত পরিভোগ তাদের ভরণ-পোষণ ও পুনরুৎপাদনের সংস্থান করে; অন্য দিকে তা জীবন-ধারণের অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীর বিনাশ ঘটিয়ে শ্রমের বাজারে শ্রমিকের ক্রমাগত পুনরাবির্ভাবকে নিশ্চয়ীকৃত করে। রোমে ক্রীতদাসকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত; মজুরি-শ্রমিক
তার মালিকের সঙ্গে বাঁধা থাকে অদৃশ্য সুতোয়। স্বাধীনতার একটা বাহ্যিক রূপ সব। সময়েই সামনে বজায় রাখা হয় নিয়োগকর্তাদের নিরন্তর পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং একটি চুক্তির আইনগত ছলনার মাধ্যমে।
অতীত কালে, যখনি দরকার পড়ত, তখনি মূলধন স্বাধীন শ্রমিকের উপৰে তার স্বত্বাধিকার বলবৎ করার জন্য আইনের আশ্রয় নিত। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ১৮১৫ সাল পর্যন্ত, ইংল্যাণ্ডে মেশিন-তৈরির কারখানায় নিযুক্ত মেকানিকদের দেশান্তরে গমন নিষিদ্ধ ছিল; নিষেধ ভাঙলে কঠোর দুর্ভোগ ও শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।।
