তা হলে দেখা যাচ্ছে যে, সমস্ত সঞ্চয়ন ছাড়াও, কেবল উৎপাদন-প্রক্রিয়ার নিরবচ্ছিন্নতাই, ভাষান্তরে, সরল পুনরুৎপাদনই, আজ হোক বা কাল হক, আবশ্যিক ভাবেই প্রত্যেক মূলধনকে সঞ্চয়ীকৃত মূলধনে কিংবা মূলধনায়িত উদ্বৃত্ত-মূল্যে রূপান্তরিত করে। এমনকি যদি সেই মূলধন শুরুতে তার নিয়োগকর্তার ব্যক্তিগত শ্রমের দ্বারাও অর্জিত হয়ে থাকে, তা আজ বা কাল পরিণত হয় আত্মীকৃত মূল্যে, যার জন্য কোনো পরিবর্ত মূল্য দেওয়া হয়নি, অর্থাৎ পরিণত হয় অপরের মজুরি-বঞ্চিত এমে, যা রূপায়িত হয়েছে টাকার অঙ্কে বা অন্য কোন বস্তুর আকারে। চতুর্থ অধ্যায় থেকে ষষ্ঠ অধ্যায় পর্যন্ত আমরা দেখেছি যে, টাকাকে মূলধনে রূপায়িত করতে হলে পণ্যের উৎপাদন ও সঞ্চলন ছাড়াও আরো কিছুর প্রয়োজন হয়। আমরা দেখেছি যে, এক দিকে, মূল্য বা টাকার মালিক এবং অন্য দিকে, মূল্য-সৃজনকারী বস্তুটির মালিক, এক দিকে, উৎপাদন ও জীবন-ধারণের উপায়-উপকরণের মালিক এবং অন্য দিকে, শ্রমশক্তি ছাড়া আর কিছুরই মালিক নয়—এই দুই পক্ষ অবশ্যই পরস্পরের মুখোমুখি হয় ক্রেতা এবং বিক্রেতা হিসাবে। সুতরাং নিজের উৎপন্ন দ্রব্য থেকে শ্রমের বিচ্ছেদ তথা শ্রমের বিষয়গত অবস্থাবলী থেকে বিষয়ীগত শ্রমশক্তির বিচ্ছেদ হল ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঘটনাগত আসল ভিত্তি এবং সূচনা-বিন্দু।
কিন্তু যা প্রথমে ছিল একটি সুচনা-বিন্দু, তা কেবল প্রক্রিয়াটির নিবচ্ছিন্নতার কারণেই, সরল পুনরুৎপাদনের কারণেই, হয়ে ওঠে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের স্ব-বিশেষ, নিরন্তর নবীকৃত ও নিত্য স্থায়ীকৃত ফল। এক দিকে, উৎপাদনের প্রক্রিয়া বস্তুগত সম্পদকে অবিরত মূলধনে, ধনিকের জন্য আরো সম্পদ উৎপাদনের উপায়ে, উপভোগের উপকরণে রূপান্তরিত করতে থাকে। অন্য দিকে, শ্রমিক উক্ত প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করার পরে, যা সে ছিল ঐ প্রক্রিয়ায় প্রবেশের সময়ে, তাই থেকে যায়, অর্থাৎ সম্পদের অন্যতম উৎসই থেকে যায়, কিন্তু সেই সম্পদকে নিজস্ব করে নেবার সমস্ত উপায় থেকে বঞ্চিত। যেহেতু ঐ প্রক্রিয়ায় প্রবেশের আগে তার নিজের শ্রম ইতিমধ্যেই বিক্রয়ের মাধ্যমে, শ্রমিকের নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে, খনিকের দ্বারা আত্মীকৃত ও মূলধনের সঙ্গে সুসংবদ্ধ হয়ে গিয়েছে, সেহেতু উক্ত প্রক্রিয়া চলাকালে সেই শ্রম অবধারিত ভাবেই এমন একটি উৎপন্ন দ্রব্যে রূপায়িত হবে, যার মালিক আর সে নয়। যেহেতু উৎপাদনের প্রক্রিয়া আবার ধনিক কর্তৃক শ্রমশক্তি পৰিভোগ করারও প্রক্রিয়া, সেহেতু শ্রমিকের উৎপন্ন ফল অবিরত রূপান্তরিত হয় কেবল পণ্যদ্রব্যেই নয়, সেই সঙ্গে মূলধনেও, সেই মূল্যেও, যা শুষে খায় মূল্য-সৃজনকারী ক্ষমতাকে, উৎপাদনের সেই উপায়-উপকরণকেও, যা নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদনকারীদের।[৬] সুতরাং শ্রমিক প্রতিনিয়ত এমন এক বিজাতীয় শক্তির অধীনে বস্তুগত, বিষয়গত সম্পদ উৎপাদন করে, যা মূলধনের আকারে, তার উপরে আধিপত্য করে, তাকে শোষণ করে। এবং ধনিকও তেমনি প্রতিনিয়ত উৎপাদন করে শ্রমশক্তি, কিন্তু, কেবল সম্পদের একটি বিষয়ীগত উৎস হিসাবে একমাত্র যার মধ্যে এবং যার দ্বারা তা রূপায়িত হতে পারে সেই বিষয়সমূহ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে, এক কথায়, সে শ্রমিককে উৎপাদন করে, কিন্তু কেবল মজুরি-শ্রমিক হিসাবে।[৭] এই বিরতিবিহীন পুনরুৎপাদন, শ্রমিকের এই নিত্যস্থায়ীকরণ—এটাই হল ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের আবশ্যিক শর্ত (sine qua non)।
শ্রমিক পরিভোগ করে দ্বিবিধ উপায়ে। যখন উৎপাদন করে, তখন সে তার শ্রমের সাহায্যে উৎপাদনের উপায়-উপকরণকে পরিভোগ করে এবং সেগুলিকে রূপান্তরিত করে অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের মূল্যের চেয়ে উচ্চতর মূল্যসম্পন্ন উৎপন্ন দ্রব্যে। এটা হল তার উৎপাদনশীল পরিভোগ। এটা আবার সেই সঙ্গে ধনিক কর্তৃক তার শ্রমশক্তির পরিভোগও বটে, যে তা ক্রয় করেছে। অন্য দিকে, শ্রমিক তার শ্রম-শক্তির জন্য টাকাকে পরিবর্তিত করে জীবনধারণের উপকরণে; এটা হল তার ব্যক্তিগত পরিভোগ। সুতরাং, শ্রমিকের উৎপাদনশীল পরিভোগ এবং তার ব্যক্তিগত পরিভোগ দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। প্রথম ক্ষেত্রে, সে কাজ করে মূলধনের সঞ্চলক শক্তি (মোটিভ পাওয়ার) হিসাবে এবং সে ধনিকের মালিকানাধীন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, সে নিজেই নিজের মালিক এবং তার প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যক কাজগুলি সম্পাদন করে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার বাইরে। একটার ফলে ধনিক বেঁচে থাকে, অন্যটার ফলে বেঁচে থাকে শ্রমিক।
শ্রম-দিবস সম্পর্কে আলোচনাকালে, আমরা দেখেছিলাম, শ্রমিককে প্রায়ই বাধ্য করা হয় তার ব্যক্তিগত পরিভোগকে উৎপাদনের কেবল একটা অনুষঙ্গ মাত্রে পরিণত করতে। এমন ক্ষেত্রে, সে নিজেকে যোগায় অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রী, যাতে করে সে তার শ্রম-শত্তিকে রক্ষা করতে পারে, ঠিক যেমন স্কিম-ইঞ্জিনে যোগানো হয় জল এবং চাকায় তেল। সে ক্ষেত্রে তার পরিভোগের উপকরণ হল একটি উৎপাদন উপায়েরই প্রয়োজনীয় পরিভোগের উপকরণ; তার ব্যক্তিগত পরিভোগ সরাসরিই উৎপাদনশীল পরিভোগ। এটা, অবশ্য, প্রতীয়মান হয় একটি অনাচার হিসাবে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে যা মর্মগতভাবে সম্পর্কিত নয়।[৮]
