সুতরাং অস্থির মূলধন হল জীবনধারণের আবশ্যিক দ্রব্যসামগ্রী সংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের কিংবা শ্রমিকের নিজের ও তার পরিবারে ভরণ-পোষণের জন্য যে শ্রম-তহবিলের প্রয়োজন হয় এবং, সামাজিক উৎপাদনের প্রণালী যাই হোক না কেন, যে তহবিলটি তাকে নিজেকেই অবশ্যই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে হবে, তারই চেহারার একটি বিশেষ ঐতিহাসিক রূপ মাত্র। শ্রম-তহবিল যদি নিরন্তর তার দিকে বয়ে আসে টাকার আকারে, যা তাকে দেয় তার শ্রমের পারিশ্রমিক, তা হলে তার কারণ এই যে, সে যে-উৎপন্ন দ্রব্য তৈরি করেছে তা নিরন্তর তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে মূলধনের আকারে। কিন্তু এই সবকিছু সত্ত্বেও এই ঘটনাটি বদলে যায় না যে, এটা শ্রমিকেরই নিজস্ব শ্রম, যা রূপায়িত হয় উৎপন্ন দ্রব্য, এবং যা ধনিক তাকে দেয় অগ্রিম হিসাবে।[৩] একজন চাষীর কথা ধরা যাক, যাকে তার প্রভুর জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাজ করতে হয়। সে তার নিজের উৎপাদন-উপকরণাদি নিয়ে নিজের জমিতে চাষ করে, ধরা যাক, সপ্তাহে ৩ দিন। বাকি ৩ দিন তাকে বেগার খাটতে হয় তার প্রভুর জমিদারিতে। সে নিরন্তর তার নিজের শ্রম-তহবিল পুরুৎপাদন করে, যা, তার ক্ষেত্রে, কখনো তার শ্রমের অন্য কারো দ্বারা অগ্রিম প্রদত্ত আর্থিক মরির রূপ গ্রহণ করে না। কিন্তু প্রতিদানে, তার প্রভুর জন্য তার মজুরি-বঞ্চিত বাধ্যতামলক শ্রমও আবার কখনো স্বেচ্ছামূলক মজুরি-প্রদত্ত শ্রমের চরিত্র অর্জন করে না। এক সুন্দর প্রভাতে প্রভুটি তার জমি গবাদিপশু বীজ, এক কথায়, এই চাষীর উৎপাদনের উপায়-উপকরণ আত্মসাৎ করে নেয়; তখন থেকে ঐ চাষী তার শ্রমশক্তি তার প্রভুর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সে। cacteris paribus, আগের মতই সপ্তাহে ৬ দিন করে কাজ করতে থাকবে, ৩ দিন। নিজের জন্য এবং বাকি ৩ দিন প্রভুর জন্য, যে তখন পরিণত হয় মজুরি-দাতা ধনিকে। আগের মতই সে উৎপাদনের উপায়-উপকরণাদি উৎপাদনের উপায়-উপকরণ হিসাণেই ব্যবহার করবে এবং তাদের মূল্যকে উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত করবে। আগের মতই উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর একটা নির্দিষ্ট অংশ পুনরুৎপাদনে নিয়োজিত হবে। কিন্তু যে-মুহূর্ত থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম পরিবর্তিত হয় মজুরি-শ্রমে, সেই মুহূর্তটি থেকে শ্রম তহবিল, যা সে আগের মতই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে থাকে, তা মনিবের দ্বারা অগ্রিম প্রদত্ত মজুরির আকারে মূলধনের রূপ ধারণ করে। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ কোন জিনিসের বাহ্যিক রূপ থেকে সেই জিনিসটিকে আলাদা করে দেখতে অক্ষম বলে, এই ঘটনার দিকে চোখ বুজে থাকে যে, পৃথিবীর বুকে এখনো কেবল এখানে-সেখানে। আজও পর্যন্ত শ্রম-তহবিল উদ্ভূত হয় মূলধনের আকারে।[৪]
এটা ঠিক যে, যখন আমরা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে দেখি তার নিরন্তর পুনর্নবীভবনের প্রবাহ-ধারায়, তখনি কেবল অস্থির মূলধন ধনিকের তহবিল[৫] থেকে দেওয়া অগ্রিম প্রদত্ত মূল্যের চরিত্র হারায়। কিন্তু ঐ প্রক্রিয়াটির নিশ্চয়ই কোন রকমে আগে থেকে সূত্রপাত হয়েছে। সুতরাং আমাদের বর্তমান অবস্থান থেকে এটা সম্ভাব্য বলে মনে হয় যে, একদা এই ধনিক, অন্যান্যদের মজুরি-বঞ্চিত শ্রম থেকে নিরপেক্ষ ভাবে, কিছু সঞ্চয়নের মাধ্যমে, টাকার মালিক হয়ে উঠল এবং এই কারণে এই ভাবেই সে সক্ষম হল শ্রমশক্তির ক্রেতা হিসাবে বাজারে যেতে। যাই হোক, এটাও হতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটির নিছক নিরবচ্ছিন্নতা, সরল পুনরুৎপাদন, নিয়ে আসে অন্যান্য কয়েকটি বিস্ময়কর পরিবর্তন, যা কেবল অস্থির মূলধনকেই নয়, মোট মূলধনকেই প্রভাবিত করে।
যদি ১০০০ পাউণ্ড পরিমাণ মূলধন বার্ষিক ২০০ পাউণ্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত মূল্যের জন্ম দেয়, এবং এই উদ্বৃত্ত-মূল্য যদি প্রতি-বৎসর পরিভুক্ত হয়, তা হলে এটা পরিষ্কার যে, ৫ বছরের শেষে পরিভুক্ত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫X২০০ পাউণ্ড=১০০০ পাউণ্ড, যা গোড়ায় আগাম হিসাবে দেওয়া হয়েছিল। যদি একটি মাত্র অংশ, ধরা যাক অর্ধেক, পরিভুক্ত হত, তা হলে ১০ বছরের শেষে একই ফল ফলত যেহেতু ১০ x১০০ পাউণ্ড= ১,০০০ পাউণ্ড। সাধারণ সূত্র : অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের মূল্যকে বাৎসরিক পরিভুক্ত উদ্বৃত্ত-মূল্য দিয়ে ভাগ করলে সেই বৎসর সংখ্যা বা পুনরুৎপাদনসময়কাল সংখ্যা পাওয়া যায়, যার পরিসমাপ্তি ঘটলে ধনিক কর্তৃক অগ্রিম-প্রদত্ত প্রারম্ভিক মূলধন পরিভুক্ত ও অন্তর্হিত হয়ে যায়। ধনিক মনে করে, সে অন্যান্যের মজুরি বঞ্চিত শ্রমের ফল অর্থাৎ উদ্বৃত্ত-মূল্য পরিভোগ করছে এবং মূল মূলধনটি অক্ষুন। রাখছে; কিন্তু সে যা ভাবে ভাবুক না কেন, তা ঘটনাসমূহকে বদলে দিতে পারে না। একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বছর অতিবাহিত হয়ে গেলে, সে তখন যে-পরিমাণ মূলধন-মূল্যের অধিকারী থাকে, তা সেই বছরগুলিতে যে-পরিমাণ মোট উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাৎ করছে তার সমান, এবং যে-মোট মূল্য সে পরিভোগ করেছে, তা তার প্রান্তিক মূলধনের সমান। এটা সত্য যে, তার হাতে যে মূলধন আছে, তার পরিমাণ বদলায়নি, এবং যার একটি অংশ, যেমন বিভিং, মেশিনারি ইত্যাদি যখন সে তার ব্যবসায়িক কাজ শুরু করে, তখন ছিল। কিন্তু এখানে যা নিয়ে আমাদের কাজ, তা মূলধনের বস্তুগত উপাদানগুলি নয়, তার মূল্য। যখন কোন ব্যক্তি তার সম্পত্তির মুল্যের সমপরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে, তার সমস্ত সম্পত্তিকে শেষ করে দেয়, তখন এটা পরিষ্কার যে তার সম্পত্তি তার সমস্ত ঋণের মোট পরিমাণটি ছাড়া আর কিছুই প্রতিনিধিত্ব করে না। এবং ধনিকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই; যখন সে তার প্রারম্ভিক মূলধনের সমপরিমাণ মূল্য পরিভোগ করে ফেলেছে, তখন তার উপস্থিত মূলধনের মূল্য সে মজুরি না দিয়েই যে মোট পরিমাণ উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাৎ করেছে, তা ছাড়া আর কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না। তার পুরানো মূলধনের একটি মাত্র অণুও অবশিষ্ট থাকে না।
