কারখানা-আইনের অধীন কর্মশালাগুলিতে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিই হয়ে ওঠে সাধারণ রেওয়াজ, কেননা সেখানে কেবল শ্রমের তীব্রতা বৃদ্ধি করেই শ্রম-দিবসের ফলপ্রসূতা বাড়ানো যায়।[১৬]
শ্রমের উৎপাদনশীলতায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্য ভিন্ন ভিন্ন কাজের সময়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। অতএব, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিও পরিবর্তিত হয়, কেননা তা হল একটি নির্ধারিত কর্মকালের আর্থিক অভিব্যক্তি। আমাদের উল্লিখিত দৃষ্টান্তটিতে, ১২ ঘণ্টায় উৎপন্ন হয়েছিল ২৪টি জিনিস, আর ১২ ঘণ্টার উৎপন্ন ফলের মূল্য ছিল ৬ শিলিং, শ্রমশক্তির মূল্য ছিল ৩ শিলিং, শ্রম-ঘণ্টার দাম ৩ পেন্স এবং একটি জিনিসের দাম ১.৫ পেন্স। একটা জিনিসে বিস্তৃত ছিল অর্ধেক ঘণ্টার শ্রম। এখন যদি শ্রমের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণিত হবার দরুন,একই কাজের দিন এখন সরবরাহ করে ২৪টি জিনিসের বদলে ৪৮টি জিনিস, এবং বাকি সব কিছু থাকে অপরিবর্তিত, তা হলে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি ১.৫ পেন্স থেকে কমে দাঁড়ায় ৩/৪ পেন্স, কেননা প্রত্যেকটি জিনিস এখন প্রতিনিধিত্ব করে একটি শ্রম-ঘণ্টার ১/২ ভাগের জায়গায় মাত্র ১/৪ ভাগ। ২৪x১.৫ পেন্স=৩ শিলিং এবং অনুরূপ ভাবেই ৪৮x৩/৪ পেন্স=৩ শিলিং। ভাষান্তরে বলা যায়, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি সেই অনুপাতে হ্রাস পায়, যে-অনুপাতে উৎপন্ন জিনিসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়[১৭] এবং, অতএব, সেই একই জিনিসে ব্যয়িত কর্ম-সময় হ্রাস পায়। সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিতে এই পরিবর্তন, যা এখনো পর্যন্ত কেবল অর্থের হিসাবে, তা পরিণতি লাভ করে ধনিক ও শ্রমিকের মধ্যে নিরন্তর লড়াইয়ে। হয়; যেহেতু খনিক একে ব্যবহার করে শ্রমের দাম সত্যসত্যই কমিয়ে দেবার অছিলা হিসাবে অথবা যেহেতু শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সংঘটিত হয় শ্রমের বর্ধিত তীব্রতা। আর, নয়তো, যেহেতু ‘সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির আকৃতিকে সে গুরুত্বসহকারে নেয়, যথা, তার উৎপন্ন প্রব্যের জন্যই টাকা দেওয়া হচ্ছে, তার শ্রমশক্তির জন্য নয়, এবং, সেই জন্যই, পণ্যের বিক্রয়মূল্য না কমিয়ে মজুরি কমাবার বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহ করে। শ্রমিকেরা কাঁচা মালের দাম এবং তৈরি মালের দাম সযত্নে লক্ষ্য করে এবং এই ভাবে তাদের মালিকের মুনাফার একটা সঠিক হিসাব করতে সক্ষম হয়।[১৯]
মজুরি-শ্রমের প্রকৃতি সম্পর্কে বিরাট বিভ্রান্তি বলে এই ধরনের দাবিকে মালিক সঠিক ভাবেই মাথার উপরে আঘাত হানে।[২০] শিল্পের অগ্রগমনের উপরে কর-আবরাপের এই দখলদারী অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সে চেঁচিয়ে ওঠে এবং ঘুরিয়ে ঘোষণা করে যে, শ্রমের উৎপাদনশীলতা আদৌ শ্রমের ব্যাপারই নয়।[২১]
————
১. “টুকরা-কাজের (পিস-ওয়ার্ক’-এর) ব্যবস্থা শ্রমিকের ইতিহাসে একটা যুগের পরিচায়ক; এক দিকে ধনিককের মর্জির উপরে নির্ভরশীল নিছক দিনমজুর, অন্য দিকে সহযোগমূলক কারিগর যে অদূর ভবিষ্যতে নিজের মধ্যে কারিগর ও ধনিতের সম্মিলন ঘটাবার প্রতিশ্রুতি—এই দুজনের অবস্থানের মধ্যপথে তার অবস্থিতি। পিস ওয়ার্কাররা (জিনিস-পিছু মজুরির ভিত্তিতে যারা কাজ করে, সেই মজুরেরা) আসলে তাদের নিজেদেরই মনিব, এমনকি যখন তারা নিয়োগকর্তার মূলধনের উপরে কাজ করছে, তখনো। (জন ওয়াটস, “ট্রেড সোসাইটিজ অ্যাণ্ড স্ট্রাইকস, মেশিনারি অ্যাণ্ড কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ”, ম্যাঞ্চেস্টার, ১৮৬৫, পৃঃ ৫২, ৫৩)। আমি এই কুত্ত পুস্তিকাটি থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, কারণ অনেক কাল আগেকার যাবতীয় বস্তাপচা বুলির এটা একটা ঝুড়ি-বিশেষ। এই একই মিঃ ওয়াটস এক সময়ে ‘ওয়েনবাদ নিয়ে ব্যবসা কেঁদেছিলেন এবং ১৮৪২ সালে আরেকখানা পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন, যার নাম রাষ্ট্রীয় অর্থতাত্ত্বিকদের তথ্য ও গল্প; সেই পুস্তিকায় আরো অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “সম্পত্তি মানে লুণ্ঠন, সে অনেক দিন আগেকার কথা।
২. টি. জে. ভানিং: ‘ট্রড ইউনিয়নস অ্যান্ড স্ট্রটেকস, লণ্ডন, ১৮৬, পৃঃ ২২।
৩. কি ভাবে এই ধরনের মজুরির পাশাপাশি ও যুগপৎ প্রচলন মালিকদের প্রতারণার কাজকে সাহায্য করে : “একটা কারখানায় ৪ ০ ০ লোক কাজ করে, যাদের মধ্যে অর্ধেক কাজ করে ‘পিস’-এর ভিত্তিতে এবং দীর্ঘতর সময় কাজ করায় স্বার্থবান। বাকি ২০০ জন মজুবি পায় ‘রোজ হিসাবে, কাজ করে অন্যান্যদের মত একই দীর্ঘতর সময়, কিন্তু তাদের উপরি-সময়ের জন্য পায়না কোনো পয়সা।”এই ২০০ জন লোকের প্রতিদিন আধ ঘণ্টা করে কাজ একজন লোকের ৫৩ ঘন্টার কাজের সমান কিংবা এক সপ্তাহের ভাগ ও কাজের সমান, এবং তা সরাসরি নিয়োগকর্তার পক্ষে একটা অতিরিক্ত লাভ।” (“রিপোর্টস: ফ্যক্টরিজ, ১৮৬৩, পৃঃ ৯)। “উপরি-খাটুনি এখনো প্রভূত পরিমাণে চালু আছে; এবং চালু আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়া ও শান্তি পাবার বিরুদ্ধে সেই সব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সমেত, খোদ আইনই, যার সুযোগ রেখে দিয়েছে। আমি আমার আগেকার, অনেক রিপোর্টে দেখিয়েছি: যেসব শ্রমিকেরা ‘পিস-ওয়ার্ক’-এর ভিত্তিতে কাজ করে না, কাজ করে সাপ্তাহিক মজুরির ভিত্তিতে, তাদের কি ক্ষতি হয়।” ( লিন্নার্ড হনরি, “রিপোর্টস ফ্যাক্টরিজ”, ৩০ এপ্রিল, ১৮৫, পৃঃ ৮, ৯)।
৪. “Le salaire peut se mesurer de deux manieres : ou sur la duree du travail, ou sur son produit.”‘ (“Abrege elementaire des principes de l’Economie Politique.” Paris, 1796, p. 32. ) অনামী বইটির লেখক : জি. গার্নিয়ার।
