যেহেতু এখানে কাজটির গুামান ও তীব্রতা খোদ মজুরির রূপের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়, সেই হেতু শ্রমের উপরে তদারকির ব্যাপারটা অনেকাংশেই বাহুল্য হয়ে পড়ে। সুতরাং সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি উপরে বর্ণিত আধুনিক ‘ঘরোয়া শ্রম’-এর এবং সেই সঙ্গে শোষণ ও পীড়নের একটি ক্রমোচ্চ স্তরতন্ত্রের সংগঠিত ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। এই সংগঠিত ব্যবস্থার দুটি মৌল-রূপ আছে। এক দিকে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি এবং ধনিক মজুরি-শ্রমিকদের মধ্যে পরগাছাদের জন্য স্থান করে দেয়, “ভাড়া-কর। শ্রমকে আবার ভাড়া খাটানোর (“সাব-লেট” করার সুযোগ করে দেয়। এই মধ্যস্থদের পুরো ভাড়াটাই আসে, ধনিক শ্রমের জন্য যে দাম দেয় এবং সেই দামের যে-অংশ তার কার্যতঃ শ্রমিকের হাতে পৌছুতে দেয়—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য থেকে।[৬] ইংল্যাণ্ডে এই ব্যবস্থাটিকে তার চরিত্রানুযায়ী অভিহিত করা হয় “ক্ত জল-করা ব্যবস্থা (সোয়েটিং সিস্টেম) বলে। অন্য দিকে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি ধনিককে সুযোগ করে দেয় প্রতিটি জিনিস-পিছু এতটা দামের ভিত্তিতে মুখিয়া শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে ম্যানুফ্যাকচারে কোন প্রমিক-গোষ্ঠীর প্রধানের সঙ্গে খনিতে কয়লা-আহকের সঙ্গে, কারখানায় খোদ মেশিন-শ্রমিকের সন্ধে; যে-দামে চুক্তিটি হয়, সেই দামে ঐ মুখিয়া শ্রমিক নিজেই দায়িত্ব নেয় তার সহকারী কাজের লোকদের সংগ্রহ করতে এবং মজুরি দিতে। এখানে ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের শোষণ সংঘটিত হয় শ্রমিকের দ্বারা শ্রমিকের শোষণের মাধ্যমে।[৭]
উৎপন্ন জিনিসের সংখ্যার ভিত্তিতে মজুরি দেওয়া হয় বলে, স্বভাবতই তার শ্রম শক্তিকে যথা সম্ভব তীব্রতা সহকারে প্রয়োগ করা শ্রমিকের নিজেরই ব্যক্তিগত স্বার্থ হয়ে ওঠে; এর ফলে ধনিক সুযোগ পায় শ্রমের তীব্রতার স্বাভাবিক মাত্রাকে আবো বৃদ্ধি করতে।[৮] অধিকন্তু, শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করা হয়ে ওঠে শ্রমিকের ব্যক্তিগত স্বার্থ, কেননা সেই সঙ্গে তার দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিও বৃদ্ধি পায়।[৯] সময়-ভিত্তিক মজুরির মত, যা আগেই বর্ণনা করা হয়েছে, এই সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিও ক্রমে ক্রমে ঘটায় এক প্রতিক্রিয়া; এমনকি সংখ্যাপিছু মজুরি যদি স্থির থাকে, তা হলেও শ্রম দিবসের দীর্ঘ-বৃদ্ধি যে আবশ্যিক ভাবেই শ্রমের দামে হ্রাস ঘটায়, এটা হিসাবে না ধরে।
সময়-ভিত্তিক মজুরিতে, সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, একই কাজের জন্য একই মজুরি চালু থাকে; কিন্তু সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিতে, যদিও কাজের সময়ের দাম মাপা হয় উৎপন্ন দ্রব্যের একটি বিশেষ পরিমাণের দ্বারা, তা হলেও দিনের বা সপ্তাহের মজুরি পরিবর্তিত হবে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পার্থক্যসমূহের দ্বারা; শ্রমিকদের মধ্যে একজন একটি নিদিষ্ট সময়ে সরবরাহ করছে কেবল ন্যুনতম পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্য, আর একজন করছে গড় পরিমাণ এবং তৃতীয় জন করছে গড়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ। সুতরাং তাদের ব্যক্তিগত শ্রমিকদের বিভিন্ন দক্ষতা, শক্তি ও উদ্যম অনুযায়ী আয়ের ক্ষেত্রেও হয় বিরাট বিরাট পার্থক্য।[১০] অবশ্য, এর ফলে মূলধন ও মজুরি-শ্রমের মধ্যে সাধারণ সম্পর্কের পতন ঘটে না। প্রথমত, সমগ্র ভাবে কর্মশালাটির ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিগত পার্থক্যগুলি পরস্পরকে পুষিয়ে দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে, যার দরুন ঐ কর্মশালাটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে গড় পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্য সরবরাহ করতে সক্ষম হয়; এবং প্রদত্ত মোট মজুরি হবে শিল্পের ঐ বিশেষ শাখার গড় মজুরি। দ্বিতীয়ত, মজুরি ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের অনুপাতও থাকে অপরিবর্তিত, কেননা প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত শ্রমিক যে-পরিমাণ উদ্বৃত্ত মূল্য সরবরাহ করে, তা তার প্রাপ্ত মজুরি অনুরূপ হয়। কিন্তু সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি ব্যক্তিত্বকে যে ব্যাপক অবকাশ দান করে, তা এক দিকে, সেই ব্যক্তিত্বের এবং সেই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাধিকার, স্বাধীন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বিকাশ ঘটায় এবং, অন্য দিকে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতারও বিকাশ ঘটায়। সুতরাং সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির এই প্রবণতা আছে যে, যখন তা ব্যক্তিগত মজুরিকে গড়ের চেয়ে উপরে তোলে, তখন তা এই স্বয়ং গড়টিকেই নিচে নামিয়ে আনে। কিন্তু যেখানে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির একটা বিশেষ হার দীর্ঘকাল ধরে প্রথাগত ভাবে নির্দিষ্ট হয়ে আছে, এবং তাকে নামিয়ে আনতে গেলে বিশেষ বিশেষ অসুবিধার মুখোমুখি হতে হবে, তেমন বিল ক্ষেত্রগুলিতে মালিকেরা সংখ্যাভিত্তিক মজুরিকে বাধ্যতামূলক ভাবে সময়-ভিত্তিক মজুরিতে রূপান্তর সাধনের আশ্রয় নেয়। এই কারণেই ১৮৬০ সালে কভেন্টির রিবন শ্রমিকদের মধ্যে এক বিরাট ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছিল।[১১] সর্বশেষে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি হচ্ছে ঘণ্টাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অবলম্বন, যে-ব্যবস্থার কথা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।[১২]
এতদূর পর্যন্ত যা দেখানো হল, তা থেকে অনুসরণ করে যে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপ। যদিও কোন ক্রমেই নোতুন নয়-চতুর্দশ শতাব্দীর ফাসী ও ইংরেজ শ্রম-আইনে সময়-ভিত্তিক মজুরির পাশাপাশি এরও উল্লেখ আছে-তবু যথার্থ ভাবে যাকে বলা যায় ম্যানুফ্যাকচার-যুগ; সেই যুগেই কেবল সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি প্রথা এক বৃহত্তর কর্ম-পরিধিতে তার আধিপত্য বিস্তার করে। আধুনিক শিল্পের ঝঙ্কা-মুখর যৌবনে, বিশেষ করে ১৭৯৭ থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি শ্রম-দিবস সম্প্রসারণে এবং মজুরি সংকোচনের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। ঐ সময়কার মজুরি হ্রাস-বৃদ্ধির খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব মাল মশলা এই ‘ব্লু-বুক’গুলিতে পাওয়া যাবে : “শস্য আইন সংক্রান্ত আবেদনসমূহ প্রসঙ্গে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন ও সাক্ষ্য” (১৮১৩-১৪ সালের সংসদ-অধিবেশন) এবং “দানা-শস্যের বৃদ্ধি, বাণিজ্য ও ব্যবহার ও তৎসংক্রান্ত যাবতীয় আইন প্রসঙ্গে লর্ড কমিটির প্রতিবেদন” (১৮১৪-১৫ সালের অধিবেশন)। জ্যাকোবিন-বিরোধী যুদ্ধের সূচনা থেকে মজুরি-হ্রাসের প্রামাণ্য সাক্ষ্য আমরা এখানে পাই। নমুনা হিসাবে, বয়ন শিল্পে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি এত কমে গিয়েছে যে, শ্রম-দিবসের দারুৰ বৃদ্ধি ঘটানো সত্ত্বেও দৈনিক মজুরি তখন দাঁড়িয়েছিল আগের চেয়েও কম। তুলো-তন্তুবায়দের আসল মজুরি এখন আগের তুলনায় অনেক কম; মামুলি মজুরের তুলনায় এক সময়ে তার অবস্থান ছিল অনেক উপরে; এখন তা প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই লোপ পেয়েছে। বস্তুতঃ পক্ষে, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের মজুরির পার্থক্য এখন আগেকার তুলনায় চের কম।”[১৩] সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির মাধ্যমে শ্রমের তীব্রতা ও দীর্ঘতা বৃদ্ধি কৃষি-মজুর কত সামান্য উপকার করেছে, তা জমিদার ও কৃষকদের পক্ষের একটি বই থেকে উদ্ধত এই অনুচ্ছেদটি থেকেও বোঝা যাবে, “কৃষির অধিকাংশ কাজকর্মই করানো হয় দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া করা লোকদের দিয়ে কিংবা সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির হিসাবে, তাদের সাপ্তাহিক মজুরি প্রায় ১২ শিলিং এবং যদিও এটা ধরে নেওয়া যায় যে অধিকতর কর্ম-প্রেরণার দরুন সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি-হারে মানুষ সাপ্তাহিক মজুরির তুলনায় ১ শিলিং, হয়তো ২ শিলিং বেশি পায়, তবু তার মোট হিসাব করে দেখা যায় যে, সারা বছরে তার কর্মহানি-জনিত ক্ষতি তার লাভকে ছাড়িয়ে যায়। অধিকন্তু, সাধারণ ভাবে এটাও দেখা যাবে যে এই লোকগুলির মজুরির সঙ্গে জীবনধারণের উপায়-উপকরণের দামের একটা বিশেষ আনুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে, যার ফলে দুটি সন্তান সহ একজন মানুষ ‘প্যারিশ থেকে সাহায্য ছাড়াও তার পরিবার প্রতিপালন করতে পারে।”[১৪] পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যাদি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যালথাস তখন বলেন, “আমি স্বীকার করছি যে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির বিপুল বিস্তৃতিকে আমি সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখি। দিনের ১২১১৪ ঘণ্টা, এমনকি তারও বেশি সময়, বস্তুতই কঠোর পরিশ্রম যে-কোন মানুষের পক্ষেই অসহনীয়।” [১৫]
