—এই ভগ্নাংকটির দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় উৎপাদকের কর্মক্ষমতার দ্বারা।[১]
এই আপাত রূপের উপরে ন্যস্ত যে বিশ্বাস, তা এই ঘটনা থেকে এক প্রথম প্রচণ্ড ধাকা খাওয়া উচিত যে শিল্পের একই শাখাসমূহে এই দ্বিবিধ রূপের মজুরিই পাশাপাশি, যুগপৎ প্রচলিত থাকে; যেমন লণ্ডনের কম্পজিটারের সাধারণ রীতি অনুসারে কাজ করে থাকে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি অনুযায়ী—সময়-ভিত্তিক মজুরি সেখানে ব্যতিক্রম মাত্র; অথচ মফস্বলের কম্পজিটারের কাজ করে থাকে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি সেখানে ব্যতিক্রম মাত্র।[২]
লণ্ডনের একই ‘জিন তৈরির কর্মশালাগুলিতে ফরাসীদের দেওয়া হয় সংখ্যা ভিত্তিক মজুরি কিন্তু ইংরেজদের দেওয়া হয় সময়-ভিত্তিক মজুরি। যে-সমস্ত নিয়মিত কারখানায় সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিই সর্বত্র আধিপত্য কয়ে, সেখানেও বিশেষ বিশেষ কাজ এই ধরনের মজুরির পক্ষে অনুপযোগী এবং সেইজন্য মজুরি দেওয়া হয় সময়ের হিসাবে।[৩] কিন্তু এটা স্বতঃস্পষ্ট যে মজুরি দেবার দুটি রূপের মধ্যে এই পার্থক্য কোনক্রমেই তাদের মর্মগত প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় না, যদিও একটি বিশেষ রূপ ধনতান্ত্রিক বিকাশের পক্ষে অন্য রূপটির তুলনায় বেশি অনুকুল হতে পারে।
ধরা যাক, একটি সাধারণ শ্রম-দিবস গঠিত হয় ১২টি ঘণ্টা নিয়ে, যার মধ্যে, ৬টি মজুরি-প্রদত্ত এবং ৬টি মজুরি-বঞ্চিত। ধরা যাক, তার মূল্য-ফল ৬ শিলিং, অতএব ১ ঘণ্টা শ্রমের মূল্য-ফল হবে ৬ পেন্স। আরো ধরা যাক যে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, একজন শ্রমিক—যে কাজ করে গছ-পরিমাণ তীব্রতা ও দক্ষতা সহকারে, অতএব, যে বাস্তবিক পক্ষে দেয় একটি দ্রব্য উৎপাদনে যতটা শ্রম সামাজিক ভাবে আবশ্যক, কেবল সেই পরিমাণ শ্রম—সে সরবরাহ করে ১২ ঘণ্টায় ২৪টি জিনিস; হয়, প্রত্যেকটি একক আলাদা আলাদা আর, নয়তো, একটি অখণ্ড সমগ্র সামগ্রীর খণ্ড খণ্ড ভাবে পরিমেয় অংশ। তা হলে, এই ২৪টি এককের মূল্য থেকে তাদের মধ্যে বিধৃত স্থির মূলধন বাবদ একটি অংশ বিয়োগ করে রাখার পরে তা দাড়ায় ৬ শিলিং এবং একটি এককের মূল্য দাঁড়ায় ৩ পেন্স। শ্রমিক প্রত্যেক একক-প্রতি পায় ১.৫ পেন্স, এবং এই ভাবে ১২ ঘণ্টায় আয় করে ৩ শিলিং। ঠিক যেমন সময়-ভিত্তিক মজুরির বেলায়, এতে কিছু এসে যায় না যে আমরা কি ধরে নিলাম—শ্রমিক নিজের জন্য ৬ ঘণ্টা এবং খনিকের অন্য ৬ ঘণ্টা কাজ করছে, নাকি, প্রত্যেকটি ঘণ্টার অর্ধেকটা করছে নিজের জন্য এবং অর্ধেকটা ধনিকের জন্য, ঠিক তেমনি এখানেও কিছু এসে যায় না যে আমরা কি ধরে নিলাম—প্রত্যেকটি এককের অর্ধেকটার জন্য মজুরি দেওয়া হয়, অর্ধেকটার জন্য দেওয়া হয় না, নাকি, ১২টি একক ধারণ করে কেবল শ্রমশক্তির সম-পরিমাণ মূল্য এবং বাকি ১২টি ধারণ করে উদ্বৃত্ত-মূল্য।
সময়-ভিত্তিক মজুরি যেমন অযৌক্তিক, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিও তেমন অযৌক্তিক। যেখানে আমাদের উল্লিখিত দৃষ্টান্তটিতে, পরিভুক্ত উৎপাদন-উপকরণসমূহের মূল্য বিয়োগ করে রাখার পরে একটি পণ্যের দুটি এককের মূল্য-ঐ দুটি একক এক ঘণ্টার শ্রম-ফল হবার দরুন—দাড়ায় ৬ পেন্স, সেখানে শ্রমিক তাদের জন্য পায় দাম হিসাবে। ৩ পেন্স। সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি, বস্তুতঃ পক্ষে, কোনো মূল্য-সম্পর্ক স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে না। সুতরাং, তার মধ্যে কতটা কাজের সময় বিধৃত আছে, তা দিয়ে একটি জিনিসের মূল্য নির্ধারণের প্রশ্ন এটা নয়; বরং, উটো, কতটা কাজের সময় শ্রমিক তার উপরে ব্যয় করেছে, তাকে তার উৎপন্ন জিনিসগুলির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করার প্রশ্ন। সময়-ভিত্তিক মজুরিতে শ্রমকে পরিমাপ করা হয় তার তাৎক্ষণিক স্থিতিকাল অনুসারে, সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরিতে শ্রমকে পরিমাপ করা হয় দ্রব্যসম্ভারের পরিমাণ দিয়ে, যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়কালে শ্রম নিজেকে মূর্ত করেছে। [৪] শ্রম-সময়ের দাম নিজেই নির্ধারিত হয় এই সমীকরণের দ্বারা : এক দিনের শ্রমের মূল্য শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য। সুতরাং সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি হল সময়-ভিত্তিক মজুরির একটি উপযোজিত রূপ।
এখন সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরির স্বকীয় চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলি আরো একটু ঘনিষ্ঠ ভাবে বিবেচনা করা যাক।
শ্রমের গুণমান এখানে নিয়ন্ত্রিত হয় খোদ কাজেরই দ্বারা, একক-প্রতি দাম পুরোপুরি ভাবে পেতে হলে যাকে অবশ্যই হতে হবে গড় উৎকর্ষের অধিকারী। সুতরাং এদিক থেকে সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি হল মজুরি-দ্বাসের ও প্রতারণার সবচেয়ে ফলপ্রসূ উৎস।
সংখ্যা-ভিত্তিক মজুরি ধনিককে যোগায় শ্রম-তীব্রতার একটি সঠিক পরিমাপ। কেবল সেই পরিমাণ কাজের সময়, যা বিস্তৃত হয় একটি পূর্ব-নিরূপিত ও পরীক্ষামূলক ভাবে নির্ধারিত পণ্য-পরিমাণে, সেই পরিমাণ কাজের সময়কেই ধরা হয় সামাজিক ভাবে আবশ্যিক শ্রম-সময় হিসাবে এবং কেবল তারই জন্য মজুরি দেওয়া হয়। এই কারণে লণ্ডনের দর্জিদের বৃহত্তর কর্মশালাগুলিতে একটি বিশেষ কাজকে, যেমন একটি ওয়েস্ট কোটকে বলা হয় একটি ঘণ্টা কিংবা একটি আধ-ঘণ্টা’—যেখানে ঘণ্টা-প্রতি মজুরি হল ৬ পেন্স। এক ঘণ্টার গড় উৎপাদন কত, সেটা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা হয়ে যায়। নোতুন নোতুন ফ্যাশন, রিফুর কাজ ইত্যাদির ক্ষেত্রে, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে যায়, একটা বিশেষ কাজ কি এক ঘণ্টা, না এক ঘণ্টা নয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। যদি শ্রমিক গড় কর্মক্ষমতার অধিকারী না হয়, যদি সে দৈনিক একটা ন্যূনতম পরিমাণ কাজের যোগান দিতে না পারে, তা হলে তাকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয়।[৫]
