এই পরিতাপ আরো কৌতুহলকর, কেননা এতে প্রকাশ পায় উৎপাদন-সম্পৰ্কসমূহের নিছক বাহরূপটি ধনিকের মস্তিষ্কে কিভাবে নিজেকে প্রতিবিম্বিত করে। ধনিক জানে যে, শ্রমের স্বাভাবিক দামেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি-বঞ্চিত শ্ৰম অন্তর্ভূক্ত এবং ঠিক এই মজুরি-বঞ্চিত শ্রমই হচ্ছে তার লাভের স্বাভাবিক উৎস। উদ্বৃত্ত-মূল্যরূপ অভিধাটা তার কাছে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন, কেননা তা স্বাভাবিক শ্রমদিবসের মধ্যেই অন্তর্ভূক্ত, যার জন্য, সে মনে করে যে, সে প্রাপ্য মূল্য দৈনিক মজুরির আকারে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু “ওভারটাইম”-এর অস্তিত্ব, শ্রমের চলতি দাম অনুযায়ী শ্রম-দিবসের মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘতা-বিধানের অস্তিত্ব, তার কাছে আস্তত্বশীল। ছাড়-দামে বিক্রয়কারীর মুখোমুখি হয়ে, সে এমন কি এই বাড়তি সময়ের জন্য বাড়তি মজুরি পর্যন্ত দাবি করে। সে আবার এটাও জানে না যে, নিয়মিত কর্ম-কালের কাজের দামের মধ্যে যেমন মজুরি বঞ্চিত শ্রম অন্তর্ভূক্ত ঠিক তেমনি এই বাড়তি সময়ের বাড়তি দামের মধ্যেও মজুরি বঞ্চিত শ্রম অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টান্ত : ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের এক ঘণ্টার দাম ৩ পেন্স। ধরা যাক, একটি কাজের ঘণ্টার অর্ধাংশের ম-ফল; অন্য দিকে, ওভারটাইম কাজের ঘণ্টার দাম ও পেন্স কিংবা একটি কাজের ঘণ্টার ও ভাগ মূল্য-ফল। প্রথম ক্ষেত্রে, ধনিক বিনামূল্যে আত্মসাৎ করে কাজের ঘণ্টার অর্ধেকাংশ; দ্বিতীয়টিতে এক তৃতীয়াংশ।
————
১. স্বয়ং অর্থের মূল্যকে এখানে সব সময়ে ধরা হয়েছে স্থির বলে।
২. “শ্রমের দাম হল সেই পরিমাণ অর্থ, যা দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের বাবদে।” (স্যার এভোয়াড ওয়েস্ট, প্রাইস অব কর্ণ অ্যাণ্ড ওয়েজেস অব লেবর”, লণ্ডন ১৮২৬ পৃঃ ৬৭)। “জমিতে মূলধন প্রয়োগ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ” শীর্ষক অনামী লেখাটির লেখকও হলেন ওয়েস্ট। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের একজন সদস্য দ্বারা, লণ্ডন, ১৮১৫ সালে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের ইতিহাস একটি যুগান্তকারী রচনা।
৩. শ্রমের মজুরি নির্ভর করে শ্রমের দাম এবং সম্পাদিত শ্রমের পরিমাণের উপরে।শ্রমের মজুরি বাড়লে আবশ্যিকভাবেই শ্রমের দাম বাড়বে। এটা নাও ঘটতে পারে। পূর্ণতর কর্মনিয়োগ এবং অধিকতর পরিশ্রমের ফলে শ্রমের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, অথচ শ্রমের দাম একই থেকে যেতে পারে। “ওয়েস্ট, ঐ, পৃ ৬৭, ৬৮, ১১২। প্রধান প্রশ্নটি হল : “কিভাবে শ্রমের দাম নির্ধারিত হয়?” ওয়েস্ট অবশ্য মামুলি কথাবার্তা দিয়েই তার বক্তব্য শেষ করেন।
৪. আঠারো শতকের শিল্প-বুর্জোয়া শ্রেণীর গোঁড়া প্রতিনিধি, ট্রেড অ্যাণ্ড কমার্স এর সেই লেখকটি এটা লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁকে আমরা অনেকবার উদ্ধৃত করেছি, যদিও তিনি ব্যাপারটিকে উপস্থিত করেছেন গোলমেলে ভাবে: “শ্রমের দাম নয় ( যার দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন দৈনিক বা সাপ্তাহিক আর্থিক মজুরি ), শ্রমের পরিমাণ নির্ধারিত হয় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক সামগ্রীর দ্বারা অত্যাবশ্যক দ্রব্য সামগ্রীর দাম অত্যন্ত কমিয়ে দিন, আপনি শ্রমের পরিমাণও আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেবেন। মালিক ম্যানুফ্যাকচারারগণ জানে যে, শ্রমের দামের আর্থিক অঙ্ক আদল বদল করা ছাড়াও শ্রমের দাম বাড়ানোর বা কমানোর নানান উপায় আছে। (ঐ, পৃঃ ৪৮, ৩১)। তাঁর “থ্রী লেকচার্স অন দি রেট অফ ওয়েজেস লণ্ডন ১৮৩৮ এ এন অব সিনিয়র নাম না করেও ওয়েস্ট-এর বইটি ব্যবহার করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, “শ্রমিকের প্রধান আগ্রহ তার মজুর্বির পরিমাণটিতে”, (পৃঃ ১৫, অর্থাৎ শ্রমিকের প্রধান আগ্রহ সে যা পায় তাতে, তার মজুর্বির আর্থিক পরিমাণটিতে যা সে দেয় তাতে নয়, তার শ্রমের পরিমাণটিতে নয় !
৫. কর্মনিয়োগের সংখ্যায় এই অস্বাভাবিক হ্রাসের ফল আইনের দ্বারা প্রযুক্ত শ্রম-দিবসের সাধারণ হ্রাসের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রম-দিবসের অনাপেক্ষিক দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে প্রথমটির কিছু করার নেই, এবং তা যেমন ১৫ ঘণ্টার শ্রম-দিবসেও ঘটতে পারে, তেমন ৬ ঘণ্টার শ্রম-দিবসেও ঘটতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে শ্রমের স্বাভাবিক দাম গণনা করা হয় দিনে গড়ে ১৫ ঘণ্টা কর্মরত শ্রমিকের উপরে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দিনে ৬ ঘণ্টা হিসাবে। যদি সে একটি ক্ষেত্রে নিযুক্ত হয় কেবল ৭.৫ ঘণ্টার জন্য এবং অন্য ক্ষেত্রে কেবল ৩ ঘণ্টার জন্য, ফল দাড়ায় সেই একই।
৬. “লেস-তৈরিতে) উপরি-সময়ে মজুরির হার এত কম—ঘণ্টা-প্রতি ১/২ পেন্স ও ৩/৪ পেন্স থেকে ২ পেন্স-যে উপরি-সময়ের কাজের ফলে শ্রমিকের স্বাস্থ্যের ও সহ শক্তির যে ক্ষতি হয়, তার প্রতিতুলনায়, তা অত্যন্ত শোচনীয়। এইভাবে যে সামান্য বাড়তি আয় হয়, সেটুকুও খরচ করে ফেলতে হয় বাড়তি পুষ্টির জন্য”, (“শিশু নিয়োগ কমিশন, দ্বিতীয় বিপোর্ট”, পৃঃ ১৬, নং ১১৭)।
৭. যেমন, কাগজে রঙ লাগানোর কাজে এই শিল্পে কারখানা-আইন প্রযুক্ত হবার আগে। “আমরা খাওয়ার জন্য কোনো ছুটি না নিয়ে দিনের সাড়ে দশ ঘণ্টার কাজ শেষ করে ফেলি টা ৩০ মিনিটে আর তার পরে সবটাই ওভারটাইম’; এবং সন্ধ্যা ৬ বাজার আগে কদাচিৎ কাজ ছেড়ে ওঠি; সুতরাং, বাস্তবিক পক্ষে গোটা বছর ধরেই আমরা ‘ওভার-টাইম’ করি।” (শিশু-নিয়োগ কমিশন’-এর সমক্ষে মিঃ স্মিথের সাক্ষ্য প্রথম রিপোর্ট, পৃঃ ১২৫)।
