সেহেতু তা স্বভাবতই, যে মুহূর্ত থেকে শ্রম-দিবস একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টা দিয়ে আর গঠিত হয় না, সেই মুহূর্ত থেকেই, হারায় তার সকল তাৎপর্য। মূল্য-প্রদত্ত শ্রম এবং মূল্য-বঞ্চিত শ্ৰম-এই দুয়ের মধ্যে সংযোগ বিনষ্ট হয়ে যায়। তখন তাকে তার নিজের জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক কোনো শ্রম-সময় না দিয়েই ধনিক শ্রমিকের কাছ থেকে নিঙড়ে নিতে পারে একটা বিশেষ পরিমাণ শ্রম-সময়। নিয়োগের সমস্ত নিয়মিকতাকে সে ধ্বংস করে দিতে পারে, এবং তার নিজের তাৎক্ষণিক সুবিধা, খেয়াল ও স্বার্থ অনুযায়ী কখনো চাপিয়ে দিতে পারে অতিরিক্ত কাজের প্রচণ্ড গুরুভার কখনো চাপিয়ে দিতে পারে আংশিক বা সামগ্রিক কর্মহীনতা। “শ্রমের স্বাভাবিক দাম” দেবার ভাণ করে সে পারে শ্রমিকের জন্য আনুষঙ্গিক ক্ষতি পূরণের কোনো প্রকার সংস্থান না করেই কাজের দিনকে অস্বাভাবিক ভাবে দীর্ঘায়িত করতে। এই জন্য ১৮৬০ সালে লণ্ডনে ঘণ্টা প্রতি মজুরি চাপানোর যে চেষ্টা ধনিকেরা করেছিল, তার বিরুদ্ধে সেখানকার ইমারতি শিল্পগুলির শ্রমিকেরা সংগত কারণেই বিদ্রোহ করেছিল। শ্রম দিবসের আইনগত সীমা নির্দেশের ফলে এই ধরনের অপচেষ্টার অবসান ঘটে, যদিও তা মেশিনারির প্রতিমোগিতা, নিযুক্ত শ্রমিকদের গুণমানে পরিবর্তন এবং আংশিক বা সার্বিক সংকটের দ্বারা সংঘটিত কৰ্মহানির অবসান ঘটায় নি।
দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রমের দাম আর্থিক অঙ্কে স্থির থাকতে পারে, এবং তবু তার স্বাভাবিক মানের নীচে নেমে যেতে পারে। শ্রমের দাম ( কাজের ঘণ্টার হিসাবে) স্থির রেখে যত বার কাজের দিনকে তার প্রথাগত দৈর্ঘ্যের বাইরে দীর্ঘায়িত করা হয়, তত বার এই ব্যাপারটা ঘটে। যদি এই ভগাংকটিতেঃ শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য/ শ্রম-দিবস, ‘হর বৃদ্ধি পায়, তা হলে ‘লব’ বৃদ্ধি পায় আরো বেশি দ্রুতগতিতে। শ্রমশক্তির মূল্য, তার ক্ষয়-ক্ষতি-সাপেক্ষ হওয়ায়, তার কার্ষের স্থায়িত্বকালের সঙ্গে বৃদ্ধি পায় এবং সেই স্থায়িত্বকালের বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুততর অনুপাতে বৃদ্ধি পায়। অতএব, শিল্পের অনেক শাখায়, যেখানে কাজের সময়ের উপরে কোনো আইনগত সীমা-নির্দেশ ছাড়া সময়-ভিত্তিক মজুরিই সাধারণ নিয়ম, সেখানে কেবল একটি বিশেষ মাত্রা পর্যন্ত, যথা, দশম ঘণ্টার সমাপ্তি পর্যন্ত, শ্রম দিবসকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করার অভ্যাস স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই গড়ে উঠেছে ( স্বাভাবিক কাজের দিন”, “বরাজের কাজ”, “কাজের নিয়মিত সময়”)। এই মাত্রার বাইরে কাজ মানেই “ওভারটাইম”, এবং, ঘন্টার মাপের একক ধরে নিয়ে, এর জন্য দেওয়া হয় অপেক্ষাকৃত ভাল পারিশ্রমিক ( ‘বাড়তি মজুরি”) যদিও প্রায়ই এমন অনুপাতে যা হাস্যকরভাবে কম।[৬] স্বাভাবিক কাজের দিনটির অস্তিত্ব এখানে আসল কাজের দিনের একটি ভগ্নাংশ হিসাবে, এবং, প্রায়ই গোটা বছর জুড়ে, শেষোক্তটির স্থায়িত্ব, পূর্বোক্তটির চেয়ে দীর্ঘতর।[৭] একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে কাজের দিনের সম্প্রসারণের সঙ্গে শ্রমশক্তির দামে এই বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্রিটিশ শিল্পে এমন আকার ধারণ করে যে তথাকথিত স্বাভাবিক সময়ে নিচু দাম শ্রমিককে বাধ্য করে অপেক্ষাকৃত ভাল পারিশ্রমিকের বাড়তি-সময়ে (“ওভার-টাইম”-এ) কাজ করতে—যদি সে আদৌ যথেষ্ট মজুরি পেতে চায়।[৮] শ্রম দিবসের উপরে আইনগত সীমা আরোপ এই সুযোগের অবসান ঘটায়।[৯]
এটি একটি সাধারণ ভাবে পরিজ্ঞাত ঘটনা যে, শিল্পের কোনো শাখায় কাজের দিন যত দীর্ঘ হয়, মজুরি তত কম হয়।[১০] কারখানা-পরিদর্শক এ রেভগ্রেভ ১৮৩৯ থেকে ১৮৫৯ অবধি কুড়ি বছরের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনার সাহায্যে এটা প্রমাণ করেন, যে-পর্যালোচনায় দেখা যায় যে ঐ সময়ে ১০ ঘণ্টা আইনের অধীনে কারখানাগুলিতে মজুরি বেড়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে, ‘যে কারখানাগুলিতে কাজ চলত প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা, সেখানে মজুরি পড়ে গিয়েছিল।[১১]
‘শ্রমের দাম যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি নির্ভর করে ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণের উপরে”—এই নিয়মটি থেকে, সর্বপ্রথমে অনুসৃত হয় যে, শ্রমের দাম যত কম হবে, শ্রমের পরিমাণ অবশ্যই তত বেশি হবে, অথবা কাজের দিন অবশ্যই তত দীর্ঘ হবে-যাতে করে শ্রমিকের পক্ষে এমনকি শোচনীয় গড়পড়তা মজুরিটি পাওয়া সম্ভব হয়। শ্রমের দামের স্বল্পতা এখানে কাজ করে শ্রম-সময় সম্প্রসারণের প্রেরণা হিসাবে।[১২]
অপর পক্ষে আবার, কাজের সময়ের এই সম্প্রসারণ শ্রমের দামে পতন ঘটায় এক সেই সঙ্গে পতন ঘটায় দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিতে।
শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য /একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টার শ্রম-দিবস
এর দ্বারা শ্রমের মূল্যের নির্ধারণ প্রমাণ করে যে শ্রম-দিবসের শুধুমাত্র দীর্ঘতা-সাধন ঘটালে, তা শ্রমের দামে পতন ঘটাবে, যদি কোনো ক্ষতিপূরণের সংস্থান না হয়ে থাকে। কিন্তু যে-ঘটনাবলী ধনিককে অনুমতি দেয় শেষ পর্যন্ত শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করতে, তাই আবার তাকে প্রথমে অনুমতি দেয় এবং সর্বশেষে বাধ্য করে শ্রমের আর্থিক দাম হ্রাস করতে—যে পর্যন্ত না বর্ধিত ঘণ্টা-সংখ্যার মোট দাম হ্রাস করা হয় এবং, কাজে কাজেই, দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিও হ্রাস করা হয়। দুটি ঘটনার উল্লেখই এখানে যথেষ্ট। যদি একজন লোক ১২ জন বা দুজন লোকের কাজ করে, তা হলে শ্রমের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যদিও বাজারে শ্রমশক্তির সরবরাহ স্থির থাকে। শ্রমিকদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা ধনিককে সুযোগ করে দেয় শ্রমের দাম দাবিয়ে দিতে; অন্য দিকে, শ্রমের দামে এই পতন তাকে সুযোগ করে দেয় কাজের সময়[১৩] নিয়ে আরো মোচড় দিতে। অবশ্য, মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের অস্বাভাবিক পরিমাণের উপরে অর্থাৎ গড় সামাজিক পরিমাণের অতিরিক্ত পরিমাণের উপরে এই কর্তৃত্ব অচিরেই ধনিকদের নিজেদের মধ্যেই পারস্পরিক প্রতিযোগিতার উৎস হয়ে ওঠে। পণ্যের দামের একটা অংশ শ্রমের দাম দিয়ে তৈরি। শ্ৰম-দামের এই মজুরি-বঞ্চিত অংশ পণ্যের দামের মধ্যে ধরার আবশ্যকতা নেই। এটা ক্রেতার কাছে উপস্থিত করা যেতে পারে। এই হল প্রথম পদক্ষেপ, প্রতিযোগিতা যেখানে চালিয়ে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় যে পদক্ষেপে তা চালিয়ে নেয়, সেটা হল শ্রমদিবসের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করা হয় সেই উদ্বৃত্ত-মূল্যকে, অন্ততঃ তার একটা অংশকে, বাদ দেওয়া। এই ভাবে একটি অস্বাভাবিক ভাবে পড়ে যাওয়া পণ্যের বিক্রয়-দাম আবার উঠতে থাকে প্রথম দিকে অনিয়মিত ভাবে, তারপরে ধাপে ধাপে স্থিতিলাভ করে; তখন থেকে এই নিম্নতর বিক্রয়-দামই পরিণত হয় মাত্রাহীন কর্ম-কালের শোচনীয় পরিমাণ মজুরির স্থির ভিত্তিতে, যেমন একেবারে গোড়ায় তা ছিল এইসব ঘটনারই ফলশ্রুতি। মজুরির এই গতিবিধি এখানে কেবল মাত্র উল্লেখ করা হল, যেহেতু প্রতিযোগিতার বিশ্লেষণ আমাদের আলোচ্য বিষয়ের এই বিষয়ের এই অংশের অন্তর্ভুক্ত নয়। যাই হোক, ক্ষণেকের জন্য ধনিকের নিজের মুখেই তার কথা শোনা যাক : “বার্মিংহামে মালিকদের নিজেদের মধ্যে বড় একটা বেশি প্রতিযোগিতা নেই; নিয়োগকর্তা হিসাবে তাদের অনেকেই এমন কাজ করতে বাধ্য হয়, যা করতে অন্যথা তারা লজ্জা বোধ করত; এবং তবু আর বেশি টাকা করা হয় না; কিন্তু কেবল জনসাধারণই সুবিধাটা পায়।”[১৪] পাঠকরা স্মরণে রাখবেন যে, লণ্ডনে দুরকমের রুটি-প্রস্তুতকারক আছে, যাদের মধ্যে একরকমের প্রস্তুত কারকেরা তাদের রুটি বিক্রি করে তার পুরো দামে (“পুরো-দামী” রুটিওয়ালা), অন্য রকমের প্রস্তুতকারকেরা তাদের রুটি বিক্রি করে তার স্বাভাবিক দামের নীচে (নিচুদামী রুটিওয়ালা, (ছাড়-দামে বেচনেওয়ালা”)। পুরোদামী সংসদীয় তদন্ত কমিটির সামনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই বলে নিন্দা করে, “ওরা এখন টিকে আছে প্রথমতঃ জনসাধারণকে ঠকিয়ে এবং, তার পরে, তাদের লোকদের ১৮ ঘণ্টা কাজের বদলে ১২ ঘণ্টার মজুরি দিয়ে।’ঐ লোকগুলির মাগনা-আদায়-করা এমকে তৈরি করা হয় প্রতিযোগিতা চালাবার হাতিয়ারে এবং আজও পর্যন্ত তাই চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মালিক রুটি-প্রস্তুতকারীদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাই রাতের কাজ থেকে রেহাই পাবার পথে বাধা। একজন বিক্রেতা যে ছাড়-দামে বিক্রি করে অর্থাৎ ময়দার দামের খরচের হিসাবে রুটির যে-দাম হওয়া উচিত তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করে, সে অবশ্যই তা পুষিয়ে নেবে তার লোকগুলির শ্রমের বিনিময়ে। আমি যদি আমার লোকদের কাছ থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম পাই, আর আমার প্রতিবেশী পায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা, তা হলে সে আমাকে বিক্রির দামে হারিয়ে দেবে। লোকগুলি যদি বেশি কাজের জন্য বেশি মজুরির জন্য জিদ ধরতে পারত, তা হলে অবশ্য ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যেত।এই ছাড়-দামে বিক্রেতাদের দ্বারা নিযুক্ত শ্রমিকদের অনেকেই বিদেশী ও কিশোর, যারা যে-মজুরিই পাক না কেন, তাতেই খুশি থাকতে বাধ্য।”[১৫]
