যে পরিমাণ অর্থ[১] শ্রমিক তার দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি হিসাবে পায়, সেটা তার আর্থিক মজুরির পরিমাণ বা মূল্যের অঙ্কে পরিমিত তার মজুরির পরিমাণ। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, কর্ম-দিবসের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী, অর্থাৎ দৈনিক যতটা শ্রম কার্যত সরবরাহ করা হয়েছে তদনুযায়ী, একই দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি-শ্রমের অত্যন্ত বিভিন্ন দামের অর্থাৎ একই পরিমাণ শ্রমের জন্য অত্যন্ত বিভিন্ন পরিমাণ অর্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।[২] সুতরাং সময়-ভিত্তিক মজুরির বিষয় বিবেচনা করতে গিয়ে আমরা অবশ্যই আবার দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি ইত্যাদির মোট পরিমাণ এবং শ্রমের দামের মধ্যে পার্থক্য করব। তা হলে, এই দাম অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের এই আর্থিক মূল্য কিভাবে বার করা যায়। শ্রমের গড় দাম বার করা যায় যখন শ্রম-শক্তির গড় দৈনিক মূল্যকে কর্মদিবসের গড় ঘন্টার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। ধরা যাক, যদি শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য হয় ৩ শিলিং, তখন ৬টি শ্রম-ঘণ্টার উৎপন্ন-দ্রব্যের মূল্য, এবং যদি শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য হয় ১২ ঘণ্টা, তা হলে একটি শ্রম ঘণ্টার দাম হবে ৩/১২ শিলিং অর্থাৎ ৩ পেন্স।
এইভাবে প্রাপ্ত শ্রম-ঘণ্টার দামটি কাজ করে শ্রমের দামের একক পরিমাপ হিসাবে।
এ থেকে বেরিয়ে আসে যে, দৈনিক ও সাপ্তাহিক মজুরি ইত্যাদি একই থাকতে পারে, যদি শ্রমের দাম নিরন্তর কমেও যায়। যেমন, যদি অত্যন্ত কাজের দিনটি হয় ১০ ঘণ্টা এবং শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্যটি হয় ৩ শিলিং, তা হলে কাজের ঘণ্টাটির দাম হবে ৩.৬ পেন্স। যখনি কাজের দিনটি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ ঘণ্টা তখনি কাজের ঘণ্টার দাম কমে দাড়ায় ৩ পেন্স; যখনই বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ ঘণ্টা, তখনি এই দাম কমে আঁড়ায় ২.৪ পেন্স। এই সব সত্ত্বেও দৈনিক ও সাপ্তাহিক মজুরি থেকে যায় অপরিবর্তিত। বিপরীত দিকে দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বেড়ে যেতে পারে, যদিও শ্রমের দাম একই থাকে, কিংবা এমনকি পড়েও যায়। যেমন, যদি কাজের দিনটি ১০ ঘণ্টা এবং শ্রম শক্তির দৈনিক মূল্যটি ৩ শিলিং, তা হলে একটি কাজের ঘণ্টার দাম হবে ৩.৬ পেন্স। যদি ব্যবসা বাড়াবার দরুন শ্রমিক কাজ করে ১২ ঘণ্টা, তা হলে শ্রমের দাম অপরিবর্তিত থাকলে, তার দৈনিক মজুরি তখন, শ্রমের দামে কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি না। হয়েই, বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ৩ শিলিং ৭.২ পেন্স। একই ফল ফলবে যদি তার শ্রমের দীর্ঘতার পরিমাপ না বাড়িয়ে তার তীব্রতার পরিমাপ বাড়ানো হয়।[৩] তা হলে, শ্রমের দাম স্থির থাকলেও, এমনকি পড়ে গেলেও, আর্থিক দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বাড়তে পারে। শ্রমিকের পরিবারের আয়ের বেলাতেও এই একই জিনিস খাটে, যখনি পরিবারের অভিভাবকটির দ্বারা ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণ তার পরিবারের লোক জনদের শ্রমের দ্বারা বর্ধিত হয়। সুতরাং দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি হ্রাস না করেও শ্রমের দাম কমাবার বিবিধ পদ্ধতি আছে।[৪]
সাধারণ নিয়ম হিসাবে এটা বেরিয়ে আসে যে, দৈনিক, সাপ্তাহিক শ্রম ইত্যাদি নির্দিষ্ট থাকলে, দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি নির্ভর করে শ্রমের দামের উপরে, যা নিজেই পরিবর্তিত হয় শ্রমশক্তির মূল্যের সঙ্গে আর নয়ত তার দাম এবং তার মূল্যের মধ্যে পার্থক্যের সঙ্গে।
সময়-ভিত্তিক মজুরির এককগত পরিমাপ হল গড় শ্রম-দিবসের গড় ঘন্টাসংখ্যা দ্বারা বিভক্ত এক দিনের শ্রম-শক্তির ভাগফল (এক দিনের শ্রমশক্তি / একটি গড় শ্রম দিবসের ঘন্টা)। ধরা যাক, গড় শ্রম-দিবসের ঘন্টা সংখ্যা হল ১২ ঘণ্টা এবং শ্রম শক্তির দৈনিক মূল্য ৩ শিলিং। এই পরিস্থিতিতে একটি শ্রম-ঘণ্টার দাম হল ৩ পেল এবং তার মধ্যে উৎপাদিত মূল্য হল ৬ পেন্স। যদি এখন শ্রমিকটি নিযুক্ত খাকে ১২ ঘণ্টার কম (কিংবা সপ্তাহে ৬ দিনের কম), ধরা যাক ৬ বা ৮ ঘণ্টা, তা হলে, শ্রমের এই দাম থাকা-কালে, সে পায় দৈনিক ২ শিলিং বা ১ শিলিং ৬ পেন্স।[৫] যেহেতু আমাদের প্রকল্প ( হাইপোথসিস) অনুসারে, কেবল তার শ্রম-শক্তির মূল্যের সম পরিমাণ মূল্য উৎপাদন করতে তাকে দৈনিক গড়ে কাজ করতে হবে ৬ ঘণ্টা করে এবং যেহেতু ঐ একই প্রকল্প অনুসারে সে প্রত্যেকটি ঘণ্টার মাত্র অর্ধেকটা কাজ করে নিজের। জন্য আর বাকি অর্ধেকটা ধনিকের জন্য, এটা পরিষ্কার যে, সে যদি ১২ ঘণ্টার কম সময় নিযুক্ত থাকে, তা হলে সে ৬ ঘণ্টায় উৎপন্ন সামগ্রীর মূল্য নিজের জন্য পেতে পারে না। পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলিতে আমরা অত্যধিক পরিশ্রমের সর্বনাশা ফলগুলি দেখেছি; এখানে আমরা দেখছি অপ্রতুল কর্ম-নিয়োগ থেকে উদ্ভূত তার দুঃখ-দুর্দশার উৎসগুলি।
যদি ঘণ্টা-প্রতি মজুরি ধার্য হয়, যাতে করে ধনিক আর দিন-প্রতি বা সপ্তাহ-প্রতি মজুরি দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে না, কেবল সেই ক’ ঘণ্টার মজুরি দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যে ক’ ঘণ্টার জন্য শ্রমিককে নিযুক্ত করতে সে মনস্থ করে, সে তাকে ঘণ্টা-প্রতি মজুরি গণনার মূল ভিত্তিটির চেয়েও কিংবা শ্রমের দামের একক গত পরিমাপের চেয়েও অল্পতর সময়ের জন্য তাকে নিযুক্ত করতে পারে। যেহেতু একক নির্ধারিত হয় নিম্ন লিখিত অনুপাতটির দ্বারা :
শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য / একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টার শ্রম-দিবস
