আসুন, আমরা নিজেদেরকে এমন একজন শ্রমিকের জায়গায় বসাই, যে ১২ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে পায়, ধরুন, ৬ ঘণ্টা শ্রমের মূল্য, ধরুন, ৩ শিলিং। বস্তুতঃ পক্ষে, তার দিক থেকে, তার এই ১২ ঘণ্টার শ্রম হচ্ছে তার ৩ শিলিং কেনার উপায়। তার জীবন ধারণের মামুলি উপকরণাদির মূল্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার শ্রমশক্তির মূল্যও পরিবর্তিত হতে পারে, ৩ শিলিং থেকে ৪ শিলিং-এ, বা ৩ শিলিং থেকে ২ শিলিং-এ; অথবা যদি তার শ্রমশক্তির মূল্য স্থির থাকে, তাহলে চাহিদা ও যোগানের সম্পর্কে পরিবর্তন অনুযায়ী তার দাম বেড়ে গিয়ে, ৪ শিলিং হতে পারে বা কমে গিয়ে ২ শিলি; হতে পারে। সে কিন্তু সব সময়ই দিচ্ছে ১২ ঘণ্টা শ্রম। এই ঘটনাটি অ্যাডাম স্মিথকে, যিনি শ্রম-দিবসকে গণ্য করতেন একটি স্থির রাশি[৮] হিসাবে, এই ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দিয়েছিল যে শ্রমের মূল্য স্থির থাকে, যদিও জীবনধারণের উপায়-উপকরণের মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে, এবং, সেই কারণে, একই শ্রম-দিবস শ্রমিকের কাছে নিজেকে উপস্থিত করতে পারে বেশি বা কম টাকা হিসাবে।।
অন্য দিকে আসুন ধনিকের অবস্থাটা বিবেচনা করে দেখি। সে চায় যত কম টাকা দিয়ে যত বেশি শ্রম পাওয়া যায়, তাই পেতে। সুতরাং কার্যক্ষেত্রে একমাত্র যে জিনিসটিতে তার আগ্রহ থাকে, সেটি হল শ্রমশক্তির দাম এবং যে-মূল্য ঐ শ্রম শক্তির কাজের দ্বারা সৃষ্ট হয় সেই মূল্যের মধ্যেকার পার্থক্যটি। কিন্তু, সেখানে সে চায় যত সস্তায় সম্ভব সব জিনিস ক্রয় করতে এবং সময়ই তার মুনাফার কারণ হিসাবে দেখায় তার প্রতারণামূলক লেন-দেনকে—মূল্যের তুলনায় কমে ক্রয় করে মূল্যের তুলনায় বেশিতে বিক্রয় করার ব্যাপারটিকে। সুতরাং সে কখনো দেখতে পায় না, শ্রমের মূল্যের মত কোন একটা কিছু যদি সত্যই থাকত, এবং সে এই মূল্য দিয়ে দিত, তা হলে কোনো মূলধন থাকত না, তার অর্থ মূলধনে রূপান্তরিত হত না।
অধিকন্তু, মজুরির আসল গতিবিধি এমন সব বাহরূপ উপস্থিত করে, যা যেন প্রমাণ করে যে শ্রমশক্তির মূল্য বাবদে কিছু দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় তার কাজের মূল্য বাবদে, স্বয়ং শ্রমের মূল্য বাবদে। এই সব বাহ্য-রূপকে আমরা দুটি বড় বড় শ্রেণীতে বিভক্ত করতে পারি : (১) শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মজুরির পরিবর্তন। কেউ অনুরূপ ভাবে এই সিদ্ধান্তেও আসতে পারেন যে, একটি মেশিনের মূল্য দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় তার কাজের মূল্য, কেননা এক দিনের জন্য একটি মেশিনকে ভাড়া করতে যা খরচ হয়, এক সপ্তাহের জন্য সেটাকে ভাড়া করলে তার চেয়ে বেশি খরচ হয়। (২) একই ধরনের কাজ করে এমন বিভিন্ন শ্রমিকের মজুরিতে। ব্যক্তিগত পার্থক্য। ক্রীতদাসপ্রথায়, যেখানে কোনো কথার মারপ্যাচ না করে, খোলাখুলি ও অবাধে খোদ শ্রমশক্তিই বিক্রি হয়, সেখানে আমরা এই পার্থক্য প্রত্যক্ষ করি, কিন্তু তার দ্বারা প্রতারিত হই না। একমাত্র ক্রীতদাসপ্রথাতেই গড়ের তুলনায় উচ্চতর একটি শ্রমশক্তির সুবিধা এবং গড়ের তুলনায় নিম্নতর একটি শ্রমশক্তির অসুবিধা দাস-মালিককে প্রভাবিত করে; মজুরি-শ্রম প্রথায় তা স্বয়ং শ্রমিককে প্রভাবিত করে, কেননা এক ক্ষেত্রে সে নিজেই তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে, অন্য ক্ষেত্রে তৃতীয় এক ব্যক্তি তা বিক্রি করে।
বাহ্য-রূপ প্রসঙ্গে “শ্রমের মূল্য ও দাম” কিংবা “মজুরি” বাকি বিষয়ের ক্ষেত্রে তন্মধ্যে প্রকাশিত মর্মগত সম্পর্কের প্রতি তুলনায়, অর্থাৎ শ্রম-শক্তিমূল্য ওদামের প্রতি তুলনায়, সেই পার্থক্য বলবৎ থাকে, যা বলবৎ থাকে সমস্ত বাহ্য-রূপ এবং তাদের প্রচ্ছন্ন অন্তর্বর মধ্যে। প্রথমটি প্রত্যক্ষ ও স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে প্রতিভাত হয় প্রচলিত চিন্তাধারা হিসাবে; দ্বিতীয়টিকে প্রথমত আবিষ্কৃত হতে হয় বিজ্ঞানের দ্বারা। চিরায়ত অর্থতত্ত্ব জিনিসগুলির সত্যকার সম্পর্কের কিনারা প্রায় স্পর্শ করেছিল, যদিও সচেতনভাবে তাকে সূত্রায়িত করতে পারে নি। যতক্ষণ পর্যন্ত বুর্জোয়া চামড়া তার গায়ে লেগে থাকবে, ততক্ষণ সে তা করতেও পারবে না।
————
১. ‘মিঃ রিকার্ডো যথেষ্ট কৌশল সহকারে একটা সমস্যা পরিহার করেন, যে-সমস্যাটা, প্রথম দৃষ্টিতে, তার এই মতবাদকে . আচ্ছন্ন করে ফেলার আশংকা সৃষ্টি করেছিল : মূল্য নির্ভর করে উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমের উপরে। যদি এই নীতির প্রতি কঠোর ভাবে নিষ্ঠাবান হতে হয়, তা হলে এই সিদ্ধান্ত টানতে হয় যে, শ্রমের মূল্য নির্ভর করে তার উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমের উপরে- যা স্পষ্টতই অসম্ভব। সুতরাং একটা সুকৌশলী মোচড় মেরে মিঃ রিকার্ডো শ্রমের মূল্যকে নির্ভরশীল করে তোলেন মজুরি উৎপাদন করতে যে-পরিমাণ শ্রম লাগে, তার উপরে; কিংবা তাঁকে যদি নিজের ভাষাতেই বলার সুবিধা দেওয়া যায়, তিনি পোষণ করেন যে, শ্রমের মূল্য হিসাবে করতে হবে মজুরি উৎপাদন করতে যে পরিমাণ শ্রমের দরকার হয় তার দ্বারা; যার দ্বারা তিনি বোঝাতে চান শ্রমিককে প্রদত্ত অর্থ বা পণ্য উৎপাদন করতে যে-পরিমাণ শ্রমের দরকার হয় তাই। ওকথা বলার মানেও যেমন, একথা বলার মানেও তেমন যে, কাপড়ের মূল্যের হিসাব করা হয় তার উৎপাদনে যে-পরিমাণ শ্রম অর্পিত হয়, তার দ্বারা নয়; হিসাব করা হয় ঐ কাপড়ের বিনিময়ে যে রুপো পাওয়া যায়, সেই রুপো উৎপাদনে কতটা শ্রম অর্পিত হয়েছে তার দ্বারা। (এ ক্রিটিক্যাল ডিলারটেশন অন দি নেচর অব ভ্যালু, পৃঃ ৫৩, ৫১)।
