এর পরে আসুন আমরা দেখি কিভাবে এই রূপান্তরিত অবস্থায় শ্রমশক্তির মূল্য ( এবং মজুরি) তাদের নিজেদেরকে উপস্থিত করে।
আমরা জানি যে, শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য হিসাব করা হয় শ্রমিকের জীবনের একটি বিশেষ দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে, যার সঙ্গে আবার সাযুজ্যপ্রাপ্ত হয় শ্রম-দিবসের একটি বিশেষ দৈর্ঘ্য। ধরা যাক, একটি প্রচলিত শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য হল ১২ ঘণ্টা এবং শ্রমশক্তি দৈনিক মূল্য হল ৩ শিলিং-৬ ঘণ্টার এমকে বিস্তৃত করে এমন একটি মূল্যের আর্থিক অভিব্যক্তি। যদি শ্রমিক পায় ৩ শিলিং, তা হলে সে তার শ্রমশক্তির মূল্য পায়, যা কাজ করে ১২ ঘণ্টা ধরে। এখন, যদি এক দিনের শ্রমশক্তির এই মূলকে খোদ এক দিনের শ্রমের মূল্য হিসাবে প্রকাশ করা হয়, তা হলে আমরা এই সূত্রটিতে উপনীত হই : ১২ ঘণ্টার শ্রমের মূল্য ৩ শিলিং। শ্রমশক্তির মূল্য এই ভাবে নির্ধারিত করে শ্রমের মূল্যকে অথবা আর্থিক অঙ্কে প্রকাশ করলে, শ্রমের আবশ্যিক দামকে। অন্যদিকে, যদি শ্রমশক্তির দাম তার মূল্য থেকে পৃথক করা হয়, তা হলে, অনুরূপ ভাবে শ্রমের দামও তার তথাকথিত মূল্য থেকে পৃথক হয়।
যেহেতু শ্রমের মূল্য শ্রমশক্তির মূল বোঝাবার পক্ষে কেবল একটি অযৌক্তিক ভাষা, এটা অবশ্যই অনুসরণ করে যে শ্রমের মূল্য সব সময়েই হবে তার উৎপাদিত মূল্যের তুলনায় কম, কেননা শ্রমশক্তির আপন মূল্য পুনরুৎপাদন করতে যতটা সময় লাগে ধনিক তাকে সব সময়েই দীর্ঘতর সময় কাজ করতে বাধ্য করে। উল্লিখিত দৃষ্টান্তটিতে, ১২ ঘণ্টা ধরে কাজ করে যে শ্রমশক্তি তার মূল্য হল ৩ শিলিং—এমন একটি মূল্য যা পুনরুৎপাদনের জন্য লাগে ৩ ঘণ্টা। অন্য দিকে, উক্ত শ্রমশক্তি যে-মূল্য উৎপাদন করে, তার মূল্য হল ৬ শিলিং, কারণ বস্তুতঃ পক্ষে তা কাজ করে ১২ ঘণ্টা ধরে, এবং তা যে-মূল্য উৎপাদন করে, সেই মূল্য তার নিজের মূল্যের উপরে নির্ভর করে না, নির্ভর করে তা যত সময় কাজ করে তার দৈর্ঘ্যের উপরে। তা হলে আমরা এমন একটি ফল পাই যা প্রথম দৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হয় : যে, শ্রম সৃষ্টি করে ৬ শিলিং মূল্য, তার নিজের মূল্য ৩ শিলিং।[৬]
আমরা আরো দেখতে পাই : ৩ শিলিং মূল্য, যার দ্বারা দিবসটির মাত্র একটি অংশের মূল্য দেওয়া হয়, তা প্রতিভাত হয়, সমগ্র ১২ ঘণ্টার শ্রম-দিবসটির মূল্য বা দাম হিসাবে–যে ১২ ঘণ্টায় অন্তর্ভুক্ত আছে এমন ৬টি ঘণ্টা যার জন্য মূল্য দেওয়া হয়নি। এই ভাবে মজুরি-রূপ শ্রম-দিবসের আবশ্যিক ও উদ্বত্ত-শ্রমে, মূল্য-প্রদত্ত ও মূল্য বঞ্চিত শ্রমে বিভাজনের সকল চিহ্নকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সমস্ত শ্রমই প্রতিভাত হয় মূল্য-প্রদত্ত শ্রম হিসাবে। বেগরি প্রথায়, শ্রমিকের নিজের জন্য শ্রম হিসাবে। বেগার প্রথায়, শ্রমিকের নিজের জন্য শ্রম এবং তার প্রভুর জন্য তার বাধ্যতামূলক শ্রম এই দুয়ের মধ্যে স্থান ও কালের দিক থেকে পার্থক্য যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দাস-এমে এমনকি এমদিবসের যে অংশে দাস কেবল তার নিজের জীবন ধারণের উপকরণাদি প্রতিস্থাপন করে, অতএব, যে অংশে, সে কেবল তার নিজের জন্যই কাজ করে, সেই অংশটিও প্রতিভাত হয় মালিকের জন্য তার কাজ হিসাবে। দাসের সমস্ত এমই প্রতিভাত হয় মূল্য-বঞ্চিত শ্রম হিসাবে।[৭] মজুরি-শ্রমে, বিপরীত, এমন কি উদ্বৃত্ত-শ্রমও, কিংবা মূল্য-বঞ্চিত শ্রমও প্রতিভাত হয় মূল্য-প্রদত্ত শ্রম হিসাবে। ওখানে সম্পত্তি-সম্পর্ক দাসের নিজের জন্য কৃত শ্রমকে লুকিয়ে রাখে; এখানে অর্থ-সম্পর্ক মজুরি শ্রমিকের প্রতিদান-বঞ্চিত এমকে লুকিয়ে রাখে।
সুতরাং মজুরির রূপে, যা খোদ শ্রমের মূল্য ও দামের রূপে ম-শক্তির রূপান্তরণের চূড়ান্ত গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারি। এই যে বাহ রূপ, যা আসল সম্পর্কটিকে অদৃশ্য করে রাখে এবং বাস্তবিক পক্ষে, সেই সম্পর্কের প্রত্যক্ষ বিপরীতটিকেই প্রদর্শন করে থাকে-এই বাহরূপটিই শ্রমিক এবং ধনিক উভয়েরই সমস্ত আইনগত ধারণার, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রণালীর সমস্ত রহস্যময়তার, স্বাধীনতা সম্পর্কে তার সমস্ত বিভ্রমের, হাতুড়ে অর্থতাত্ত্বিকদের সমস্ত ক্রটিস্বীকারসূচক বক্তব্য-পরিবর্তনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।
ইতিহাস যদি মজুরির মূলদেশে উপনীত হতে দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকে, তা হলে, অন্য দিকে, এই মজুরি-রূপটির আবশ্যিকতা, অস্তিত্বের আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করার তুলনায় সহজতর আর কিছুই নেই।
মূলধন এবং শ্রমের মধ্যে বিনিময় প্রথমে আমাদের মনের কাছে হাজির হয় অন্যান্য পণ্যদ্রব্যাদির ক্রয়-বিক্রয়ের মত একই চেহারায়। ক্রেতা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেয়, বিক্রেতা দেয় অর্থ থেকে প্রকৃতিগতভাবে আলাদা একটি জিনিষ। আইনবিদের চেতনা এখানে উপলব্ধি করে বড় জোর একটি বস্তুগত পার্থক্য, যা অভিব্যক্ত হয়েছে আইনগতভাবে সমরূপ এই সূত্রটির মধ্যে। “Do ut des, do ut facias, facio ut des, facio ut facias”
অধিকন্তু, বিনিময়মূল্য ও ব্যবহার-মূল্য হল অপরিমেয় রাশি; তাই শ্রমের মূল্য, শ্রমের দাম” এই কথাগুলি “তুলোর মূল্য” “তুলোর দাম কথাগুলির তুলনায় বেশি যুক্তিহীন নয়। তা ছাড়া, শ্রমিককে তার প্রাপ্য দেওয়া হয় সে শ্রম দিয়ে দেবার পরে। মূল্য দানের উপায় হিসাবে অর্থের যে ভূমিকা, সেই ভূমিকা অনুযায়ী, অর্থ পরে সরবরাহ কৃত জিনিসটির মূল্য বা দামটি এই বিশেষ ক্ষেত্রে সরবরাহকৃত শ্রমের মূল্য বা দামটি -বাস্তবায়িত করে। সর্বশেষে, শ্রমিক ধনিককে যে ব্যবহার-মূল্য সরবরাহ করে তা আসলে তার শ্রমশক্তি নয়, তা হচ্ছে শ্রমশক্তির কাজ, কোন নির্দিষ্ট প্রয়োজন-পূর্বক শ্রম, দর্জির কাজ, জুতো তৈরি, সুতো কাটা ইত্যাদি। এই একই শ্রম যে আবার বিশ্বজনীন মূল্যসৃজনী উপাদান, এবং সেই কারণে এমন একটি গুণ যা তাকে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে স্বতন্ত্রতা দান করে, তা মামুলি বুদ্ধির ধারণার বাইরে।
