ঊনবিংশ অধ্যায় — শ্রমশক্তির মূল্যের (এবং যথাক্রমে দামের) মজুরিতে রূপান্তর
বুর্জোয়া সমাজের উপরিতলে শ্রমিকের মজুরি প্রতিভাত হয় শ্রমের দাম হিসাবে, একটি বিশেষ পরিমাণ শ্রমের জন্য ব্যয়িত একটি বিশেষ পরিমাণ অর্থ। এই জন্যই লোকে শ্রমের মূল্যের কথা বলে এবং অর্থের অঙ্কে তার অভিব্যক্তিকে তার আবশ্যিক বা স্বাভাবিক দাম বলে অভিহিত করে। এবং এই মূল্যের পরিমাণকে আমরা কি ভাবে পরিমাপ করি? তার মধ্যে বিধৃত শ্রমের পরিমাণ দিয়ে। তা হলে, ধরা যাক, ১২ ঘণ্টার একটি শ্রমদিবসের মূল্য কি ভাবে নিরূপিত হয়? ১২ ঘণ্টার একটি শ্রম দিবসের মধ্যে বিধৃত ১২ ঘণ্টা দ্বারা; এটা একই কথার একটি আজগুবি পুনরাবৃত্তি।[১]
বাজারে পণ্য হিসাবে বিক্রীত হতে হলে, বিক্রয়ের আগে শ্রমের অস্তিত্ব সর্ব ক্ষেত্রেই আবশ্যিক। কিন্তু শ্রমিক যদি তাকে একটি স্বতন্ত্র বাস্তব অস্তিত্ব দান করতে পারত, তা হলে সে একটি পণ্যই বিক্রয় করত, শ্রম বিক্রয় করত না।[২]
এই সমস্ত স্ববিরোধ ছাড়াও, জীবন্ত শ্রমের সঙ্গে অর্থের, তথা রূপায়িত শ্রমের প্রত্যক্ষ বিনিময় হয়, মূল্যের নিয়মটির-যে নিয়মটি ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ভিত্তিতে সবেমাত্র নিজেকে অবাধে বিকশিত করতে শুরু করে, সেই নিয়মটির—অবসান ঘটাবে, আর নয়তে, মজুরি-শ্রমের উপরে প্রত্যক্ষত প্রতিষ্ঠিত খোদ ধনতান্ত্রিক উৎপাদনেরই অবসান ঘটাবে। ১২ ঘণ্টার একটি শ্রম-দিবস নিজেকে মূর্ত করে একটি অর্থ-মূল্যে, ধরা যাক, ৬ শিলিংয়ে। হয়, দুটি তুল্যমূল্যের মধ্যে বিনিময় ঘটে এবং তখন শ্রমিক তার ১২ ঘণ্টার শ্রমের জন্য ৬ শিলিং প্রাপ্ত হয়; তার শ্রমের দাম তার উৎপন্ন দ্রব্যের দামের সমান হয়। এই ক্ষেত্রে সে তার শ্রমের ক্রেতার জন্য কোনো উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করে না, ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ভিত্তিটাই অন্তর্হিত হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক এই ভিওিটির উপরেই সে তার শ্রম বিক্রি করে এবং তার শ্রম হচ্ছে মজুরি-শ্রম। আর নয়তো, সে তার ১২ ঘণ্টার শ্রমের জন্য পায় ৬ শিলিংয়ের কম অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার শ্রমের চেয়ে কম। ১২ ঘণ্টার শ্রমের সঙ্গে বিনিময় ঘটে ১৩, ৬ ইত্যাদি ঘণ্টার শ্রম। অসম দুটি পরিমাণের সমতা-বিধান কেবল একটি আত্ম-বিধ্বংসী স্ববিরোধ এমন কি কোন ভাবেই একটি নিয়ম হিসাবেও বিধৃত বা সূত্রায়িত করা যায় না।
রূপায়িত শ্রম এবং জীবন্ত শ্রম-এই রূপগত পার্থক্যের মধ্যে বেশি শ্রমের সঙ্গে অল্প শ্রমের বিনিময়ের কোন সুত্র বার করা নিরর্থক।[৩] এটা আরও আজগুবি, কেননা একটি পণ্যের মূল্য তার মধ্যে সত্য সত্যই রূপায়িত হয়েছে এমন শ্রমের পরিমাণ দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনের জন্য আবশ্যক জীবন্ত শ্রমের পরিমাণ দ্বারা। ধরা যাক, একটি পণ্য ৬টি শ্রম ঘণ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। যদি এমন একটা আবিষ্কার ঘটে যার দ্বারা ঐ পণ্যটি ৩ ঘণ্টাতেই করা যায়, তা হলে তার মূল্য, এমন কি যেটি আবিষ্কারের আগেই উৎপন্ন হয়েছে, তারও মূল্য অর্ধেক হয়ে যায়। আগে যে। পণ্যটি প্রতিনিধিত্ব করত ৬ ঘণ্টা আবশ্যিক শ্রমের, এখন তা প্রতিনিধিত্ব করে ৩ ঘণ্টা সামাজিক শ্রমের। এটা হচ্ছে ঐ পণ্যটি উৎপাদন করতে যতটা শ্ৰম লাগে, তার পরিমাণ, তার রূপায়িত আকার নয়, যার দ্বারা একটি পণ্যের মূল্যের পরিমাণ নিরূপিত হয়।
বাস্তবিক পক্ষে, বাজারে টাকার মালিকের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যার মুখোমুখি হয়, তা শ্রম নয় শ্রমিক। সে যা বিক্রি করে, তা হল তার শ্রম শক্তি। যে মুহূর্ত থেকে তার শ্রম কার্যতঃ আরম্ভ হয়, সেই মুহূর্ত থেকে সে আর তার শ্রমের মালিক থাকে না, সুতরাং তখন সে আর তা বিক্রি করতে পারে না। শ্রম হচ্ছে মূল্যের অন্তর্বস্তু, তার অন্তনিহিত পরিমাপ, কিন্তু শ্রমের নিজের কোনো মূল্য নেই।[৪]
“শ্রমের মূল্য” কথাটির মধ্যে মূল্যের ধারণাটি কেবল যে মুছে যায়, তা-ই নয়, বস্তুত উলটে যায়। “পৃথিবীর মূল্য” কথাটির মত “শ্রমের মূল্য” কথাটিও কাল্পনিক। অবশ্য, উৎপাদনের সম্পর্কসমূহ থেকেই এই ধরনের কাল্পনিক কথার উদ্ভব ঘটে। এগুলি হল মর্মগত সম্পর্কসমূহের জন্য বাহ্য রূপগুলির বিবিধ অভিধা মাত্র। অনেক সময়েই যে, জিনিসের বাহ রূপ নিজেকে উপস্থিত করে উলটো ভাবে, এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ছাড়া প্রত্যেকটি বিজ্ঞানেরই সুপরিজ্ঞাত।[৫]
“শ্রমের দাম”—এই অভিধাটি চিরায়ত রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্ব বিনা সমালোচনাতেই দৈনন্দিন জীবন থেকে ধার করে নিল এবং তার পরে সরলভাবে এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করল, কিভাবে এই দামটি নিরূপিত হয়? চিরায়ত অর্থতত্ত্ব অচিরেই বুঝতে পারল যে, চাহিদা ও যোগানের সম্পর্কে কোন পরিবর্তন, বাকি সমস্ত পণ্যের দামের ক্ষেত্রেও যেমন, শ্রমের দামের ক্ষেত্রেও তেমন, তার পরিবর্তনগুলি ছাড়া, অর্থাৎ একটি বিশেষ মানের উর্ধ্বে বা নীচে বাজার দরের ওঠা-নামাগুলি ছাড়া, আর কিছুই ব্যাখ্যা করে না। বাকি সমস্ত কিছু অপরিবর্তিত থেকে, যদি চাহিদা ও যোগান সমান হয়, তাহলে দামের ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে চাহিদা ও যোগানও কিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারে না। যখন চাহিদা ও যোগান সাম্যাবস্থায় থাকে, তখনকার শ্রমের দাম হচ্ছে তার স্বাভাবিক দাম—যা নির্ধারিত হয় চাহিদা ও যোগান থেকে নিরপেক্ষ ভাবে। কিন্তু এই দামটি কিভাবে নির্ধারিত হয়, ঠিক সেইটাই তো প্রশ্ন। অথবা, ওঠা-নামার একটি দীর্ঘতর সময়কে, ধরা যাক, একটি গোটা বছরকে, নেওয়া হল এবং দেখা গেল যে ওঠা নামাগুলি পরস্পরকে খারিজ করে দিল, যার ফলে থেকে গেল একটি গড়পড়তা পরিমাণ, একটি আপেক্ষিক ভাবে স্থির আয়তন। স্বভাবতই তাকে নির্ধারণ করতে হলে তার নিজের পরস্পর-পরিপূরক পরিবর্তনগুলির সাহায্যে ছাড়া, অন্য কিছুর সাহায্যে তা করতে হবে। এই যে দামটি, যা সর্বদাই শেষ পর্যন্ত শ্রমের আকস্মিক বাজার-দামগুলির উপরে আধিপত্য করে এবং সেগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে, এই “আবশ্যিক দামটি” (ফিজিও ক্র্যাটদের মতে, এই “স্বাভাবিক দামটি” (অ্যাডাম স্মিথের মতে, যেমন অন্যান্য সমস্ত পণ্যের ক্ষেত্রে, তেমন এ ক্ষেত্রেও অর্থের অঙ্কে অভিব্যক্ত তার মূল্য ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। এই ভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ব আশা করল শ্রমের আকস্মিক দাম গুলির মধ্যে, শ্রমের মূল্যের মধ্যে, তির্যকভাবে প্রবেশ করতে। যেমন অন্যান্য ক্ষেত্রে তেমন এই ক্ষেত্রেও এই মূল্য নির্ধারিত হল উৎপাদন-ব্যয়ের দ্বারা। কিন্তু শ্রমিকের উংপাদন-ব্যয়—অর্থাৎ স্বয়ং শ্রমিকের উৎপাদন বা পুনরুৎপাদনের ব্যয় কি? রাষ্ট্রীয় অর্থতত্বে এই প্রশ্নটি অচেতন ভাবে মূল প্রশ্নটির স্থান গ্রহণ করল; কেননা শ্রমের উৎপাদন-ব্যয়ের সন্ধানে অন্বেষণ চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকল এবং কখনো বিদায় নিল না। সুতরাং অর্থতত্ত্ববিদেরা যাকে বলেন শ্রমের মূল্য, তা আসলে শ্রমশক্তির মূল্য, যে-ভাবে সেই শক্তি থাকে শ্রমিকের ব্যক্তিত্বের মধ্যে যা তার কাজ থেকে অর্থাৎ শ্রম থেকে ততটা ভিন্ন, যতটা ভিন্ন একটি মেশিন তার করণীয় কাজ থেকে। শ্রমের বাজার দাম ও তার তথাকথিত মূল্যের মধ্যেকার পার্থক্য নিয়ে, মুনাফ-হারের সঙ্গে এবং শ্রম ইত্যাদির সাহায্যে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর মূল্য সমূহের সঙ্গে এই মূল্যের সম্পর্ক নিয়ে, ব্যস্ত থাকায় তারা কখনো আবিষ্কার করলো না যে, আলোচনার ধারাটি কেবল শ্রমের বাজার দাম থেকে তার পরিগৃহীত মূল্যের দিকে চলে যায়নি, সেই সঙ্গে চলে গিয়েছে শ্রমশক্তির মূল্যের মধ্যে স্বয়ং শ্রমের এই মূল্যেরই পর্যবসানে! চিরায়ত অর্থতত্ত্ব কখনো নিজের বিশ্লেষণের ফলাফলের সচেতনায় উপনীত হতে পারেনি। বিনা সমালোচনায় তা “শ্রমের মূল্য “শ্রমের স্বাভাবিক দাম” ইত্যাদির মত অভিথাগুলিকে চূড়ান্ত বলে এবং আলোচনাধীন মূল্য-সম্পর্কের সঠিক পরিচায়ক বলে গ্রহণ করেছিল, এবং এর ফলে চালিত হয়েছিল অমোচনীয় বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব বিরোধে (যে বিষয়টি আমরা পরে দেখব ); সেই সঙ্গে হাতুড়ে অর্থনীতিবিদদের জন্য উপহার দিয়েছিল তাদের অগভীরতা অনুশীলনের জন্য নিরাপদ ভিত্তি, যা নীতিগত ভাবেই পূজা করে কেবল বাহরূপ।
