৬ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত-শ্রম/ ১২ ঘণ্টা কর্ম-দিবস, তাহলে যেহেতু আবশ্যিক শ্রম-সময় হল ১২ ঘণ্টা বিয়োগ ৬ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত-শ্রম, সেহেতু আমরা পাই নিয়োক্ত ফলটি :
৬ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত-শ্রম/৬ ঘণ্টা আবশ্যিক শ্রম = ১০০/১০০
আরো একটি তৃতীয় সূত্র আছে, যার আভাস আমি ইতিপূর্বে মাঝে মাঝে দিয়েছি। সে সূত্রটি এই :
উদ্বৃত্ত-মূল্য / শ্রমশক্তির মূল্য = উদ্বৃত্ত-শ্রম/ আবশ্যিক শ্রম = মজুরি-প্রদত্ত শ্রম /মজুরি-বঞ্চিত শ্রম
উপরে আমরা যে বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছি, তার পরে আর
মজুরি-প্রদত্ত শ্রম/ মজুরি-বঞ্চিত শ্রম
এই সূত্রের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে যেতে পারি না যে ধনিক শ্রম শক্তির জন্য মূল্য দেয় না, মূল্য দেয় শ্রমের জন্য। এই সূত্রটি কেবল –
উদ্বৃত্ত-শ্রম/ আবশ্যিক শ্রম
সূত্রটিই জনরঞ্জন সংস্করণ। ধনিক মূল্য দেয় যতটা পর্যন্ত শ্রমশক্তির দাম তার মূল্যের সঙ্গে অনুরূপ হয় এবং বিনিময়ে স্বয়ং জীবন্ত শ্রমের ভোগ-ব্যবহারের উপরে অধিকার প্রাপ্ত হয়। তার ভোগ-স্বত্ব দুটি সময়ের উপরে বিস্তৃত থাকে। একটি সময় যখন শ্রমিক এমন একটি মূল্য উৎপাদন করে যা কেবল তার শ্রমশক্তির মূল্যের সমান হয়, সে তার একটি তুল্যমূল্য সামগ্রী উৎপাদন করে এইভাবে ধনিক শ্রমশক্তির দাম বাবদে যা অগ্রিম দিয়ে থাকে, প্রতিদানে তার একই দামের উৎপন্ন দ্রব্য পায়। ব্যাপারটা যেন এইরকম যে সে উক্ত দ্রব্যটি রেডিমেড আকারেই বাজার থেকে কিনেছে। বাকি সময়টিতে, উদ্ব-শ্রমের সময়টিতে, উক্ত শ্রমশক্তির উপরে ধনিকের ভোগ-স্বত্ব তার (ধনিকের জন্য এমন একটি মূল্য সৃষ্টি করে যার জন্য তাকে কোনো প্রতিদান দিতে হয় না।[৩] শ্রমশক্তির এই ব্যয় সে পেয়ে যায় মুফতে। এই অর্থেই উদ্বৃত্ত-শ্রমকে মজুরি-বঞ্চিত শ্রম বলা যায়।
সুতরাং, মূলধন কেবল, অ্যাডাম স্মিথ যা বলেছেন, শ্রমের উপরে আধিপত্য, তাই নয়। মূলধন মূলতঃ মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের উপরে আধিপত্য। সমস্ত উদ্বৃত্ত-মূল্য, তা পরবর্তী কালে যে-বিশেষ রূপটিতেই (মুনাফা, সুদ বা খাজনা) তা স্ফটিকায়িত হোক না কেন, তা মর্মগত ভাবে মজুরি-বঞ্চিত শ্রমেরই বাস্তবায়ন। মূলধনের আত্ম সম্প্রসারণের গুপ্ত রহস্যটি আত্মপ্রকাশ করে অন্য লোকের মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের উপরে ভোগ-স্বত্ব হিসাবে।
———–
১. “Dritter Brief an V. kirchmann von Rodbertus, Widerlegung der Ricardo’s chen Lehre von der Grundrente und Begrundung einer neuen Rententheorie” দ্রষ্টব্য। এই চিঠিটিতে আমি পরে আবার ফিরে আসব। খাজনা সম্পর্কে এর ভূল তত্ত্ব সত্ত্বেও, এ ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রকৃতি দেখতে সক্ষম হয়েছে। (তৃতীয় জার্মান সংস্করণে সংযোজিত : এ থেকে বোঝা যায় মার্কস কতটা সহৃদয়তার সঙ্গে তার পূর্বগামীদের বিচার করতেন—যখনি তিনি তাদের মধ্যে খুঁজে পেতেন সত্যকার অগ্রগতি কিংবা নোতুন ও সুষ্ঠু, ভাবনা। পরবর্তী কালে রুড মেয়রের কাছে লেখা রবার্টাসের এই চিঠিগুলি প্রকাশিত হয় এবং তা থেকে দেখা যায় যে মার্কসের উল্লিখিত স্বীকৃতির কিছুতা সীমিতকরণ দরকার। ঐ চিঠিগুলিতে এই অনুচ্ছেদটি রয়েছে, মূলধনকে কেবল শ্রমের কাছ থেকে রক্ষা করলেই চলবে না, তার নিজের কাছ থেকেও রক্ষা করতে হবে এবং সেটা সবচেয়ে ভাল ভাবে করা যাবে, যদি শিল্প-ধনিকের কাজ-কর্মকে আমরা গণ্য করি এমন অর্থ নৈতিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড হিসাবে যার দায়িত্ব মূলধনের দায়িত্বের সঙ্গে তার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে, এবং তঁার মুনাফাকে গণ্য করি এক প্রকারের বেতন হিসাবে, কেননা আমরা এখনো অন্য কোনো সামাজিক সংগঠনকে জানিনা। কিন্তু বেতনকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, এমনকি কমানোও যেতে পারে, যদি বেতন মজুরি থেকে খুব বেশি নিয়ে নেয়। সমাজের মধ্যে মার্কসের সবলে প্রবেশ, আমি তার বইখানাকে তাই বলেই মনে করি, অবশ্যই প্রতিহত করতে…সব মিলিয়ে মার্কসের বইটি যে পরিমাণে মূলধন সম্পর্কে তত্ত্বানুসন্ধান, তার চেয়ে ঢের বেশি পরিমাণে মূলধনের বর্তমান রূপের বিরুদ্ধে, যে-রূপটিকে তিনি গুলিয়ে ফেলেছেন মূলধনের খোদ ধারণাটারই সঙ্গে, তার বিরুদ্ধে আক্রমণ।” তাঁর “সামাজিক চিঠিপত্রে’ রবার্টাস যে নির্ভীক আক্রমণ চালিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা পর্যবসিত হয় এই মতাদর্শমত জগাখিচুড়িতে।এফ. এঙ্গেলস।]
২. ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সমস্ত সু-পরিণত রূপই হল সহযোগের বিভিন্ন রূপ; তাই তাদের স্ববিরোধী চরিত্র থেকে একটা অমূর্ত তত্ত্বে উপনীত হওয়া এবং সেই রূপগুলিকে এক কথায় কোন-না-কোন ধরনের স্বাধীন সম্মিলনে রূপান্তরিত করার তুলনায় সহজতর আর কিছু নেই, যা করেছেন এ দ্য লাবোর্দে তার “De P Esprit d. Association dans tous les interets de la communaute”-a ( প্যারিস, ১৮১৮)। এইচ, ক্যারি নামক সেই ইয়াংকিটিও মাঝে মাঝে সমান সাফল্যের সঙ্গে এই ধরনের ছলাকলা পরিদর্শন করেন—এমনকি ক্রীতদাসত্ব থেকে উদ্ভূত সম্পর্ক সমূহের ক্ষেত্রেও।
৩. ‘ফিজিওক্র্যাটরা যদিও উদ্বৃত্ত-মূল্যের রহস্য ভেদ করতে পারেন নি, তবু এই পর্যন্ত তাদের কাছে পরিষ্কার ছিল যে, “une richesse independante et disponible qu’il ( the possessor) n’a point achetec et qu’il vend., (Turgot : Reflexions sur la Formation et la Distribution des Richesses.” P. 11).
১৯. শ্রমশক্তির মূল্যের (এবং যথাক্রমে দামের) মজুরিতে রূপান্তর
ষষ্ঠ বিভাগ — মজুরি
