৮. যুদ্ধ চলাকালে মূলধন বৃদ্ধির একটা প্রধান কারণ হল শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির আরো বেশি পরিশ্রম এবং সম্ভবতঃ আরো বেশি বঞ্চনা-প্রত্যেক সমাজেই যারা সবচেয়ে সংখ্যাধিক। অভাবের তাড়নায় আরো মহিলা, আরো শিশু বাধ্য হয়েছিল। শ্রমসাধ্য বৃত্তিগুলিতে যোগ দিতে এবং আগেকার শ্রমিকেরা ঐ একই কারণে বাধ্য হয়েছিল তাদের বেশির ভাগ সময়টা উৎপাদন-বৃদ্ধির কাজে নিয়োগ করতে ( এসেজ অন পলিটিক্যাল ইকনমি ইন হুইচ আর ইলাস্ট্রেটেড দি প্রিন্সিপাল কজেস অব দি প্রেজেন্ট ন্যাশনাল ডিসট্রেস’ ১৮৩৩, পৃঃ ২৪৮।)।
১৮. উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার প্রসঙ্গে বিবিধ সূত্র
অষ্টাদশ অধ্যায় — উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার প্রসঙ্গে বিবিধ সূত্র
আমরা দেখেছি, উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার প্রকাশিত হয় নিম্নলিখিত সূত্ৰসমূহের দ্বারা :
উদ্বৃত্ত-মূল্য/অস্থির মূলধ – উদ্বৃত্ত-মূল্য/ শ্রমশক্তির মূল্য = উদ্বৃত্ত- শ্রম/ আবশ্যিক শ্রম
এই সূত্রগুলির মধ্যে প্রথম দুটি যা প্রকাশ করে বিবিধ মূল্যের অনুপাত হিসাবে, তৃতীয়টি তাই-প্রকাশ করে বিবিধ সময়ের অনুপাত হিসাবে, যে যে সময়ে এই মূল্যগুলি উৎপাদিত হয়। পরস্পরের পরিপূরক এই সূত্রগুলি কঠোরভাবে সুনির্দিষ্ট ও সঠিক। সুতরাং আমরা এগুলিকে চিরায়ত রাষ্ট্রিক অর্থতত্ত্বেও পাই মূলতঃ নির্ণয়ীকৃত আকারে, যদিও তা সচেতন ভাবে করা হয়নি। সেখানে আমরা উল্লিখিত সূত্রগুলি থেকে উপনীত নিম্নোধৃত সূত্রসমূহও পাই :
(১) উদ্বৃত্ত- শ্রম/ শ্রম-দিবস = উদ্বৃত্ত-মূল্য/ উৎপন্ন ফলের মূল্য = উৎপন্ন দ্রব্য/ মোট উৎপন্ন ফল
একই অনুপাত এখানে প্রকাশিত হয়েছে বিবিধ শ্রম-সময়ের অনুপাত হিসাবে, যে যে মূল্যে এই বিবিধ শ্রম-সময় মূর্ত হয়, সেই সেই সময়ের অনুপাত হিসাবে এবং যে যে উৎপন্ন দ্রব্যে ঐ বিবিধ মূল্য বিদ্যমান থাকে, সেই সেই দ্রব্যের অনুপাত হিসাবে। এটা অবশ্য স্পষ্ট যে, ‘উৎপন্ন ফলের মূল্য বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে একটি শ্রম-দিবসে কেবল নোতুন সৃষ্ট মূল্যটিকে—উক্ত উৎপন্ন ফলের মূল্যের স্থির অংশটিকে বাদ দিয়ে।
(২) এর অন্তর্ভূক্ত সব কটি সুত্রেই শ্রম-শোষণের আসল মাত্রাটি, অথবা উদ্ধত্ত মূল্যের হারটি মিথ্যাভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। ধরা যাক, একটি ১২ ঘণ্টার শ্রম-দিবস। তা হলে, আগেকার দৃষ্টান্তগুলিতে আমরা যা যা ধরে নিয়েছি, সেইগুলি এ ক্ষেত্রেও ধরে নিলে শ্রম-শোষণের আসল মাত্রাটি প্রকাশ পাবে এই এই অনুপাতে।
৬ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত-সময়/ ৬ ঘণ্টা আবশ্যিক সময় = ৩ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য/ ৩ শিলিং অস্থির মূলধন
=১০০%
কিন্তু (২ নম্বরের সূত্রগুলি থেকে আমরা যা পাই তা সম্পূর্ণ ভিন্ন; আমরা পাইঃ
৬ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত-শ্রম/ ১২ ঘণ্টা শ্রম-দিবস = ৩ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য/ ৬ শিলিং সৃষ্ট মূল্য।
= ৫০%
আসলে এই (২) নম্বরের অন্তর্ভুক্ত সূত্রগুলি কেবল সেই অনুপাতটিকেই প্রকাশ করে, যে-অনুপাতে শ্রম-দিবসটি, কিংবা তার উৎপাদিত মূল্যটি ধনিক এবং শ্রমিকের মধ্যে বিভক্ত হয়। যদি তাদের গণ্য করা হয় মূলধনের আত্ম-সম্প্রসারণের মাত্রার প্রত্যক্ষ অভিব্যক্তি হিসাবে, তা হলে নিম্নোক্ত ভ্রান্ত নিয়মটি সঠিক বলে ধারণা হবে : উদ্বৃত্ত-শ্রম বা উদ্বৃত্ত-মূল্য কখনো শতকরা ১০০ ভাগে পৌছাতে পারে না।[১] যেহেতু উদ্বৃত্ত-শ্রম হচ্ছে সৃষ্ট মূল্যেরই একাংশ, সেহেতু উদ্বৃত্ত-শ্রম, অবশ্যই সব সময়ে হবে শ্রম-দিবসের চেয়ে অল্পতর কিংবা উদ্বৃত্ত-মূল্য অবশ্যই সব সময়ে হবে সৃষ্ট মূল্যের চেয়ে অল্পতর। কিন্তু ১০০:১০০ অনুপাতে পৌছাতে তারা অবশ্যই হবে সমান সমান। যাতে করে উদ্ব-ম গোটা শ্রম-দিবসটিকেই (অর্থাৎ যেকোন সপ্তাহের বা বছরের একটি গত দিবসকে) আত্মসাৎ করতে পারে, আবশ্যিক এমকে অবশ্যই পর্যবসিত হতে হবে শূন্যে। কিন্তু যদি আবশ্যিক শ্ৰম অন্তর্হিত হয় তা হলে উদ্বৃত্ত-শ্রমও হয় অন্তর্হিত; কেননা দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই একটি ক্রিয়া।
শ্রম-দিবসকে আয়তনে স্থির হিসাবে গণ্য করার প্রিয় পদ্ধতিটি, (২)-নম্বরভুক্ত সূত্রাবলীর ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুস্থিত প্রথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল, কেননা ঐ সূত্রগুলিতে উদ্বৃত্ত-শ্রমকে সব সময়ে তুলনা করা হয় একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের শ্রম-দিবসের সঙ্গে। একই ব্যাপার প্রযোজ্য হয় যখন উৎপাদিত মূল্যের পুনর্বণ্টনকেই একান্তভাবে নজরে রাখা হয়।
উদ্বৃত্ত-মূল্যকে এবং শ্রমশক্তির মূল্যকে সৃষ্ট মূল্যের ভগ্নাংশ হিসাবে গণ্য করার অভ্যাস—এমন একটি অভ্যাস যার উৎপত্তি ঘটে স্বয়ং ধনতান্ত্রিক-উৎপাদন-পদ্ধতি থেকেই, এবং যার তাৎপর্য এর পরে আলোচনা করা হবে-এই অভ্যাস সেই খোদ, লেন-দেনের ব্যাপারটাকেই লুকিয়ে রাখে, যা মূলধনের বৈশিষ্ট্য, যথা, জীবন্ত শ্রমশক্তির। জন্য অস্থির মূলধনের বিনিময় এবং, তার পরিণামে, উৎপন্ন ফল থেকে শ্রমিকের বঞ্চনা। আসল ঘটনার পরিবর্তে আমরা পাই এমন একটি সম্মিলনের একটি মিথ্যা প্রতিরূপ যাতে শ্রমিক এবং ধনিক উক্ত ফলটির উৎপাদনে তাদের নিজ নিজ উপাদান সমূহের অবদান অনুপাতে সেটিকে ভাগ করে নেয়।[২]
তা ছাড়া, (২)নং সূত্রাবলীকে যে-কোনো সময়ে (১)-নং সূত্রাবলীতে রূপান্তরিত করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, যদি আমাদের থাকে
