শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত বেশি বৃদ্ধি পায়, শ্রম-দিবসকে তত বেশি হ্রাস করা যায়; এবং শ্রম-দিবসকে যত বেশি হ্রাস করা যায়, শ্রমের তীব্রতাকে তত বেশি বৃদ্ধি করা যায়। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমের সাশ্রয়ের সঙ্গে একই হারে উৎপাদন শীলতা বৃদ্ধি পায়, শ্রমের সাশ্রয় আবার তার বেলায় কেবল উৎপাদন উপকরণের ব্যয় সংকোচই বোঝায় না, সেই সঙ্গে বোঝয় অপ্রয়োজনীয় শ্রমের পরিহারও। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি, একদিকে, যখন প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র কারবারের ক্ষেত্রে ব্যয়-সংকোচ সংঘটিত করে, অন্য দিকে, তখন তা তার প্রতিযোগিতার নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা শ্রমশক্তির ও উৎপাদনের সামাজিক উপকরণ সমূহের সবচেয়ে বেপরোয়া অপব্যয়ের জন্ম দেয়আপাততঃ অপরিহার্য কিন্তু কার্যতঃ অপ্রয়োজনীয় এক বিশালসংখ্যক কর্ম সৃষ্টির কথা নয় বাদই দিলাম।
শ্রমের তীব্রতা ও উৎপাদনশীলতা যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে সমাজ বৈষয়িক উৎপাদনে যে-পরিমাণ সময় নিয়োগ করতে বাধ্য তা হ্রাস পায়, এবং ব্যক্তির অবাধ মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য সমাজ তার হাতে বিপুলতর সময় পায়—যে অনুপাতে সমগ্র কাজ সমাজের সকল সক্ষম-দেহী সদস্যদের মধ্যে সমভাবে বন্টিত হয় এবং যে-অনুপাতে একটি বিশেষ শ্রেণী শ্রমের স্বাভাবিক ভারকে নিজেদের কাধ থেকে অপসারিত করে সমাজের অন্য এক স্তরের কাধে তা চাপিয়ে দেবার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়, সেই অনুপাতে। এই দিক থেকে, শ্রম-দিবসের হ্রস্বতা-সাধন শেষ পর্যন্ত শ্রমের সাধারণীকরণের মধ্যে একটা সীমাপ্রাপ্ত হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজে একটি শ্রেণীর জন্য অবকাশ অর্জন করা হয় জনগণের সমগ্র জীবন-কালকে শ্ৰম-সময়ে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে।
————
১. তৃতীয় জার্মান সংস্করণে প্রদত্ত টাকা-৫-৮ পৃষ্ঠায় বাংলা সংস্করণ (ইংরেজি সংস্করণ ৩০০-৩২ পৃষ্ঠায়) আলোচিত বিষয়টি অবশ্য এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। এফই.
২. এই তৃতীয় নিয়মটির সঙ্গে ম্যাককুলক যা যা যোগ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে এই আজগুবি সংযোজনটি যে, শ্রমশক্তির মূল্য-হ্রাস ব্যতিরেকে উদ্বৃত্ত মূল্যের বৃদ্ধি ঘটতে পারে যদি ধনিক কর্তৃক দেয় করগুলিকে লোপ করে দেওয়া হয়। শ্রমিকের কাছ থেকে ধনিকে প্রত্যক্ষভাবে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য আদায় করে নেয়, তার পরিমাণে করের অবলুপ্তি কোনো পরিবর্তনই ঘটাতে পারে না। তা কেবল তার এবং তৃতীয় ব্যক্তিদের মধ্যে কোন্ অনুপাতে উদ্বও মূল্যের বণ্টন ঘটবে, সেই অনুপাতটির পরিবর্তন ঘটায়। সুতরাং তা উদ্বৃত্ত-মূল্য এবং শ্রমশক্তির মূল্যের মধ্যেকার সম্পর্কটিতে কোনো পরিবর্তনই ঘটায় না। অতএব, ম্যাককুলকের ব্যতিক্রম কেবল ঐ নিয়মটির অনুধাবনে তার অক্ষমতাই প্রমাণ করে। রিকার্ডোর অপব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন দুর্ভাগ্য তার প্রায়ই হয়েছে, যেমন হয়েছে বি সে’র অ্যাডাম স্মিথের অপব্যাখ্যা করতে গিয়ে।
৩. “যখন শিল্পের উৎপাদনশীলতায় কোনো পরিবর্তন ঘটে এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম ও মূলধনের দ্বারা বেশি কিংবা কম উৎপন্ন হয় তখন মজুরির অনুপাত স্পষ্টতই পরিবর্তিত হতে পারে—যখন ঐ অনুপাতটি যে পরিমাণটির প্রতিনিধিত্ব করে সেটা, একই থাকে কিংবা পরিমাণটি পরিবর্তিত হয় অথচ অনুপাতটি একই থাকে। (“আউটলাইনস অব পলিটিক্যাল ইকনমি”, ইত্যাদি পৃ: ৬৭)
৪. “সব কিছু সমান থাকলে একজন বিদেশী ম্যানুফ্যাকচারের চেয়ে একজন ইংরেজ ম্যানুফ্যাকচারার একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনেক বেশি কাজ আদায় করতে পারে, এত বেশি যে, অন্য জায়গার ৭২-৮০ ঘণ্টার সপ্তাহ এবং এখানকার ৬০ ঘণ্টার সপ্তাহ সমান হয়ে যায়।” (“রিপোর্টস ফ্যাক্টরিজ”, ৩১ অক্টোবর ১৮৫৫, পৃঃ ৬৫)।
ইংরেজ এবং মহাদেশীয় শ্রম-ঘণ্টার মধ্যে এই গুণগত পার্থক্য হ্রাস করার সবচেয়ে অভ্রান্ত উপায় হল আইন করে মহাদেশীয় কারখানাগুলিতে শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য পরিমাণগত ভাবে কমিয়ে দেওয়া।
৫. দশ ঘণ্টা আইনের প্রচলনের ফলে প্রকাশ পেয়েছে যে অনেক ক্ষতিপূরণকারী ব্যাপার রয়েছে।” (“রিপোর্টস ….. ফ্যাক্টরিজ”, ৩১ অক্টোবর ১৮৪৮, পৃঃ ৭)।
৬. “২৪ ঘণ্টা কি পরিমাণ শ্ৰম একজন মানুষ করেছে তা মোটামুটি হিসাব করা যায় যদি তার দেহে যে-সব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলিকে পরীক্ষা করা যায়। বস্তুর রূপগত পরিবর্তন নির্দেশ করে সক্রিয় শক্তির পূর্বকৃত অনুশীলন।” (গ্রোভ: “অন দি কো-রিলেশন অব ফিজিক্যাল ফোর্সেস।” )।
৭. শস্য এবং শ্রম কদাচিৎ সমান তালে চলে; কিন্তু একটা পরিষ্কার মাত্রা আছে, যার বাইরে তাদের বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মহার্ঘতার সময়ে, যখন মজুরির হ্রাস ঘটে, যেটা সাক্ষ্য থেকে দেখা যায় (পার্লামেন্টের তদন্ত কমিটির সামনে প্রদত্ত সাক্ষ্য, ২৮১৪-১৫), তখন শ্রমজীবী শ্রেণীগুলিকে যে অস্বাভাবিক পরিশ্রম করতে হয়, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বশ্রেষ্ট কৃতিত্বের পরিচায়ক এবং নিশ্চয়ই মূলধন বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। কিন্তু মানবজাতির কোনো একজনও এটা চাইতে পারে না যে ঐ পরিশ্রম হোক চিরস্থায়ী, থাক অপ্রশমিত। সাময়িক পরিত্রাণ হিসাবে তা প্রশংসনীয়, কিন্তু তা যদি নিরন্তর চালু থাকে, তা হলে তা থেকে ঘটবে একই ফলাফল যা ঘটে থাকে কোন দেশের জনসংখ্যাকে খাদ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দিলে।” (ম্যালথাস, “ইনকুইরি ইনটু দি নেচর অ্যাণ্ডি প্রাগ্রেস অব রেন্ট।” লণ্ডন ১৮১৫, পৃঃ ৪৮ টীকা)। ম্যালথাসকে শ্রদ্ধা জানাই, তিনি শ্রম-ঘণ্টার দীর্ঘতসাধনের উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছেন, একটা ঘটনা যার প্রতি তার পুস্তিকায় তিনি অন্যত্রও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, অন্য দিকে বিকার্ডো এবং অন্যান্যরা, সবচেয়ে কলংকজনক ঘটনাবলী সত্বেও, শ্রম-দিবসের দীর্ঘতার অপরিবর্তনীয়তাকে তাদের যাবতীয় অনুসন্ধানের ভিত্তিম্বরূপে পরিণত করেছেন। কিন্তু যে সংরক্ষণশীল স্বার্থগুলিকে ম্যালথাস সেবা করতেন, তা তাকে দেখতে দেয়নি যে, শ্রম-দিবসের মাত্রাহীন দীর্ঘতসাধন এবং সেই সঙ্গে মেশিনারির অসাধারণ অগ্রগমন এবং নারী ও শিশুদের শোষণ শ্রমিক শ্রেণীর একটা বৃহৎ অংশকে নিশ্চয়ই পর্যবসিত করবে ‘সংখ্যাতিরিক্ত বাহুল্যে”—বিশেষ করে, তখন যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে এবং বিশ্বের বাজারগুলিতে ইংল্যাণ্ডের একচেটিয়া অধিকারেরও অবসান ঘটবে। অবশ্য ম্যালথাস যাদের পূজা করতেন, যথার্থ পুরোহিত হিসাবে সেই শাসক শ্রেণীগুলির কাছে এই “জনবহুল্য”কে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঐতিহাসিক নিয়মাবলীর সাহায্যে ব্যাখ্যা করার তুলনায় প্রকৃতির শাশ্বত নিয়মাবলীর সাহায্যে ব্যাখ্যা করা ঢের বেশি সুবিধাজনক ও স্বার্থসঙ্গত।
