এটা স্পষ্ট যে, এক্ষেত্রে বহুসংখ্যক সন্নিবেশ সম্ভব। তিনটি বিষয়ের মধ্যে যে কোনো দুটির পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং বাকিটি স্থির থাকতে পারে, কিংবা তিনটির সব কটিরই একই সঙ্গে পরিবর্তন ঘটতে পারে। তারা একই দিকে বা ভিন্ন ভিন্ন দিকে পরিবর্তিত হতে পারে; একই বা বিপরীত দিকে পরিবর্তিত হতে পারে; ফল হয় এই যে পরিবর্তনগুলি একটি অপরটির বিরুদ্ধে ক্রিয়া করে এবং পরস্পরকে সমগ্র ভাবে বা আংশিক ভাবে বিফল করে দেয়। যাইহোক, [১], [২] এবং [৩]-এ প্রদত্ত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে, সম্ভাব্য প্রত্যেকটি সন্নিবেশের বিশ্লেষণ সহজেই করা যায়। সম্ভাব্য প্রত্যেকটি সন্নিবেশের ফল পাওয়া যেতে পারে—যদি পালাক্রমে সেই মুহূর্তে প্রত্যেকটি বিষয়কে অস্থির এবং বাকি দুটি বিষয়কে স্থির বলে গণ্য করা হয়। সুতরাং আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পরীক্ষা করে দেখব—তাও খুবই সংক্ষেপে।
(১) কর্মদিবসের দীর্ঘতা সাধনের সঙ্গে যুগপৎ শ্রমের হ্রাসমান উৎপাদনশীলতা
শ্রমের হ্রাসমান উৎপাদনশীলতার কথা বলতে গিয়ে, আমরা এখানে সেইসব শিল্পে হ্রাসপ্রাপ্তির ঘটনা উল্লেখ করব, যেগুলির উৎপন্ন দ্রব্য শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণ করে, এই ধরনের হ্রাসপ্রাপ্তি যা ঘটে, ধরা যাক, মাটির হ্রাসমান উর্বতী এবং উৎপন্ন দ্রব্যের তজ্জনিত মহার্ঘতার ফল হিসাবে। ধরুন, কর্ম-দিবসের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১২ ঘণ্টা এবং তার দ্বারা সৃষ্ট মূল্য হচ্ছে ৬ শিলিং, যার মধ্যে অর্ধেক শ্রমশক্তির মূল্য প্রতিস্থাপিত করে এবং বাকি অর্ধেক গঠন করে উদ্বৃত্ত-মূল্য। ধরুন, মটির উৎপন্ন দ্রব্যে বর্ধিত মহার্ঘতার ফলে, শ্রমশক্তির মূল্য ৩ শিলিং থেকে বেড়ে হয় ৪ শিলিং এবং অতএব, আবশ্যিক শ্রম-সময় ৬ ঘণ্টা থেকে বেড়ে হয় ৮ ঘণ্টা। যদি কর্মদিবসের দৈর্ঘ্যে কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তা হলে উদ্বৃত্ত-শ্রম ৬ ঘণ্টা থেকে কমে – যাবে ৪ ঘণ্টায়, উদ্বৃত্ত-মূল্য ৩ শিলিং থেকে ২ শিলিং-এ। যদি কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য ২ ঘন্টা বাড়িয়ে দেওয়া যায় অর্থাৎ ১২ ঘণ্টা থেকে ১৪ ঘন্টা করা যায়, তা হলে উও-শ্রম ৬ ঘণ্টাই থেকে যায় এবং উদ্বৃত্ত-মূল্য থেকে যায় ৬ শিলিং; কিন্তু আবশ্যিক শ্রম-সময়ের হিসাবে পরিমাপ করলে দেখা যায় যে, শ্রমশক্তির মূল্যের তুলনায় উদ্বৃত্ত-মূল্য কমে যায়। যদি কর্ম দিবসটিকে ৪ ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া যায় অর্থাৎ ১২ ঘণ্টা থেকে ১৬ ঘণ্টা করা যায়, তা হলে উদ্বৃত্ত-মূল্য এবং শ্রমশক্তির মূল্যের, উদ্ধত্ত-শ্রম এবং আবশ্যিক শ্রমের আনুপাতিক আয়তনগুলি অপরিবর্তিতই থেকে যায়, কিন্তু উদ্বৃত্ত-মূল্যের অপেক্ষিক আয়তন ৩ শিলিং থেকে বেড়ে হয় ৪ শিলিং, উদ্ধত্ত-শ্রমের অনুপেক্ষিক আয়তন ৬ ঘণ্টা থেকে বেড়ে হয় ৮ ঘণ্টা—শতকরা ৩৩ ভাগ বৃদ্ধি। সুতরাং শ্রমের হ্রাসমান উৎপাদনশীলতার সঙ্গে এবং যুগপৎ শ্রম-দিবসের দীর্ঘতা সাধনের সঙ্গে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের অনাপেক্ষিক আয়তন অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে—যে সময়ে তার আপেক্ষিক আয়তন হ্রাস পায়; তার আপেক্ষিক আয়তন অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে-যে সময়ে তার অনাপেক্ষিক আয়তন বৃদ্ধি পায়; এবং যদি শ্রম-দিবসটির দৈর্ঘ্য যথেষ্ট হয়, তা হলে উভয়েই বৃদ্ধি পেতে পারে। ১৭৯৯ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যবর্তী কালে ইংল্যাণ্ডে খাদ্য-দ্রব্যের ক্রমবর্ধমান দামের ফলে আর্থিক মজুরি বৃদ্ধি ঘটেছিল যদিও আসল মজুরি—অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদির আকারে প্রকাশিত মজুরি হ্রাস পেয়েছিল। এই ঘটনা থেকে ওয়েস্ট এবং রিকার্ডো এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, কষি-শ্রমের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবার ফলে উদ্বৃত্ত মূল্যের হারে হ্রাস ঘটেছে, এবং তারা এমন একটি ঘটনাকে ধরে নিয়েছিলেন যার অস্তিত্ব ছিল কেবল তাদের কল্পনায়—মজুরি, মুনাফা ও খাজনা সম্পর্কিত অনুসন্ধান কার্যের সূচনা স্থল। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে, শ্রমের তীব্রতা-বৃদ্ধি এবং শ্রম-দিবসের দীর্ঘতা বৃদ্ধির কল্যাণে সেই সময়ে উদ্বৃত্ত-মূল্য উভয়তই বৃদ্ধি পেয়েছিল -অনাপেক্ষিক আয়তনে এবং আপেক্ষিক আয়তনে। এটাই ছিল সেই সময়, যখন দোর্দণ্ড মাত্রায় শ্রমের ঘণ্টা বাড়াবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল;[৭] যে সময়ের বিশেষ চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ছিল, এক দিকে, মূলধনের ত্বরান্বিত সঞ্চয়ন এবং অন্য দিকে, নিঃস্বতার সম্প্রসারণ।[৮]
(২) শ্রমদিবসের হ্রস্বতা-গানের সঙ্গে যুগপৎ শ্রমের তীব্রতা ও উৎপাদনশীলতায় বৃদ্ধি সাধন
শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনশীলতা এবং অধিকতর তীব্রতার ফলাফল একই রকম। তারা উভয়েই একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত দ্রব্যসম্ভারের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। সুতরাং উভয়েই শ্রম-দিবসের সেই অংশটির হ্রস্বতা সাধন করে, যে-অংশটি শ্রমিকের প্রয়োজন তার জীবনধারণের উপকরণ-সামগ্রী বা সেগুলির তুল্যমূল্য কিছু উৎপাদন করার জন্য। শ্রম-দিবসের নূ্যনতম দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হয় তার এই আবশ্যিক অথচ চুক্তি সাপেক্ষ অংশের দ্বারা। যদি গোটা দিবসটিকে সংকুচিত করে আনা যেত ঐ অংশটির দৈর্ঘ্যের মধ্যে, তা হলে উদ্বৃত্ত-মূল্যে অন্তর্হিত হয়ে যেত—সেটা এমন একটা পরিণতি, মূলধনের রাজত্বে যা কোনক্রমেই ঘটতে পারে না। একমাত্র ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির অবসান ঘটিয়েই শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য আবশ্যিক শ্রম-সময়ে কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও আবশ্যিক শ্রম-সময় তার মাত্রার সম্প্রসারণ ঘটাবে। এক দিকে, কারণ তখন “জীবনধারণের উপকরণ-সামগ্রীর” ধারণাটির অর্থ সম্প্রসারিত হবে এবং শ্রমিক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক জীবন-মান দাবি করবে। অন্য দিকে, কারণ তখন আজকের দিনে যা উদ্বৃত্ত-মূল্য, তার একটা অংশ গণ্য হবে আবশ্যিক শ্রম হিসাবে। আমি বোঝাতে চাইছি ( ভবিষ্যৎ উৎপাদনের প্রয়োজনে) সংরক্ষণ ও সঞ্চয়নের একটি ভাণ্ডার গড়ে তোলার জন্য।
