যদি শ্রমের তীব্রতা একই সঙ্গে ও একই মাত্রায় শিল্পের সকল শাখায় বৃদ্ধি পেত, তা হলে নোতুন ও উচ্ছতর তীব্রতাই হয়ে উঠত সমাজের পক্ষে স্বাভাবিক মাত্রা, এবং সেই জন্য তাকে আর হিসাবেও ধরা হত না। কিন্তু তবু, কখনন, শ্রমের তীব্রতা ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন হবে এবং মূল্যের নিয়মটির আন্তর্জাতিক প্রয়োগকে তদনুয়ায়ী প্রভাবিত করত। এক দেশের অধিকতর তীব্র শ্রমের একটি কর্মদিবস আরেক দেশে অল্পতর তীব্র শ্রমের একটি কর্মদিবসের তুলনায় একটি বৃহত্তর পরিমাণ অর্থের প্রতিনিধিত্ব করত।[৪]
৩. শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও তীব্রতা স্থির : কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য অস্থির
একটি কর্ম-দিবস দুভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। আমাদের হাতে যে-তথ্য আছে এবং ইতিপূর্বে আমরা যা যা ধরে নিয়েছি, সেই ভিত্তিতে আমরা নিম্নলিখিত নিয়মগুলিতে উপনীত হই।
(১) কর্ম-দিক তার দৈর্ঘ্য অনুপাতে বেশি বা কম পরিমাণ মূল্য সৃষ্টি করে সুজাং একটি স্থির-পরিমাণ মূল্য সৃষ্টি করে না, সৃষ্টি করে একটি অস্থির পরিমাণ মূল্য।
(২) উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তন এবং শ্রমশক্তির মূল্যের আয়তনের মধ্যেকার সম্পর্কে সংঘটিত প্রত্যেকটি পরিবর্তন উদ্ভূত হয় উত্ত-খমের, অতএব উদ্বৃত্ত-মূল্যের, অনাপেক্ষিক আয়তনে কোন পরিবর্তন থেকে।
(৩) শ্রম শক্তির ক্ষয়-ক্ষতির উপরে উদ্বৃত্ত-শ্রমের দীর্ঘায়ন যে প্রতিক্রিয়া ঘটায়, কেবল তারই ফলে শ্রমশক্তির অপেক্ষিক মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে। অতএব, এই অনাপেক্ষিক মূল্যে প্রত্যেকটি পরিবর্তনই উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তনে একটি পরিবর্তনের ফল, কিন্তু কখনো তার হেতু নয়।
আমরা এমন একটি ক্ষেত্র দিয়ে আরম্ভ করি, যেখানে-কর্ম-দিবসকে হ্রস করা হয়েছে।
(১) উল্লিখিত অবস্থাবলীতে কর্মদিবসের হ্রস্বতাসাধন শ্রমশক্তির মূল্যকে এবং, সেই সঙ্গে, আবশ্যিক শ্রম-সময়কে অপরিবর্তিতই রাখে। তা উত্তম ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের হ্রাস সাধন করে। শেষোক্তটির আয়তনের সঙ্গে, তার আপেক্ষিক
আয়তনও হ্রাস পায় অর্থাৎ শ্রমশক্তির মূল্যের—যার আয়তন থাকে অপরিবর্তিত তার সঙ্গে আপেক্ষিকভাবে তার আয়তনও হ্রাস পায়। একমাত্র শ্রমশক্তির দামকে তার মূল্যের নীচে নামিয়ে এনেই ধনিক পারে অক্ষত অবস্থায় আত্মরক্ষা করতে।
কর্ম-দিবসকে হ্রস্বতর করার বিরুদ্ধে সচরাচর যে সমস্ত যুক্তি দেওয়া হয়, সেগুলিতে ধরে নেওয়া হয় যে, এই হ্রস্বতা-সাধন ঘটে থাকে এমন অবস্থাবলীর অধীনে যেগুলি বিদ্যমান আছে বলে আমরা এখানে ধরে নিয়েছি, কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার বিপরীতটাই হয়; শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বা তীব্রতায় কোন পরিবর্তন কর্মদিবসের হ্রস্বতাসাধনের আগে বা অব্যবহিত পরে ঘটে।[৫]
(২) কর্ম-দিবসের দীর্ঘ সাধন। ধরা যাক, আবশ্যিক শ্রম-সময় হচ্ছে ৬ ঘণ্টা, কিংবা শ্রমশক্তির মূল্য হচ্ছে ৩ শিলিং; আরো ধরা যাক যে উত্তম হচ্ছে ৬ ঘণ্টা কিংবা উদ্বৃত্ত-মূল্য হচ্ছে ৩ শিলিং। তা হলে, গোটা কর্মদিবসের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ ঘণ্টায় এবং তা রূপান্তরিত হয় ৬ শিলিং পরিমাণ মূল্যে। এখন, যদি কর্ম-দিবসকে আরো ২ ঘন্টা দীর্ঘতর করা হয় এবং শ্রমশক্তির দাম অপরিবর্তিত থাকে, তা হলে উদ্বৃত্ত-মূল্য বৃদ্ধি পায়-আপেক্ষিক ভাবে ও অনাপেক্ষিক ভাবে উভয়ত। যদিও এম শক্তির মূল্যে কোনো অনাপেক্ষিক পরিবর্তন হয় না, তবু এর আপেক্ষিক হ্রাস ঘটে। (১)-এ যে অবস্থাবলী ধরে নেওয়া হয়েছে, শ্রম-শক্তির অপেক্ষিক মূল্যে কোনো পরিবর্তন না ঘটলে তার মূল্যে আপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তন ঘটতে পারে না। এখানে, বরং বিপরীত, শ্রমশক্তির মূল্যে আপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তন হচ্ছে উদ্বৃত্ত-মূল্যে অনাপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তনের ফল।
যেহেতু যে-মূল্যটির মধ্যে এক দিনের শ্রম রূপায়িত আছে, তা ঐ দিনটির দৈর্ঘ্যের সঙ্গে বৃদ্ধি পায়, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে, উদ্বৃত্ত-মূল্য এবং শ্রমশক্তির দাম যুগপৎ বৃদ্ধি পেতে পারে—হয়, সম-পরিমাণে আর, নয়তো অসম পরিমাণে। এই যুগপৎ বৃদ্ধি, অতএব সম্ভব হয় দুটি ক্ষেত্রে, এক, কর্মদিবসের সত্যসত্যই দীর্ঘতা-সাধন : অন্যটি, এই দীর্ঘতা-সাধন ব্যতিরেকে শ্রমের তীব্রতায় বৃদ্ধি-সাধন।
কর্ম-দিবসকে যখন দীর্ঘায়িত করা হয়, তখন শ্রমশক্তির দাম তার মূল্য থেকে পড়ে যেতে পারে, যদিও সেই দাম নামে অপরিবর্তিত থাকতে পারে, এমনকি বেড়েও যেতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, একটি কর্ম-দিবসের শ্রম শক্তির মূল্য পরিমাপ করা হয় তার স্বাভাবিক গড়পড়তা স্থায়িত্বকাল হতে কিংবা শ্রমিকদের মধ্যে জীবনের স্বাভাবিক স্থায়িত্বকাল হতে, এবং মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি অনুযায়ী সংগঠিত শারীরিক বস্তুর গতিতে আনুষঙ্গিক ও স্বাভাবিক রূপান্তরণ হতে।[৬] একটি বিন্দু পর্যন্ত, শ্রম-দিবসের দীর্ঘায়ন-জনিত শ্রমশক্তির ক্ষয়-ক্ষতি উচ্চতর মজুরি দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই বিন্দুটি পার হয়ে গেলেই ক্ষয়-ক্ষতি বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে এবং শ্রমশক্তির স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ও কাজকর্ম ব্যাহত হয়। শ্রমশক্তির দাম এবং তার শোষণের মাত্রা আর সম-পরিমাণ থাকে না।
৪. শ্রমের স্থায়িত্বকাল, উৎপাদনশীলতা ও তীব্রতায় যুগপৎ পরিবর্তন
