রিকার্ডোই সর্বপ্রথম উল্লিখিত তিনটি নিয়মকে সঠিক ভাবে সূত্রায়িত করেছিলেন। কিন্তু তিনি কয়েকটি ভুল করে ফেলেন, যেগুলি নীচে উল্লেখ করা হল (১) যে বিশেষ অবস্থাবলীতে এই নিয়মগুলি কার্যকরী হয়, তিনি সেগুলিকে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের নির্বিশেষ ও একমাত্র অবস্থাবলী বলে ধরে নেন। তিনি কোনো পরিবর্তনকেই জানেন না–না শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য, না শ্রমের-তীব্রতায়; সুতরাং তার চোখে কেবল একটিই পরিবর্তনীয় উপাদান থাকতে পারে; সেটি হল শ্রমের উৎপাদনশীলতা; (২) এবং এই ভুলটি (১) নং ভুলটির তুলনায় তার বিশ্লেষণকে বেশি বিভ্রান্ত করে দেয়; অন্যান্য অর্থনীতিবিদেরা যেমন উদ্বৃত্ত-মূল্যকে বিচ্ছিন্ন ভাবে অর্থাৎ মুনাফা, খাজনা ইত্যাদির মত বিশেষ বিশেষ রূপ থেকে স্বতন্ত্র ভাবে অনুসন্ধান করেছেন, তিনিও তাদের চেয়ে বেশি কিছু করেন নি। সুতরাং তিনি উদ্বৃত্ত-মূল্যের হারের নিয়মগুলির সঙ্গে মুনাফার হারের নিয়মগুলিকে গুলিয়ে ফেলেন। আমরা আগেই দেখেছি, মুনাফার হার হল অগ্রিম-প্রদত্ত মোট মূলধনের সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার; উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার হল মূলধনের পরিবর্তনীয় অংশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার। ধরা যাক, ঐ ৫০০ পাউণ্ড। পরিমাণ একটি মূলধন (খ) গঠিত হয় ৪০০ পাউণ্ড পরিমাণ কাঁচামাল, শ্রম-উপকরণ ইত্যাদি ) এবং ১০০ পাউণ্ড পরিমাণ মজুরি (ম) নিয়ে; আরো ধরা যাক, উদ্বৃত্ত-মূল্য (উ)=১০০ পাউণ্ড। তা হলে আমরা দেখি, উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার উ =১০০%। কিন্তু মুনাফার হার -১::= ২০%। তা ছাড়া এটা পরিষ্কার যে, মুনাফার হার এমন সমস্ত ঘটনার উপরে নির্ভর করতে পারে যেগুলি কোনক্রমেই উদ্বৃত্ত-মূল্যের হারকে প্রভাবিত করে না। তৃতীয় গ্রন্থে আমি দেখাব যে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি মাত্র হার নির্দিষ্ট থাকলেও, আমরা পেতে পারি যে-কোনো সংখ্যক মুনাফার হার; আরো দেখাব যে, উদ্ধত্ত-মূল্যের বিভিন্ন হার নির্দিষ্ট অবস্থায়, একটি অভিন্ন হারে নিজেদের প্রকাশ করে।
২. শ্রম-দিবস স্থির : শ্রমের উৎপাদনশীলতা স্থির : শ্রমের তীব্রতা অস্থির
শ্রমের বর্ধিত তীব্রতার অর্থ হল একটি নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমের বর্ধিত ব্যয়। সুতরাং অধিকতর তীব্রতার একটি কর্মদিবস অল্পতর তীব্রতার একটি কর্মদিবসের তুলনায় অধিকতর সংখ্যক দ্রব্যোৎপাদনের প্রতিমূর্তি। একথা সত্য যে শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনশীলতাও একটি নির্দিষ্ট কর্ম-দিবসে অধিকতর সংখ্যক দ্রব্য উৎপাদন করবে। কিন্তু এই পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য হ্রাস পায়, কেননা তাতে আগের তুলনায় অল্পতর শ্রম-ব্যয় হয়; পূর্ববর্তী ক্ষেত্রে, ঐ মূল্য থাকে অপরিবর্তিত, কেননা প্রত্যেকটি উৎপন্ন দ্রব্য ব্যয়িত হয় আগের মত একই পরিমাণ শ্রম। এখানে তাদের একক-প্রতি মূল্যহ্রাস ছাড়াই আমরা অধিকতর সংখ্যক দ্রব্য পেয়ে থাকি; যেমন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তেমন তাদের দামের যোগফলও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বর্ধিত উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে, একটি নির্দিষ্ট মূল্য অধিকতর সংখ্যক উৎপন্ন দ্রব্যে বিস্তৃত হয়। সুতরাং কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য যদিও স্থির থাকে, তা হলে বর্ধিত তীব্রতার একটি দিবস বিস্তৃত হবে একটি বর্ধিত মূল্যে; এবং টাকার মূল্য অপরিবর্তিত থাকলে, অধিকতর সংখ্যক টাকায়। সৃষ্ট মূল্য সেই মাত্রায় পরিবর্তিত হয়, যে-মাত্রায় শ্রমের তীব্রতা তার সাধারণ তীব্রতা থেকে বিচ্যুত হয়। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট কর্ম-দিবস আর একটি স্থির মূল্য সৃষ্টি করে না সৃষ্টি করে একটি পরিবর্তনীয় মূল্য; ১২ ঘণ্টার মামুলি তীব্রতার -একটি দিনে সৃষ্ট মূল্যের পরিমাণ, ধরা যাক, ৬ শিলিং কিন্তু বর্ধিত তীব্রতার সঙ্গে তা বেড়ে দাড়াতে পারে ৭, ৮ বা তারও বেশি শিলিং-এ। এটা পরিষ্কার যে যদি এক দিনের শ্রমের দ্বারা সৃষ্ট মূল্য, ধরুন, ৬ শিলিং থেকে বেড়ে ৮ শিলিং হয়, তা হলে যে দুটি অংশে-শ্রমশক্তির দাম এবং উদ্বৃত্ত-মূল্যে—এই মূল্য বিভক্ত, সেই দুটিই যুগপৎ বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং বৃদ্ধি পেতে পারে হয় সমভাবে আর, নয়তো, অসমভাবে। দুটি মূল্যই একই সঙ্গে ৩ শিলিং থেকে বেড়ে ৪ শিলিং করে হতে পারে। এখানে শ্রমশক্তির মূল্য-বৃদ্ধি আবশ্যিক ভাবেই সূচিত করে না যে দামটি শ্রমশক্তির মূল্যের চেয়ে উপরে উঠেছে। বরং বিপরীত, দামে বৃদ্ধি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যে-হ্রাস ঘটতে পারে। যখনি শ্রমশক্তির দামে যে বৃদ্ধি ঘটে, তা তার বর্ধিত ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে না দেয়, তখনি এটা ঘটে।
আমরা জানি যে, কয়েকটি স্বল্পকালীন ব্যতিক্রম ছাড়া, শ্রমের উৎপাদনশীলতায় কোন পরিবর্তন শ্রমশক্তির মূল্যে কোনো পরিবর্তন ঘটায় না, অতএব, উদ্ধত্ত-মূল্যের আয়তনের কোনো পরিবর্তন ঘটার না-যদি না তন্দ্বারা প্রভাবিত শিল্পগুলির উৎপন্ন দ্রব্যগুলি শ্রমিকদের অভ্যাসগত ভাবে আবশ্যিক পরিভোগর বিষয় হয়। বর্তমান ক্ষেত্রে এই শর্তটি আর প্রযোজ্য নয়। কারণ যখন পরিবর্তনাট ঘটে শ্রমের দীর্ঘতায় বা তীব্রতায়, তখন সর্বদাই সৃষ্ট মূল্যের আয়তনে ঘটে আনুষঙ্গিক পরিবর্তন এবং এটা ঘটে জিনিসটিকে উক্ত মূল্যটি মূর্তি ধারণ করে, তা নির্বিশেষে।
