এই নিয়মটি সূত্রায়িত করতে গিয়ে রিকার্ডো একটি ঘটনা উপেক্ষা করেছিলেন; যদিও উদ্বৃত্ত-মূল্যের বা উত্ত-শ্রমের আয়তনে একটি পরিবর্তন শ্রমশক্তির মূল্যে কিংবা আবশ্যিক শ্রমের পরিমাণে বিপরীত দিকে একটি পরিবর্তন ঘটায়, তা থেকে এটা কোনক্রমেই এই সিদ্ধান্ত করা যায় না যে তারা একই অনুপাতে পরিবর্তিত হয়। তারা অবশ্যই একই পরিমাণে বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। কিন্তু তাদের আনুপাতিক বৃদ্ধি বা হ্রাস নির্ভর করে, শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বৃদ্ধি ঘটার পূর্বে তাদের যে মূল আয়তন ছিল, সেই আয়তনের উপরে। যদি শ্রমশক্তির মূল্য হয় ৪ শিলিং, কিংবা আবশ্যিক শ্রম সময় হয় ৮ ঘণ্টা, এবং উদ্বৃত্ত-মূল্য হয় ২ শিলিং কিংবা উদ্বৃত্ত-শ্রম হয় ৪ ঘণ্টা, এবং যদি শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বৃদ্ধি ঘটার ফলে শ্রমশক্তির মূল্য কমে দাঁড়ায় ৩ শিলিং কিংবা আবশিক শ্রম কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৬ ঘণ্টা, তা হলে, উদ্বৃত্ত মূল্য বেড়ে যাবে ৩ শিলিং-এ কিংবা উত্তম বেড়ে যাবে ৬ ঘণ্টায়। একই পরিমাণ, ১ শিলিং বা ২ ঘণ্টা, এক ক্ষেত্রে যোজিত হয় এবং অন্য ক্ষেত্রে বিয়োজিত হয়। কিন্তু প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আয়তনের আনুপাতিক পরিবর্তন বিভিন্ন। যখন শ্রমশক্তির মূল্য হ্রাস পায় ৪ শিলিং থেকে ৩ শিলিংএ অর্থাৎ ৪ বা ২৫ ভাগ, তখন উদ্বৃত্ত মূল্য বৃদ্ধি পায় ২ শিলিং থেকে ৩ শিলিংএ বা শতকরা ৫০ ভাগ। সুতরাং এ থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, শ্রমের উৎপাদনশীলতায় একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের দরুণ উদ্বৃত্ত-মূল্যে যে অনুপাতিক বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটে নির্ভর করে শ্রম-দিবসের সেই অংশের আয়তনের উপরে, যা নিজেকে প্রমূর্ত করে উদ্ধত্ত-মূল্যের মধ্যে; সেই অংশটি যত বেশি হয়, আনুপাতিক পরিবর্তন তত কম হয়।
(৩) উদ্বৃত্ত-মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস সব সময়েই শ্রম-শক্তির মূল্যে আনুষঙ্গিক হ্রাস বা বুদ্ধির অনুবর্তী, কখনো তা তার কারণ নয়।[২]
যেহেতু শ্রম-দিবসের আয়তন স্থির এবং প্রতিরূপায়িত হয় একটি স্থির আয়তনের মূল্যের দ্বারা, যেহেতু উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তনে প্রত্যেকটি পরিবর্তনের সঙ্গে আনুষঙ্গিক ভাবে সংঘটিত হয় শ্রমশক্তির মূল্যে একটি বিপরীতমুখী পরিবর্তন এবং যেহেতু এম শক্তির মূল্য শ্রমের উৎপাদনশীলতায় পরিবর্তন না ঘটলে পরিবর্তিত হতে পারে না, সেহেতু এই পরিস্থিতিতে এ থেকে পরিষ্কার ভাবে বেরিয়ে আসে যে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তনে প্রত্যেকটি পরিবর্তনের উদ্ভব ঘটে শ্রমশক্তির মূল্যে আয়তনের বিপরীতমুখী পরিবর্তন থেকে। তা হলে, যা আমরা আগেই দেখেছি, যদি শ্রমশক্তির মূল্যের এবং উদ্বৃত্ত-মূল্যের আপেক্ষিক আয়তনে পরিবর্তন ছাড়া তাদের অনুপেক্ষিক আয়তনে কোনো পরিবর্তন না ঘটতে পারে, তা হলে এখন এটা বেরিয়ে আসে যে, শ্রমশক্তির মূল্যের অনাপেক্ষিক আয়তনে আগে পরিবর্তন না ঘটলে তাদের আপেক্ষিক আয়তনে পরিবর্তন ঘটতে পারে না।
এই তৃতীয় নিয়মটি অনুসারে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তনে কোন পরবর্তনের পূর্বশর্ত হল শ্রমশক্তির মূল্যে পরিবর্তন, যে পরিবর্তন সাধিত হয় শ্রমের উৎপাদনশক্তিতে পরিবর্তনের দ্বারা। এই পরিবর্তনের মাত্রা নির্দিষ্ট হয় শ্রমশক্তির পরিবর্তিত মূল্যের দ্বারা। যাই হোক, এমনকি যখন অবস্থাবলীর এমন যে নিয়মটি কাজ করতে পারে, তখন অনুপূরক পরিবর্তন ঘটতে পারে! দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি শ্রমের বর্ধিত উৎপাদন শীলতার ফলে, শ্রমশক্তির মূল্য ও শিলিং থেকে ৩ শিলি-এ পড়ে যায় কিংবা আবশ্যিক শ্রম-সময় ৮ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টায় পড়ে যায়, তা হলে শ্রমশক্তির মূল্য সম্ভবতঃ ৩ শি ৮পে, ওশি ৬পে বা ৩শি ২ পেন্সের নীচে নামতে পারে না এবং, কাজে কাজেই উদ্ধত মূল্য :শি পে, ৩শি ৬পে বা ৩শি ১. পেন্সের উপরে উঠতে পারে না। এই পড়ে যাওয়ার পরিমাণ-যার সর্বনিম্ন সীমা হল ৩ শিলিং (শ্রম-শক্তির নোতুন মূল্য ) নির্ভর করে আপেক্ষিক ওজনের উপরে, যা একদিকে মূলধনের চাপ এবং অন্য দিকে শ্রমিকের প্রতিরোধ তুলাদণ্ডের উপরে স্থাপন করে।
শ্রম-শক্তির মূল্য নির্ধারিত হয় একটি নির্দিষ্ট-পরিমাণ অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যের দ্বারা। শ্রমের উৎপাদনশীলতায় পরিবর্তনের সঙ্গে এই অত্যাবশ্যক দ্রব্য সামগ্রীর পরিমাণে পরিবর্তন ঘটে না, ঘটে তার মূল্যে। অবশ্য, এটা সম্ভব যে, উৎপাদনশীলতায় বৃদ্ধির দরুন, শ্রমিক এবং ধনিক একই সময়ে সক্ষম হতে পারে এই এব্য-সামগ্রীর বৃহত্তর পরিমাণ আত্মকৃত করতে শ্রম-শক্তির দামে বা উভ-মূল্যে কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই। যদি শ্রমশক্তির মূল্য হয় ৩ শিলিং এবং আবশ্যিক শ্রম-সময়ের পরিমাণ হয় ৬ ঘণ্টা, যদি অনুরূপ ভাবে উদ্বৃত্ত-মূল্য হয় ৩ শিলিং উত্তম ৬ ঘণ্টা, তাহলেউহুভশ্রমের সঙ্গে আবশ্যিক শ্রমের অনুপাতে কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে যদি শ্রমের উৎপাদনশীলতাকে দ্বি-গুণিত করা যায়, তবে উদ্বৃত্ত-মূল্যে এবং শ্রমশক্তির দামে আয়তনের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। একমাত্র ফল দাড়াবে এই যে তাদের প্রত্যেকেই পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যবহারমূল্যের প্রতিনিধিত্ব করবে; এই ব্যবহার মূল্যগুলি পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ সস্তা হবে। যদি শ্রমশক্তি দামের দিক থেকে থাকে অপরিবর্তিত, তা হলে, তা হবে তার মূল্যের ঊর্ধ্বে। কিন্তু যদি শ্রম-শক্তির দাম পড়ে যেত—তার নোতুন মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যথাসম্ভব নিম্নতম বিন্দুটিতে নয়, ১ শিলিং ৬ পেন্সে নয়—পড়ে যেত ২শি ১০ পেন্সে বা ২ শিলিং ৬ পেন্সে, তা হলেও এই নিম্নতর দামটি প্রতিনিধিত্ব করত অত্যাবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীর একটি বর্ধিত পরিমাণের। এইভাবে এটা সম্ভব যে, শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা যখন বেড়ে চলেছে, শ্রম-শক্তির দাম তখন কমে চলেছে, এবং তবু এই কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের জীবন-ধান্বণের উপকরণসমূহের পরিমাণ অবিরত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের ক্ষেত্রেও, শ্রম-শক্তির মূল্যহ্রাসের ফলে উদ্বৃত্ত মূল্যের আনুষঙ্গিক বৃদ্ধি ঘটবে; এবং শ্রমিকের অবস্থান ও ধনিকের অবস্থানের মধ্যেকার ব্যবধান আরো প্রশস্ত হতে থাকবে।[৩]
