মিল বলেন, “মুনাফার কারণ এই যে, নিজের ভরণপোষণের জন্য যতটা প্রয়োজন শ্রম তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করে। এই পর্যন্ত পুরনো কাহিনী ছাড়া আর কিছু নয়; কিন্তু মিল চান নিজের কিছু যোগ করতে এবং তাই তিনি আরো বলেন, “উপপাদ্যটির রূপ বদলে এইভাবে খা যায় যে, মূলধন কেন মুনাফা দেয় তার কারণ এই যে খাদ্য, পরিধেয় দ্রব্যসামগ্রী ও হাতিয়ারসমূহকে উৎপাদন করতে যত সময় লেগেছিল, তারা তার থেকে দীর্ঘতর কাল টিকে থাকে।” মিল এখানে শ্রম-সময়ের স্থায়িত্বকালকে তার উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। এই মত অনুসারে, যেহেতু একজন রুটি প্রস্তুতকারকের উৎপন্ন দ্রব্যটি কেবল একদিন স্থায়ী হয় এবং একজন মেশিন প্রস্তুতকারকে উৎপন্ন দ্রব্যটি স্থায়ী হয় ২০ বছর বা তারও বেশি কাল, সেহেতু একজন মেশিন-প্রস্তুতকারক তার শ্রমিকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ মুনাফা আদায় করে নেয়, একজন রুটিপ্রস্তুতকারক তার শ্রমিকের কাছ থেকে সেই একই পরিমাণ মুনাফা আদায় করে নিতে পারে না। অবশ্য, এটা খুবই সত্য যে, একটা বাসা তৈরি করতে একটা পাখি যে সময় নেয়, বাসাটি যদি তার চেয়ে বেশি সময় টিকে না থাকত, তা হলে বাসা ছাড়াই পাখিদের কাজ চালাতে হত।
এই মৌল সত্যটি একবার প্রতিষ্ঠিত করেই মিল বাণিজ্যবাদীদের উপরে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন। তিনি আরো বলেন, “অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিনিময়ের ঘটনা থেকে মুনাফার উদ্ভব হয় না, উদ্ভব হয় শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি থেকে, এবং শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি যা তৈরি করে, সর্বদা তাই হচ্ছে একটি দেশের সামগ্রিক মুনাফ-কোনো বিনিময় ঘটুক আর নাই ঘটুক। যদি কোন কর্ম বিভাগ না থাকত, তা হলে কোন ক্রয়-বিক্রয় থাকত না, কিন্তু তবু মুনাফা থাকত।” সুতরাং মিল-এর কাছে, বিনিময়, ক্রয় ও বিক্রয় ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের এই সাধারণ অবস্থাবলী আনুষঙ্গিক ঘটনা মাত্র এবং এমনকি শ্রমশক্তির ক্রয় বিক্রয় ছাড়াও সব সময়েই মুনাফা হবে।
তিনি আরো বলেন, “যদি দেশের শ্রমিকেরা সমষ্টিগত ভাবে তাদের মজুরির তুলনায় শতকরা ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন করে, তা হলে মুনাফা হবে শতকরা ২০ ভাগ–দাম যা-ই হোক বা না হোক।” এক দিকে, এটা ‘থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি থোড়’-এর একটি বিরল নমুনা, কেননা শ্রমিকেরা যদি ধনিকের জন্য শতকরা ২০ ভাগ। উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করে, তা হলে, তার মুনাফা শ্রমিকদের মোট মজুরির অনুপাতে হবে ২০ : ১০০। অন্য দিকে কিন্তু একথা বলা যে “মুনাফা হবে শতকরা ২০ ভাগ” সম্পূর্ণ ভাবে মিথ্যা। মুনাফা হবে সব সময়েই অপেক্ষাকৃত কম, কেননা তা গোনা হয় অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের মোট সমষ্টির উপরে। দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক, ধনিক অগ্রিম দিয়েছে ৫০০ পাউণ্ড, যার মধ্যে ৪০০ পাউণ্ড বিনিয়োজিত হয়েছে উৎপাদনের উপায়-উপকরণে এবং ১০০ পাউণ্ড মজুরিতে এবং ধরা যাক, উদ্বৃত্ত মূল্যের হার ২০%, তা হলে মুনাফার হার হবে ২০:৫০ ০ অর্থাৎ ৪%; ২০% নয়।
তার পরে আসে সামাজিক উৎপাদন বিভিন্ন ঐতিহাসিক রূপ নিয়ে মিল-এর আলোচনার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। “আমি আগাগোড়াই এমন একটি পরিস্থিতি ধরে নিচ্ছি যা-যেখানে ধনিকেরা এবং শ্রমিকের দুটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী, সেখানে সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্রই বিশ্বজনীন ভাবে বিদ্যমান। সেই পরিস্থিতিটি এই যে শ্রমিকের সমগ্র পারিশ্রমিক-সহ সমস্ত খরচই ধনিক অগ্রিম দেয়। যে পরিস্থিতিটি এখনো পর্যন্ত এই পৃথিবীতে বিরাজ করে কেবল ব্যতিক্রম হিসাবে তাকে সর্বত্র দেখতে পাওয়া একটি অপূর্ব দৃষ্টিবিভ্রম! যাক, আগে আমরা শেষ করে নিই মিল স্বীকার করতে রাজি আছেন যে, “সে যে এই রকম করবে তা কোনো অন্তর্নিহিত আবশ্যিকতার ব্যাপার নয়।*[* ১৮৭৮ সালের ২৮শে নভেম্বর মার্ক এন এফ ড্যানিয়েলসনকে যা লিখেছিলেন, তদনুযায়ী “যে-পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত এই পৃথিবীতে বিরাজ করে তা কোনো অন্তর্নিহিত আবশ্যিকতার ব্যাপার নয়”-উল্লিখিত এই অনুচ্ছেদটি এইভাবে পড়া উচিত : “মিঃ মিল একথা স্বীকার করতে রাজি যে তার পক্ষে এই রকম হওয়াটা চূড়ান্ত ভাবে আবশ্যিক কিছু নয়—এমন কি যেখানে শ্রমিকেরা এবং ধনিকেরা দুটি ভিন্ন শ্রেণী, সেই অর্থনীতির অধীনেও নয়”-রুশ সংস্করণে ইনষ্টিটিউট অব মার্কসিজম লেনিনিজম’-এর টাকা।] বরং বিপরীত, “নিছক প্রাণ-ধারণের জন্য অপরিহার্য অংশটি বাদে মজুরির বাকি সকল অংশের জন্য শ্রমিকের উৎপাদন সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে, এমনকি, সমগ্র মজুরির জন্যও অপেক্ষা করতে হতে পারে—যদি নিজের সাময়িক গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যথেষ্ট অর্থ তার হাতে থাকে। কিন্তু এই শেষোক্ত ক্ষেত্রে শ্রমিক সেই মাত্রা পর্যন্ত, বাস্তবিক পক্ষে, একজন ধনিক, কেননা কারবারটি চালিয়ে নেবার জন্য সেও প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ সরবরাহ করেছে।” মিল আরো একটু এগিয়ে যেতে এবং এই কথা কটি জুড়ে দিতে পারতেন যে, যে-শ্রমিক নিজেকে কেবল প্রাণ-ধারণের উপকরণই নয় উৎপাদনের উপকরণও অগ্রিম দেয়, সেই শ্রমিক বস্তুত পক্ষে নিজের মজুরি-শ্রমিক ছাড়া কিছু নয়। তিনি একথাও বলতে পারতেন যে, আমেরিকার ক্ষুদ্র-চাষী-মালিক ভূমি-দাস ছাড়া কিছু নয়, কেননা সে তার প্রভুর বদলে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রম করে।
