ধনতান্ত্রিক উৎপাদন একদা ধরে নিত যে, তখন, অন্যান্য অবস্থা যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে উত্ত-শ্রমের পরিমাণ শ্রমের বাস্তব অবস্থাবলীর সঙ্গে, বিশেষ করে, মৃত্তিকার উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে, পরিবর্তিত হবে। কিন্তু এ থেকে কোনক্রমেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না। যে সবচেয়ে, সুফলা মৃত্তিকাই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির উদ্ভব ও বিকাশের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত। এই পদ্ধতিটির ভিত্তি হচ্ছে প্রকৃতির উপরে মানুষের আধিপত্য। যেখানে প্রকৃতি অতিরিক্ত অমিতব্যয়ী, সেখানে সে তাকে হাতে রাখে দড়িতে বাঁধা শিশুর মত।” সে তার উপরে নিজেকে বিকশিত করার কোনো আবশ্যকতা আরোপ করে না।[৫] উদ্ভিজ্জ সুসমৃদ্ধ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল সমূহ নয়, কিন্তু নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলই হচ্ছে মূলধনের মাতৃভূমি। কেবল মৃত্তিকার উর্বরতাই নয়, মৃত্তিকার বিভিন্নতা তার প্রাকৃতিক উৎপন্নগুলির বিচিত্রতা, ঋতুক্রমিক পরিবর্তনশীলতা—এই সমস্তই রচনা করে সামাজিক শ্রম-বিভাজনের বাস্তব ভিত্তি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষকে প্রণাদিত করে তার অভাব, তার সামর্থ্য, তার শ্রমের উপায় ও উপকরণ ইত্যাদিকে বহুগুণিত করতে। একটি প্রাকৃতিক শক্তিকে সমাজের নিয়ন্ত্রণে আনা, ব্যয়-সংকোচ করা, মানুষের হাতের কাজের সাহায্যে তাকে বৃহদায়তনে আত্মীকৃত বা বশীভূত করার আবশ্যকতাই শিল্পের ইতিহাসে সর্বপ্রথমে চুড়ান্ত ভূমিকা গ্রহণ করে। মিশর লোম্বাভি ও হল্যাণ্ডে কিংবা ভারত ও পারস্যে সেচ-ব্যবস্থাগুলি তার নিদর্শন।[৬] সেখানে কৃত্রিম খালগুলি কেবল জমিতে অত্যাবশ্যক জলই যোগায় না, সেই সঙ্গে পাহাড় থেকে পলি হিসাবে খনিজ সারও বয়ে নিয়ে যায়। আরবদে রাজত্বে স্পেন ও সিসিলিতে শিল্পের সমৃদ্ধ অবস্থার রহস্য নিহিত ছিল তাদের সেচকার্য সমূহের মধ্যে।[৭]
অনুকূল প্রাকৃতিক অবস্থা একক ভাবে কেবল উত্তমের সম্ভাবনাই সৃষ্টি করে, বাস্তবে উত্তম সৃষ্টি করে না এবং স্বভাবতই উদ্বৃত্ত-মূল্য ও উদ্ধত্ত উৎপন্ন সৃষ্টি করে। না। প্রাকৃতিক অবস্থায় পার্থক্যের ফল হল এই যে, একই পরিমাণ শ্রম বিভিন্ন দেশে, একগাদা ভিন্নতর প্রয়োজন পূরণ করে[৮] এবং কাজে কাজেই, অন্যান্য দিক থেকে অনুরূপ এমন অবস্থাতেও আবশ্যিক শ্রম-সময় হয় ভিন্নতর। এই অবস্থাগুলি উদ্বৃত্ত এমকে প্রভাবিত করে কেবল প্রাকৃতিক সীমারেখা হিসাবে অর্থাৎ সেই মাত্রাগুলিকে বেঁধে দিয়ে, যেখান থেকে অপরের জন্য শ্রম শুরু করা যেতে পারে। শিল্প যে-অনুপাতে অগ্রসর হয় এই প্রাকৃতিক সীমারেখাগুলি সেই অনুপাতে পিছিয়ে যায়। আমাদের ইউরোপীয় সমাজে, যেখানে শ্রমিক তার নিজের জীবিকার জন্য কাজ করার অধিকার ক্রয় করে কেবল উদ্বৃত্ত-শ্রমের অঙ্কে তার মূল্য দিয়ে সেখানে এই ধারণাটি অনায়াসে শিকড় বিস্তার করে যে, উদ্ধত্ত-উৎপন্ন সরবরাহ করাটা হচ্ছে মনুষ্য-শ্রমের একটি অন্তর্নিহিত গুণ।[৯] কিন্তু, নমুনা হিসাবে, এশীয়-দ্বীপপুঞ্জের পুব দিককার দ্বীপগুলির কথা ভেবে দেখুন, যেখানে সাগু বনের মধ্যে ইতস্ততঃ বিপুল পরিমাণে জন্মায়। “একটি গাছের ভিতরে গর্ত করে অধিবাসীরা যখন নিশ্চিত হয় যে তার অন্তর্বস্তু পেকে গিয়েছে, তখন কাণ্ডটিকে কেটে ফেলা হয় এবং কয়েক খণ্ডে ভাগ করা হয়; ভিতরের বস্তুটিকে বের করে জলের সঙ্গে মিশিয়ে হেঁকে নেওয়া হয়। এই ভাবেই তাকে সাণ্ড হিসাবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে নেওয়া হয়। একটা গাছ থেকে পাওয়া যায় ৩০০ পাউণ্ড; কখনো কখনো ৫০০ থেকে ৬০০ পাউণ্ড। তা হলে, সেখানে মানুষ বনে যায় এবং রুটি কেটে আনে ঠিক যেমন আমাদের লোকেরা জ্বালানি কেটে আনে।”[১০] এখন ধরে নিন যে এই ভাবে পুব দেশের একজন রুটি-কাটিয়ের লাগে তার সব অভাব পূরণের জন্য সপ্তাহে ১২ ঘণ্টা কাজ। প্রকৃতি তাকে প্রত্যক্ষভাবে দিয়েছে প্রচুর বিশ্রামের সময়। যাতে সে এই বিশ্রামের সময়টাকে তার নিজের জন্য উৎপাদনশীল হিসাবে ব্যবহার করতে পারে, তার জন্য আগে ঘটা দরকার গোটা এক প্রস্ত ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম; বহিরাগতদের জন্য উদ্বৃত্ত শ্রমে সেই সময় ব্যয় করার আগে প্রয়োজন বাধ্যতা-আলোপ। যদি ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রবর্তন করা যেত, তা হলে সেই ভাল মানুষটিকে একটি শ্রম-দিবসের ফল নিজের জন্য আত্মকৃত করতে সম্ভবত সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হত। প্রকৃতির দাক্ষিণ্য থেকে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না কেন তাকে সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হবে কিংবা কেন তাকে ৫ দিন উদ্বৃত্ত-শ্রম যোগাতে হবে। এ থেকে কেবল এই ব্যাখ্যাটাই পাওয়া যায় যে, তার আবশ্যিক শ্রম সময় কেন সপ্তাহে মাত্র এক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হবে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই তার উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন মনুষ্য-শ্রমের অন্তনিহিত কোনো গৃঢ় গুণ থেকে উদ্ভূত হয় না।
এই ভাবে, কেবল ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় বিকশিত শ্রমের সামাজিক উৎপাদন শীলতাই নয়, এমনকি, তার স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতাও প্রতিভাত হয় মূলধনের উৎপাদনশীলতা বলে- যে-মূলধনের সঙ্গে শ্রম-সংবদ্ধ !
উদ্বৃত্ত-মূল্যের উদ্ভব নিয়ে রিকার্ডো কখনো মাথা ঘামান না। তিনি তাকে গণ্য করেন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির অন্তর্নিহিত একটি জিনিস হিসাবে, যে-পদ্ধতিটি, তার চোখে সামাজিক উৎপাদনের স্বাভাবিক রূপ। যখনি তিনি শ্রমের উৎপাদন শীলতা সম্পর্কে আলোচনা করেন, তখনি তিনি তার মধ্যে সন্ধান করেন, উদ্বৃত্ত-মূল্যের কারণ নয়, তিনি সন্ধান করেন সেই কারণটিকে যা নির্ধারিত করে মূল্যের আয়তন। অন্য দিকে, তার ভক্তমণ্ডলী খোলাখুলিই ঘোষণা করে দিয়েছেন মুনাফার (পড়ুন ‘উদ্বৃত্ত-মূল্যের) উৎপত্তি-কারক কারণ হল শ্রমের উৎপাদনশীলতা। যাই হোক, বাণিজ্যবাদীদের তুলনায় এটা একটা অগ্রগামী পদক্ষেপ কেননা, তারা কোন দ্রব্যের উৎপাদনব্যয়ের তুলনায় তার দামের আধিক্যকে দেখতেন বিনিময়-ক্রিয়ার ফল হিসাবে, তার মূল্যের তুলনায় তাকে বেশি দামে বিক্রয়ের ফল হিসাবে। কিন্তু রিকার্ডোর ভক্ত-মণ্ডলী সমস্যাটিকে সোজাসুজি পরিহার করে চলেন, তারা তার সমাধান করেননি। বস্তুতঃপক্ষে, এই বুর্জোয়া অর্থতাত্ত্বিকেরা তাদের প্রবৃত্তি অনুযায়ী বুঝতে পেরেছিলেন, এবং সঠিকভাবেই পেরেছিলেন, যে উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপত্তির জ্বলন্ত প্রশ্নটিকে নিয়ে বেশি গভীরে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু জন স্টুয়ার্ট মিল সম্পর্কে আমরা কি ভাবব, যিনি রিকার্ডোর অর্ধ-শতাব্দী পরে, রিকার্ডোর প্রথমতম ব্যাখ্যা কারীরা যেসব প্রশ্ন শোচনীয় ভাবে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলিকে পুনর্বার নির্লজ্জভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন, অথচ গম্ভীরভাবে দাবি করেছেন যে, তিনি নাকি বাণিজ্যবাদীদের তুলনায় উৎকর্ষ ঘটিয়েছেন।
