এক দিক থেকে, অনাপেক্ষিক এবং আপেক্ষিক উদ্বত্ত-মূল্যের মধ্যে যে-কোনো পার্থক্যকে মনে হয় অলীক। আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্যই অনাপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য, কেননা তা শ্রমিকেরা নিজের অস্তিত্বের জন্য যে শ্রম-সময় আবশ্যক, তার বাইরেও শ্রম দিবসের অনাপেক্ষিক দীর্ঘায়ন ঘটায়। অনাপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্যই আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মুল্য, কেননা, তা শ্রমের উৎপাদনশীলতার এতটা অগ্রগতি আবশ্যক করে তোলে যে আবশ্যক শ্রম-সময়কে শ্রম-দিবসের একটি অংশমাত্রে সীমিত করা যায়। কিন্তু আমরা যদি উদ্বৃত্ত মূল্যের আচরণকে স্মরণে খি, তাহলে এই একাত্মতা অন্তর্হিত হয়ে যান। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি একবার যদি প্রতিষ্ঠিত ও পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়, তা হলে যখনি উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার বৃদ্ধির প্রশ্ন উঠবে, তখনি অনাপেক্ষিক ও আপেক্ষিক মূল্যের মধ্যকার পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠবে। শ্রমশক্তিকে তার যা মূল্য তাই মজুরি হিসাবে দেওয়া হয়, এটা ধরে নিলে আমরা এই বিকল্পের মুখোমুখি হই : শ্রমের উৎপাদন শীলতা এবং তার স্বাভাবিক তীব্রতা নির্দিষ্ট থাকলে, উদ্বৃত্ত মূল্যের হার বৃদ্ধি করা যার কেবল মাত্র একদিকে সত্য সত্যই দীর্ঘায়িত করে; অন্য দিকে, শুম-দিবসের দৈৰ্য যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে উক্ত মূল্যের হার বৃদ্ধি করা যায় কেবলমাত্র শম দিবসের দুটি উপাদানের অর্থাৎ আবশ্যিক শ্রম ও উদ্ধত্ত শ্রমের আপেক্ষিক আয়তনে পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন একটি পরিবর্তন যার পূর্বশর্ত হল হয়, শ্রমের উৎপাদনশীলতায় আর নয়তো তার তীব্রতার পরিবর্তন সাধন-যদি মজুরিকে শ্রমশক্তির নীচে নেমে যেতে না হয়।
শ্রমিক যদি তার নিজের ও তার বংশের জন্য জীবনধারণের আবশ্যিক উপকরণাদি উৎপাদন করতেই তার গোটা সময়টা লাগিয়ে দেয়, তা হলে অন্যান্যের জন্য মুফতে কাজ করার মত কোনো সময় বাকি থাকে না। তার শ্রমে একটা বিশেষ মাত্রায় উৎপাদনশীলতা ছাড়া, তার হাতে কোনো বাড়তি সময় নাই; এই বাড়তি সময় ছাড়া, কোনো উদও শ্রম নয় এবং কোনো ধনিকও নয়, কোনো গোলাম মালিকও নয় কোনো সামন্ত প্রভুও নয়, এক কথায়, বৃহৎ স্বত্বাধিকারীদের কোনো শ্ৰেণীই নয়।[১]
অতএব, আমরা বলতে পারি যে উদ্বৃত্ত-মূল্য দাঁড়ায় একটি প্রাকৃতিক ভিত্তির উপরে; কিন্তু এটা মেনে নেওয়া যায় কেবল এই অতি ব্যাপক অর্থে যে, তার নিজের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম থেকে নিজেকে ভারমুক্ত করা এবং অন্য কাউকে তারা ভারমুক্ত করা থেকে কোন মানুষকে অনাপেক্ষিক ভাবে নিবারণ করার পথে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক নেই, যেমন অন্য মানুষের মাংস ভক্ষণ করা থেকে কোন মানুষকে নিবারণ করার পথে নেই কোনো অজেয় প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক।[২] ইতিহাসের প্রক্রিয়ার বিকশিত শ্রমের এই উৎপাদনশীলতার সঙ্গে কোনক্রমেই কোনো রহস্যময় ধ্যান-ধারণা যুক্ত করা উচিত নয়। মানুষ যখন নিজেদেরকে জন্তু-জানোয়ারের স্তর থেকে উর্বে তুলতে সক্ষম হয়েছে, অতএব যখন তাদের শ্রম কিছুটা মাত্রায় সমাজীকৃত হয়েছে, কেবল তার পরেই এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, যেখানে একজনের উদ্ধত্ত শ্রম আর একজনের অস্তিত্বের শর্ত হয়ে ওঠে। সভ্যতার প্রত্যুষকালের শ্রমের উপার্জিত উৎপাদনশীলতা ছিল সামান্য, কিন্তু তখন অভাবও ছিল স্বল্প, যা বিকাশ লাভ করে তাদের পরিপুর্তি-সাধনের সঙ্গে সঙ্গে এবং মাধ্যমে। তা ছাড়া, সেই প্রত্যুষকালে, সমাজের যে-অংশ অন্যান্যের শ্রমের উপরে বেঁচে থাকত, তার আয়তন ছিল প্রত্যক্ষ উৎপাদনকারিদের বিপুল সমষ্টির তুলনায় নিরতিশয় ক্ষুদ্র শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের এই ক্ষুদ্র অংশটিও অপেক্ষিক ও আপেক্ষিক উভয় ভাবেই বৃদ্ধি পায়।[৩] তা ছাড়া, তার আনুষঙ্গিক সম্পর্কসমূহ সহ মূলধনেরও উদ্ভব ঘটে-উদ্ভব ঘটে এমন একটি অর্থ নৈতিক ভূমি থেকে, যা এক দীর্ঘ বিকাশ-প্রক্রিয়ার ফল। তার ভিত্তি ও সূচনা-বিন্দু হিসাবে কাজ করে যে শ্রমের উৎপাদনশীলতা তা প্রকৃতির দান নয়, সহস্র সহস্র শতাব্দীর ইতিহাসের দান।।
সামাজিক উৎপাদনের রূপটিতে বিকাশের কম বা বেশি মাত্রা ছাড়া, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাস্তব অবস্থাবলীর দ্বারা শৃংখলিত। এই সব অবস্থা স্বয়ং মানুষের গঠন (বংশ ইত্যাদি) এবং চতুস্পার্শ্বস্থ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাইরেকার বাস্তব অবস্থাগুলি দুটি বৃহৎ অর্থ নৈতিক শ্রেণীতে বিভক্ত: (১) জীবনধারণের উপায় সমূহে প্রাকৃতিক সম্পদ, যথা ফলে ভরা মাটি, মাছে ভরা জল ইত্যাদি শ্রমের উপকরণাদিতে প্রাকৃতিক সম্পদ, যথা ঝরনা, নাব্য নদ-নদী, বন, ধাতু, কয়লা ইত্যাদি। সভ্যতার প্রত্যুষে প্রথম শ্রেণীটিরই প্রাধান্য থাকে; বিকাশের একটি উচ্চতর পর্যায়ে প্রাধান্য করে দ্বিতীয় শ্রেণীটি। দৃষ্টান্ত হিসাবে, ইংল্যাণ্ডের তুলনা করুন ভারতের সঙ্গে, অথবা প্রাচীন যুগে, অথেন্স ও কোরিন্থের সঙ্গে কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী দেশগুলির।
অবশ্যই পূরণ করতে হবে এমন স্বাভাবিক অভাবের সংখ্যা যত অল্প হবে এবং ভূমির স্বাভাবিক উবরতা এবং জলবায়ুর আনুকূল্য যত অধিক হবে, উৎপাদনকারীর ভরণ-পোষণ ও পুনরুৎপাদনের জন্য তত কম শ্রম-সময়ের আবশ্যক হবে। সুতরাং নিজের জন্য তার শ্রমের তুলনায় অন্যান্যের জন্য তার শ্রমের আধিক্য ঢের বেশি হতে পারে। প্রাচীন মিশরীয়দের সম্পর্কে ‘ডিয়োডারাস অনেক কাল আগে এই মন্তব্য করেছিলেন : “এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য, তাদের শিশু-সন্তানের প্রতিপালনের জন্য তাদের কত সামান্য ঝামেলা পোয়াতে হয় এবং খরচ পোষাতে হয়। তাদের জন্য তারা রান্না করে হাতের কাছে প্রথম পাওয়া সাদামাটা খাবার; নল-খাগড়ার নিচের দিকটা আগুনে সেঁকে তারা তাদের খেতে দেয়; জলজ গাছপালার ডাটা ও শিকড়ও তারা দেয় কোনটা কাঁচা কোনটা সেদ্ধ করে কোনটা সেঁকে। বাতাস এত স্নিগ্ধ যে অধিকাংশ শিশুই পায়ে জুতো বা গায়ে কাপড় পরে না। সুতরাং যত কাল পর্যন্ত শিশু বড় না হচ্ছে, তত কাল তার জন্য তার মা-বাবার সর্বসাকুল্যে কুড়ি ‘ড্র্যাকমা’-রও বেশি খরচ লাগে না। মিশরের জনসখ্যা যে এত সুবিপুল এবং, অতএব, সেখানে এত বিরাট বিরাট কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা সম্ভব হত, এটাই তার প্রধান কারণ।”[৪] যাই হোক, প্রাচীন মিশরের মহং নির্মাণ কার্যগুলির প্রধান কারণ এটা নয় যে তার জনসংখ্যা ছিল সুবিপুল, প্রধান কারণ এই যে, এই জনসংখ্যার একটা বৃহৎ অনুপাতই ছিল অবাধে ব্যবহার্য। যেমন কোন ব্যক্তিগত শ্রমিকের বেলায় তার আবশ্যিক শ্রম-সময় যত কম হয়, সেই অনুপাতে সে বেশি উদ্ধত্ত শ্রম করতে পারে, একটি শ্রমজীবী জন সংখ্যার বেলায়ও তেমনি। জীবনধারণের আবশ্যিক উপকরণসমূহ উৎপাদনের জন্য শ্রম-সময়ের যত কম অংশের প্রয়োজন হয়, তার তত বেশি অংশ অন্য কাজে নিয়োগ করা যায়।
