অন্য দিকে, অবশ্য, উৎপাদনশীল শ্রম-সম্পকে আমাদের ধারণা সঠিক হয়ে যায়। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন কেবল পণ্যদ্রব্যেরই উৎপাদন-মাত্র নয়, মূলত তা উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন। শ্রমিক তার নিজের জন্য উৎপাদন করে না, উৎপাদন করে মূলধনের জন্য। সুতরাং, সে যদি কেবল উৎপাদাই করে, তা হলেই যথেষ্ট হয়। তাকে অবশ্যই উৎপাদন করতে হবে উদ্বৃত্ত-মূল্য। একমাত্র সেই একই উংপাদনশীল, যে ধনিকের জন্য উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করে, এবং এই ভাবে মূলধনের আত্মবিস্তারের জন্য কাজ করে। বস্তুগত বিষয়ের উৎপাদন-পরিধির বাইরে থেকে যদি একটা দুষ্টান্ত নেওন্না যায়, তা হলে বলা যায় যে, একজন মাস্টারকে তখন উৎপাদনশীল শ্রমিক বলে গণ্য করা হবে যখন তিনি তার ছাত্রদের মাথার উপরেই কেবল গায়ের জোর খাটাবেন না, সেই সঙ্গে তিনি স্কুল-মালিককে ধনী করার জন্য ঘোড়ার মত কাজ কবেন। সসেজ-কারখানায় না খাটিয়ে ঐ মালিকটি যে স্কুল-কারখানায় টাকা খাটাচ্ছে, তাতে কোনো ইতর-বিশেষ হয় না। সুতরাং উৎপাদনশীল শ্রমিকের ধারণা কেবল কাজ এন তার কার্যোপযোগ ফলের মধ্যেকার, শ্রমিক এবং তার মোৎপন্ন দ্রব্যের মধ্যেকার সম্পর্ককেই বোঝায় না, সেই সঙ্গে তা বোঝায় উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ককে-যে-সম্পর্কটির উদ্ভব ঘটে ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় এবং শ্রমিককে ছাপ মেরে দেয় উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের প্রত্যক্ষ উপায় হিসাবে। সুতরাং, উৎপাদনশীল শ্রমিক হওয়া আজ আর ভাগ্যে কথা নয়, দুর্ভাগ্যের কথা। চতুর্থ গ্রন্থে, যেখানে আলোচনা করা হবে এই তত্ত্বটির ইতিবৃত্ত, সেখানে আরো পরিষ্কার ভাবে দেখা যাবে যে, চিরায়ত অর্থনীতিবিদরা বরাবরই উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদনকে উৎপাদন শীল শ্রমিকের পার্থক্যমূলক বৈশিষ্ট্য হিসাবে দেখিয়ে এসেছেন। অতএব, উদ্ধত্ত মূল্য সম্পর্কে তাদের ধারণা পরিবর্তিত হবার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমিক সম্পর্কে তাদের সংজ্ঞারও পরিবর্তন ঘটে যায়। এই প্রকৃতি-তান্ত্রিক অর্থতাত্ত্বিকেরা ( ‘ফিজিওক্র্যাটস) সজোরে বলতেন যে, একমাত্র কৃষি-শ্রমই হচ্ছে উৎপাদনশীল, কেননা, তাদের মতে, একমাত্র কৃষি-এমই উদ্বৃত্ত-মূল্য প্রদান করে। এবং তারা একথা বলেন কারণ তাদের কাছে খাজনার রূপে ছাড়া উদ্বৃত্ত-মূল্যের অন্য কোনো রূপে কোনো অস্তিত্বই নেই।
শ্রমিক যতটা সময় খাটলে তার শ্রমশক্তির মূল্যের ঠিক সমান পরিমাণ উৎপন্ন কর যেত, ততটা সময়ের বাইরে শ্রম-দিবসের দীর্ঘত-সাধন এবং সেই উদ্ম-শ্রমের ফুলকে মূলধন কর্তৃক আত্মীকরণ—এটাই হল অপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন। এই অপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদনই ধনতাকি ব্যবস্থার সাধারণ ভিত্তিভূমি রচনা করে এবং আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের সূত্রপাত করে। ‘আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের পূর্বশর্ত হল শ্রম-দিবসের দুটি ভাগে বিভাজন, আবশ্যক শ্রম এবং উদ্বৃত্ত-শ্রম। উদ্ধত্ত শ্রমকে দীর্ঘায়িত করার জন্যে, আবশ্যিক শ্রমকে এমন সব পদ্ধতি দিয়ে হস্থায়িত করা হয়, যার ফলে প্রদেয় মজুরি সমপরিমাণ মূল্য উৎপাদিত হয়। তল্পতর সময়ে। অপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন একান্তভাবে ন করে শ্রম দিবসের দৈর্ঘ্যের উপরে; অনাপেক্ষিক উও-মূল্যের উৎপাদন শ্রমের কারিগরি প্রক্রিয়াগুলিতে এবং সমাজের গঠন-বিন্যাসে পুরোপুরি প্লিব ঘটিয়ে দেয়। সুতরাং, তার পূর্বশর্ত হল একটি বিশেষ প্রণালীর, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালীর অস্তিত্ব-যে প্রণালীটি মূলধনের কাছে শ্রমের আনুষ্ঠানিক বশ্যতার ভিত্তিতে নিজের রীতি-পদ্ধতি, উপায়-উপকরণ ও অস্থাবলী সমেত—আপনা-আপনি গতে ওঠে ও বেড়ে ওঠে। এই বিকাশের পথে আনুষ্ঠানিক বশ্যতার স্থান গ্রহণ করে আসল বশ্যত।
উৎপাদনকারীর উপরে প্রত্যক্ষ জবরদস না খাটিয়ে কি ব; মূলধনের কাছে স্বয়ং উৎপাদনকারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অধীনস্থ না করে, উদ্বৃত্ত-শ্রম আদায় করে নেবার কয়েকটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে। এই ধরনের ব্যবস্থাগুলিতে মূলধন তখনো পর্যন্ত শ্রম-প্রক্রিয়ার উপরে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেনি। পুরাতন চিরাচরিত উপায়ে হস্তশিল্প ও কৃষিকর্ম পরিচালনা করে এমন স্বাধীন উৎপাদনকারীদের পাশাপাশি, সেখানে দাড়িয়ে থাকে তার তেজারতি মূলধন বা সওদাগরি মূলধন নিয়ে কুসিদজীবী বা সওদাগর—যে তাদের উপরে পুষ্ট হয় পরগাছার মত। যে সমাজে শোষণের এই রূপটির আধিপত্য থাকে সেখানে তা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিকে স্থান দেয় না। তবে এই রূপটি ঐ পদ্ধতিটির অভিমুখে একটি ক্রান্তিকালীন পর্যায় হিসাবে কাজ করতে পারে। যেমন করেছিল মধ্যযুগের শেষ দিকে। সর্বশেষে, আধুনিক “গৃহশিল্প থেকে যে ঘটনাটা প্রতিপন্ন হয়, আধুনিক শিল্পের পটভূমিকায় কিছু অন্তর্বর্তী রূপ এখানে সেখানে পুনরুৎপাদিত হয়, যদিও তাদের চেহারা সম্পূর্ণ পালটে যায়।
যদি, এক দিকে, মূলধনের কাছে শ্রমের কেবল আনুষ্ঠানিক অধীনতাই অনাপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের পক্ষে যথেষ্ট হয়, দৃষ্টান্ত হিসাবে, যদি, যে-হস্তশিল্পীরা পূর্বে স্বাধীন ভাবে বা কোন মনিবের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ করত, তারা এখন কোন ধনিকদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের অধীনে মজুরি-শ্রমিক হিসাবে কাজ করে, তা হলে, অন্য দিকে, আমরা দেখেছি, কিভাবে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের পদ্ধতিগুলি সেই সঙ্গে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের পদ্ধতি হয়ে ওঠে। অধিকন্তু, শ্রম দিবসের অতিরিক্ত দীর্ঘতী-সাধন আধুনিক শিল্পের স্ববিশিষ্ট অবদান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সাধারণ ভাবে বলা যায়, সুনির্দিষ্টভাবে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি আর তখন আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের নিছক উপায়মা থাকে না, যখন তা উৎপাদনের একটি সমগ্র শাখাকে জয় করে ফেলেছে। আরো থাকে না যখন তা সমস্ত গুরুত্বপূর্ন শাখাগুলি জয় করে ফেলেছে। এটা তখন পরিণত হয় সাধারণ, সামাজিক ভাবে আধিপত্যশীল রূপ আপেক্ষিক মূল্য উৎপাদনের একটি বিশেষ পদ্ধতি হিসাবে তখন তা কার্যকর থাকে, প্রথমত, যতদূর পর্যন্ত তা সেইসব শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, যেগুলি পূর্বে ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক ভাবে মূলধনের অধীনে, অর্থাৎ যতদূর পর্যন্ত তা পালন করে ধর্মান্তর-সাধনকারী’-র ‘প্রাপাগাণ্ডিস্ট’-এর) ভূমিকা; দ্বিতীয়তঃ যতদূর পর্যন্ত তা যেসব শিল্প অধিগ্রহণ করেছে, সেগুলি উৎপাদন-পদ্ধতিতে পরিবর্তনের দ্বারা বিপ্লবাত হতে থাকে।
