————
১. আপনি জনসংখ্যাকে দুটি বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে দেন—অমার্জিত বর্বর এবং নপুংশক বামন। হায় ভগবান কৃষি ও বাণিজ্যিক স্বার্থে বিভক্ত একটি জাতি নিজেকে মনে করে সুস্থ-স্কি বলে ! কেবল তাই নয়, নিজেকে আখ্যাত করে আলোকদীপ্ত ও সুসভ্য বলে ! আর তকরে এই দানবীয় ও অস্বাভাবিক বিভাগ সত্ত্বেও নয়, তার কারণেই। ( ডেভিড আর্কুহার্ট, ফ্যামিলিয়ার ওয়ার্ডস”, ১৮৫৫, পৃঃ ১১৯)। এই অনুচ্ছেদটিতে একই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে সেই ধরনের সমালোচনার শক্তি ও দুর্বলতা, যা জানে কিভাবে বর্তমানকে নিন্দা করতে হয়, কিন্তু জানে না কিভাবে তাকে অনুধাবন করতে হয়।
২. দ্রষ্টব্য : লাইবিগ : “Die chemie in ihrer Anwendung auf Agri cultur und Physiologie”, 1862, GP Racon PCS “Einleitung in die Naturgesetze des Feldbaus, প্রথম খণ্ড। লাইবিগ-এর অন্যতম অবিনশ্বর কীতি হল প্রকৃতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক কৃষিকর্মের নঙর্থক অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক দিকটিকে বিকশিত করা। কৃষিকর্মের ইতিহাসের তার সংক্ষিপ্ত বিবরণী, যদিও গুরুতর ভুলভ্রান্তি থেকে মুক্ত নয়, তবু তাতে আছে এখানে সেখানে আলোর ঝলক। এট। অবশ্য দুঃখজনক যে কিছু কিছু এলোমেলে। বক্তব্য তাঁর কাছ থেকে এসেছে, যেমন এই বক্তব্যটি : “আরো বেশি গুড়ো গুড়ো করে এবং আরো ঘন ঘন করে সচ্ছিদ্র মৃত্তিকার অন্তর্ভাগে বায়ু-চলাচল বৃদ্ধি করা যায় এবং আবহাওয়ার ক্রিয়াশীলতার দিকে উন্মুক্ত মৃত্তিকাপৃষ্ঠকে বর্ধিত ও নবীকৃত করা যায়। কিন্তু সহজেই চোখে পড়ে যে জমির বর্ধিত ফলন কখনো সেই জমিতে ব্যয়িত শ্রমের সঙ্গে আনুপাতিক হয়না; কিন্তু ত বৃদ্ধি পায় অনেক অল্পতর অনুপাতে। এই নিয়মটি, লাইবিগ বলেন, “প্রথম উপস্থাপিত করেন জন স্টুয়ার্ট মিল তার প্রিন্সিপল অব পলিটিক্যাল ইকনমি’ নামক গ্রন্থে ( প্রথম খণ্ড, পৃঃ ১৭।; তার উপস্থাপনা ছিল এইরকম : ‘নিযুক্ত শ্রমিক-সংখ্যার বৃদ্ধির অনুপাতে জমির ফলন বৃদ্ধি পায় হ্রাসমান হারে { রিকার্ডোর মতাবলম্বীদের দ্বারা প্রণীত একটি নিয়মকে মিল এখানে একটি ভ্রান্ত রূপে উপস্থিত করেছেন, কেননা যেহেতু নিযুক্ত শ্ৰমিকসংখ্যার হ্রাস’ ইংল্যাণ্ডে কৃষিকর্মের অগ্রগতির সঙ্গে সমান তাল রক্ষা করেছিল, সেই হেতু ইংল্যাণ্ডে আবিষ্কৃত ও প্রযুক্ত নিয়মটির সেই দেশে, সর্বক্ষেত্রে,
যোজ্য হতে পারেন। এটা হল কৃষি-শিল্পের সর্বজনীন নিয়ম। এট। বিশেষ উল্লেখযোগ্য, কেননা মিল এই নিয়মের কারণটি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন।” (লাইবিগ, ঐ, পৃঃ ১৪৩ ও ‘নোট’)। শ্রম’ কথাটি রাষ্ট্রীয় অর্থতবে যে-অর্থে ব্যবহৃত হয়, লাইবিগ সে অর্থ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস বুঝেছেন; ‘শ্রম’ কথাটির এই ভুল ব্যাখ্যা ছাড়াও, এটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, যে-তত্ত্বটি অ্যাডাম স্মিথের আমলে জেমস এণ্ডাসন প্রথম প্রকাশ করেছিলেন এবং যেটি উনিশ শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত নানা রচনায় বারবার পুনরুল্লিখিত হয়, যে-তত্ত্বটি লেখা-চুরিতে ওস্তাদ সেই ম্যালথাস নামে ব্যক্তিটি ১৮১৫ সালে আত্মসাৎ করে ফেলেন, যে তত্ত্বটি ওয়েস্ট বিকশিত করেছিলেন এণ্ডার্সন থেকে স্বতন্ত্র ভাবে এবং একই সময়ে; যে তত্ত্বটিকে ১৮১৭ সালে রিকার্ডো সংযোজিত করেছিলেন মূল্যের সাধারণ তকটির বিকৃতি সাধন করেছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিলের জনক জেমস মিল এবং যে বহুল-প্রচলিত এবং এমনকি স্কুলের ছাত্রদের কাছেও পরিজ্ঞাত তত্ত্বটিকে সর্বশেষে জন স্টুয়ার্ট মিল ও অন্যান্যরা পুনরুৎপাদিত করেন একটা বদ্ধ মতবাদ হিসাবে-সেই তত্ত্বটির প্রথম প্রণেতা হিসাবে লাইবিগ নাম করবেন জন স্টুয়ার্ট মিলের! এটা অস্বীকার করা যায়না যে, জন স্টুয়ার্ট মিল সর্বক্ষেত্রে, তার উল্লেখযোগ্য কর্তৃত্বের জন্য প্রায় সমগ্র ভাবেই ঋণী এই ধরনের পারস্পরিক পৃষ্ঠ-কণ্ডুয়নের কাছে।
১৬. অনাপেক্ষিক ও আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য
পঞ্চম বিভাগ–অনাপেক্ষিক ও আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন
ষোড়শ অধ্যায় –অনাপেক্ষিক ও আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্য
শ্ৰম-প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনুসন্ধানের সূচনায় আমরা তাকে আলোচনা করেছিলাম অমূর্ত ভাবে, তার ঐতিহাসিক রূপগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে, মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হিসাবে (সপ্তম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। সেখানে বলেছিলাম, “সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে যদি আমরা পরীক্ষা করি তার ফলের তথা উৎপন্ন দ্রব্যের দৃষ্টিকোণ থেকে, তা হলে এটা স্পষ্ট হয় যে, শ্রমের যন্ত্রপাতি ও তার বিষয় উভয়ই হল উৎপাদনের উপায় এবং শ্রম নিজেই হল উৎপাদনশীল শ্রম।” এবং ঐ একই পৃষ্ঠায় ২নং টীকায় আমরা আরো বলেছিলাম, “উৎপাদনশীল শ্রম কি তা এককভাবে শ্রম-প্রক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ধারণের পদ্ধতিটি কোনক্রমেই প্রত্যক্ষত ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।” এখন আমরা এই বিষয়টির আরো বিস্তার-সাধন করব।
যতদূর পর্যন্ত শ্রম-প্রক্রিয়া ব্যক্তিগত, ততদূর একই শ্রমিক তার মধ্যে সংযুক্ত করে সব কটি কাজ, যা পরবর্তীকালে বিযুক্ত হয়ে যায়। যখন একজন ব্যক্তি তার জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রকৃতি-প্রদত্ত বিষয়গুলি আত্মসাৎ করে, তখন সে নিজে ছাড়া আর কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। একজন একক ব্যক্তি প্রকৃতির উপরে কাজ করতে পারে না তার নিজেরই মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে তার নিজেরই পেশীসমূহকে কাজে না লাগিয়ে। যেমন একটি স্বাভাবিক দেহে মাথা এবং হাত পরস্পরের উপরে নির্ভর করে, তেমনি শ্রম-প্রক্রিয়া মাথার শ্রমকে হাতের শ্রমের সঙ্গে সংযুক্ত করে। পরবর্তীকালে তারা বিযুক্ত হয়ে যায়, এমনকি পরস্পরের সাংঘাতিক শত্রুতে পরিণত হয়। উৎপন্ন দ্রব্যটি আর ঐ ব্যক্তির উৎপন্ন দ্রব্য থাকে না, সেটি পরিণত হয় একটি সামাজিক উৎপন্ন দ্রব্যে, য। উৎপাদিত হয় সমষ্টিগত ভাবে একজন যৌথ-শ্রমিকের দ্বারা অর্থাৎ শ্রমিকদের একটি সংযোজনের দ্বারা, যাদের প্রত্যেকে তাদের শ্রমের বিষয়টিকে একটি নির্দিষ্টরূপে রূপায়িত করার জন্য কেবল একটি আংশিক ভূমিক। মাত্র গ্রহণ করে, তা সে ভূমিকা একটু বড়ই হোক বা একটু ছোটই হোক। শ্রম-প্রক্রিয়ার সহযোগমূলক চরিত্রটি যতই বেশি বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে, ততই তার আবশ্যিক ফলশ্রুতি হিসাবে উৎপাদনশীল শ্রম সম্পর্কে এবং তার যে প্রতিনিধি, উৎপাদনশীল শ্রমিক, তার সম্পর্কে আমাদের ধারণাও বিস্তার লাভ করতে থাকে! উৎপাদনশীল ভাবে শ্রম করতে হলে এখন আর গপনার নিজের পক্ষে দৈহিক শ্রম করার প্রয়োজন পড়ে ন’; আপনি যদি ঐ যৌথ-শ্রমিকের একটি অঙ্গ-মাত্র ২ন এন, তার যে-কোনো এক অধীনস্থ কাজ করেন, তা হলেই যথেষ্ট। উংপাদনশীল শ্রমের যে প্রথম সংজ্ঞাটি উপরে দেওয়া হয়েছে, যা নির্ণীত হয়েছিল বস্তুগত বিষসমূহের উৎপাদনের নিজস্ব প্রকৃতি থেকেই, সেই সংজ্ঞা এখনো যৌথ-এ.কে. ক্ষেত্রেও সঠিকই আছে, যদি আম। যৌথ-শ্রমিককে সমগ্র ভাবে একটি সত্তা হবে বিবেচনা করি। কিন্তু ঐ যৌথ-শ্রমিকের প্রত্যেকটি সদস্যকে যদি আলাদ। আলাল ভাবে চেন, করা হয়, তা হলে এটি আর খাটে না।
