১) কাপড়-কল : এখানে যা ছিল, প্রায় তাই আছে; ১০ বছরের বেশি বয়সের শিশুর দৈনিক ৫.৫ ঘণ্টা কিংবা, শনিবার ছুটি নিলে, দৈনিক ৬ ঘণ্টা কাজ করতে পারে; তরুণ-তরুণীর ৫ দিন ১৫ ঘণ্টা এবং শনিবা সর্বাধিক ৬.৫ ঘণ্টা কাজ করতে পারে।
(২) কাপড় কল ছাড়া অন্যান্য কারখানা। এখানে নিয়ম-কানুনগুলিকে আগের চেয়ে ১ নম্বরের নিয়ম-কানুনগুলির আরো কাছাকাছি আনা হয়েছে; কিন্তু এখনো এমন কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যেগুলি ধনিকদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে এবং যেগুলিকে কোন কোন ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র সচিবের বিশেষ অনুমতি-বলে সম্প্রসারিত করা যায়।
(৩) কর্মশালাগুলির সংজ্ঞা আগেকার আইনের মতই প্রায় রাখা হয়েছে। সেখানে নিযুক্ত শিশু, তরুণ এবং নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কর্মশালাগুলি কাপড়-কল ছাড়া অন্যান্য কারখানার অনুরূপ কিন্তু খুটিনাটির বেলায় শতগুলি শিথিল।
(৪) যেসব কর্মশালায় কোনো শিশু বা তরুণকে নিযুক্ত করা হয় না; কেবল ১৮ বছর বয়সের বেশি বয়সী পুরুষ ও নারীকেই নিযুক্ত কর হয়; এর। কিছুটা সহজতর শর্ত ভোগ করে।
(৫) ঘরোয়া কর্মশালা, যেখানে পারিবারিক বাসস্থানে কেবল পরিবারের সদস্যরাই নিযুক্ত থাকে : আরো বেশি নমনীয় নিয়ম-কানুন এবং সেই সঙ্গে এই নিয়ন্ত্রণ যে, মন্ত্রিসভার বিশেষ অনুমতি ছাড়, পরিদর্শক কেবল সেই ঘরগুলিতেই প্রবেশ করতে পারে, যেগুলি উপরন্তু নাসোর জন্যও ব্যবহার করা হয় না, এবং সর্বশেষে খড়-পাকানন, লেস ও দস্তানা বানানোর জন্য পরিবারের লোকদের অবাধ স্বাধীনতা। ১৮৭৭ সলের ২৩শে মার্চ তারিখে সুইস যুক্তরাষ্ট্রীয় কারখানা আইনটি সমেত এই আইনটি, এর সমস্ত দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও, এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঢের ভাল আইন। উক্ত সুইস যুক্তরাষ্ট্রীয় আইনটির সঙ্গে এর একটি তুলনা বিশেষ কৌতূহল-উদ্দীপক, কারণ তাতে পরিষ্কার প্রকাশ পায় দুটি আইনগত পদ্ধতির গুণাগুণ –ইংল্যাণ্ডের ঐতিহাসিক” পদ্ধতি, অবস্থা-বিশেষে যার প্রয়োগ ঘটে, এবং ইউরোপ-ভূখণ্ডের পদ্ধতি, যার প্রতিষ্ঠা ফরাসী বিপ্লবের ঐতিহ্যের উপরে এবং যা তাকে করে আরো ব্যাপক। দুর্ভাগ্যক্রমে, উপযুক্ত সংখ্যক পরিদর্শন কর্মীর অভাবে, ইংল্যাণ্ডের বিধিটি কর্মশালায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখন একটি কাগুজে দলিল মাত্র।
.
দশম পরিচ্ছেদ — আধুনিক শিল্প এবং কৃষিকার্য
কৃষিকর্মে এবং কৃষি-উৎপাদনকারীদের সামাজিক সম্পর্কসমূহে আধুনিক শিল্প যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা নিয়ে পরে অনুসন্ধান করা হবে। এখানে আমরা কেবল পূর্বানুগমন হিসাবে কয়েকটি ফলাফল সম্পর্কে আভাস দেব। যদিও কারখানা-কর্মীদের উপরে মেশিনের ব্যবহার যে হানিকর শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটায়, তার তুলনায় কৃষিতে মেশিনের ব্যবহার বহুলাংশে মুক্ত, তা হলেও কৃষি-শ্রমিকদের উৎখাত করে তাদের সেই স্থান দখলে তার তৎপরতা টের বেশি তীব্র অথচ তা পায় চের কম প্রতিবোধ, যা আমর। পরে সবিস্তারে আলোচনা করব। যেমন, কেজি ও সাফোক কাউন্টি-দুটিতে গত ২০ বছরে (১৮৬৮ সাল পর্যন্ত) কর্ষিত ভূমির এলাকা দারুণ ভাবে বেড়ে গিয়েছে, অথচ সেই একই সময়ে গ্রামীণ জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে-কেবল আপেক্ষিক ভাবেই নয়, অনাপপক্ষিক ভাবেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পর্যন্ত কেবল দৃশ্যতই কৃষি-মেশিন শ্রমিকের স্থান গ্রহণ করে; অই ভাবে বলা যায়, এই মেশিন জোত-মালিককে সক্ষম করে একটি বৃহৎ এনাকে কষণ করতে, কিন্তু কার্যত নিযুক্ত শ্রমিকদের নির্বাসিত করে ন’। ১৮৬১ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে কৃষি-মেশিন ম্যানুফ্যাকচারের কাজে নযুক্ত ছল ১,৩-৪ জন শ্রমিক, যখন কৃষি-মেশিন ও বাম্প-ইঞ্জিন ব্যবহারে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ১,২০৫ জনের বেশি ছিল না।
অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক শিল্পের ফল অধিকতর বৈপ্লবক, কেননা তা চাষীকে অর্থাৎ পুরোনো সমাজের দুর্গপ্রাচীর ধ্বংস করে দেয় এবং তার জায়গায় স্থাপন করে ম:ি-শ্রমককে! এইভাবে তা সামাজিক পরিবনের জন্য আগ্রহকে গ্রামে ও শহরে একই মাত্রায় নিয়ে আসে। কৃষির অবৈজ্ঞানিক ও প্রাচীন পন্থী পদ্ধতিগুলির পরিবর্তে তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে। কৃষি ও শিল্পের ম্যানুফ্যাকচারের মধ্যে শৈশবে যে-বন্ধন ছিল, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন তাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এক উচ্চতর সমন্বয়ের জন্য তা বাস্তব অবস্থাবলী তৈরি করে দেয় অর্থাৎ তাদের সাময়িক বিচ্ছেদের কালে তারা উভয়েই যে উৎকর্ষিত রূপ অর্জন করেছে সেই নবতর রূপের ভিত্তিতে উচ্চতর সমন্বয়। বিরাট বিরাট কেন্দ্রে জনসংখ্যাকে সমবেত করে এবং শহরবাসী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন একদিকে সমাজের ঐতিহাসিক সঞ্চলক শক্তিকে (মোটিভ পাওয়ার’-কে) কেন্দ্রীভূত করে; অন্য দিকে, তা মানুষ ও মৃত্তিকার মধ্যে বস্তুর সঞ্চলনকে ব্যাহত করে অর্থাৎ মৃত্তিকার যেসব উপাদান মানুষ খাদ্য ও পরিধেয় হিসাবে পরিভোগ করে সেগুলিকে আর মৃত্তিকায় ফিরে আসতে দেয় না। সুতরাং তা মাটির চিরন্তন উর্বরতার আবশ্যিক শর্তগুলিকে লন করেএই একই কাজের দ্বারা, আধুনিক শিল্প একই সঙ্গে শহরের শ্রমিকের স্বাস্থ্য এবং গ্রামের শ্রমিকের বুদ্ধিজীবী। জীবনকে ধ্বংস করে।[১] কিন্তু সেই বস্তু-সঞ্চলনের জন্য প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা শর্তাবলীকে বিপর্যস্ত করে দেবার সঙ্গে সঙ্গে, তা আবার ঔদ্ধত্যভরে একটি প্রণালী হিসাবে তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায় সামাজিক উৎপাদনের একটি নিয়ামক বিধান হিসাবে এব” মানবজাতির পরিপূর্ণ বিকাশের পক্ষে উপযোগী এক রূপ হিসাবে। যেমন ম্যানুফ্যাকচা, তেমন কৃষিকর্মে, মূলধনের প্রাধানের অধীনে উৎপাদনের কপাষণের একই সঙ্গে অর্থ দাঁড়ায় উৎপাদনকারীর শহিদ-শোভন মৃত্যু; শ্রমের উপকরণ পরিণত হয় শ্রমিককে গোলাম করার, শোষণ করে এবং সর্বস্বান্ত করার হাতিয়ারে; শ্রম-প্রক্রিয়াসমূহের সামাজিক স’যোজন ও সংগঠন পরিণত হয় শ্রমিকের ব্যক্তিগত প্রাণশক্তি, স্বাধিকার ও স্বাধীনতাকে সবলে নিঃশেষিত করার একটি সংগঠিত ব্যবস্থায় ! বিরাট বিরাট এলাকায় বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবার দরুন গ্রামীণ শ্রমিকদের প্রতিবোধ ভেঙ্গে যায়, অন্য দিকে শহরের শ্রমিকদের কেন্দ্রীভবন বৃদ্ধি পায়। যেমন শহরের শিল্পগুলতে, তেমন আধুনিক কৃষিকর্মে শ্রমের যে বর্ধিত উৎপাদন শক্তি ও পরিমাণকে গতিমুক্ত করে দেওয়া হয়, তা ক্রয় করা হয় স্বয়ং শ্রমশক্তিকেই অনুর্বর ফেলে রাখা ও রোগে-ভোগে জীর্ণ করার বিনিময়ে। অধিকন্তু, ধনতান্ত্রিক কৃষিকর্মে সমস্ত অগ্রগতির মানেই হল কেবল শ্রমিককেই নয়, সেই সঙ্গে মৃত্তিকাকেও লুণ্ঠন করার কলা কৌশলের অগ্রগতি; একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধিতে অগ্রগতির মানেই হল সেই উর্বতার চিরস্থায়ী উৎস সমূহের বিনাশ-সাধনের অগ্রগতি। মার্কিন যুক্তাষ্ট্রের মত যতই একটা দেশ আধুনিক শিল্পের বনিয়াদের উপরে বেশি বেশি করে তার বিকাশ-কাণ্ড শুরু করে, ততই তার সর্বনাশের প্রক্রিয়া আরো আরো দ্রুতগতি হয়।[২] অতএব, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন যে প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটায় এবং বিবিধ প্রক্রিয়ার সংযোজনের মাধ্যমে একটি সামাজিক সমগ্রতা গড়ে তোলে, তা কেবল সম্পদের মূল উৎস দুটিকে নিঃশেষিত করার মাধ্যমেই সম্পাদন করে। সেই উৎস দুটি হল-মৃত্তিকা ও শ্রমিক।
