(৭) চিরায়ত অর্থনীতির অন্যতম প্ৰধান ব্যর্থতা এই যে, যে-রূপের মাধ্যমে মূল্য বিনিময়-মূল্য হয়ে ওঠে, তঁরা পণ্য এবং বিশেষ করে পণ্য-মূল্য বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে কখনই সেই রূপটিকে আবিষ্কার করতে পারেননি। এমনকি, এই সম্প্রদায়ের শ্ৰেষ্ঠ প্ৰতিনিধি অ্যাডাম স্মিথ এবং রিকার্ডে মূল্যের রূপের উপরে কোন তাৎপর্য আরোপ করেননি, যেন পণ্যের অভ্যন্তরীণ প্ৰকৃতির সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। এর কারণ শুধু এই নয় যে মূল্যের পরিমাণ বিশ্লেষণের প্রতিই তাদের সমগ্ৰ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। এর কারণ আরও গভীর। শ্ৰমজাত দ্রব্যের মূল্যরূপটি কেবলমাত্র তার নিষ্কর্ষিত রূপই নয়, তার সর্বাপেক্ষা সর্বজনীন রূপও বটে, মূল্যরূপ সেই উৎপাদনকে সামাজিক উৎপাদনের একটি বিশিষ্ট শ্রেণীতে পরিণত করে তার ফলে সেই বুর্জোয়া উৎপাদন একটি বিশেষ ঐতিহাসিক চরিত্র লাভ করে। সুতরাং, আমরা যদি এই ধরনের উৎপাদনকে প্ৰকৃতি-কর্তৃক নির্ধারিত সমাজের সর্বস্তরের চিরন্তন সত্য বলে গণ্য করি, তাহলে স্বভাবতই আমরা মূল্যরূপের, ফলতঃ পণ্যরূপের, এবং তার পরবর্তী পরিণত রূপ অর্থ এবং মূলধন প্রভৃতির চরিত্রের যা কিছু বিশেষত্ব তা উপেক্ষা করতে বাধ্য। কাজেই আমরা দেখতে পাই, যেসমস্ত অর্থনীতিবিদ পুরোপুরি মানেন যে শ্ৰম-সময়ের দ্বারাই মূল্যের পরিমাণ নির্ধারিত হয়, তারাও পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্ৰী যে অর্থ, তার সম্বন্ধে অদ্ভুত এবং পরস্পর-বিরোধী ধারণা পোষণ করেন। এটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে ব্যাংকিং সম্বন্ধে তাদের আলোচনায়, এক্ষেত্রে অর্থ সম্বন্ধে হাতুড়ে সংজ্ঞা একেবারেই অচল। তার ফলে (গ্যানিল প্ৰভৃতির) বাণিজ্যবাদী মতবাদ আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, এই মতবাদ অনুসারে মূল্য কেবল একটি সামাজিক রূপ অথবা তার অশরীরী ছায়ামূর্তি। আমি শেষবারের মত একথা বলে রাখতে চাই যে, চিরায়ত অর্থনীতি বলতে আমি সেই অর্থনীতিই বুঝি যা উইলিয়ম পেটির আমল থেকে বুর্জোয়া সমাজের প্রকৃত উৎপাদন-সম্পর্ক বিচার করেছে, কিন্তু হাতুড়ে অর্থনীতি দেখেছে কেবল যা উপর উপর দেখা যায়, বৈজ্ঞানিক অর্থনীতি বহু পূর্বে যে সমস্ত তথ্য আবিষ্কার করেছে কেবল তারই চব্বিত চর্বণ করে এবং বুর্জোয়াদের দৈনন্দিন তারই ভিতর খোজে অপরিচিত ঘটনাবলী সম্পর্কে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা; কিন্তু তাছাড়া তার একমাত্র কাজ হল, বুর্জোয়াদের কাছে যে জগৎটি সর্বপ্রকার সম্ভাব্য জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সেই বুর্জোয়া জগৎ সম্বন্ধে বুর্জোয়াদের নিজেদের যা ধারণা তাই পণ্ডিতী চালে প্ৰণালীবদ্ধভাবে সাজানো এবং তাকেই চিরন্তন সত্য বলে জাহির করা।
(৮) Les economistes ont une singuliere maniere de proceder Il n’y a pour eux que deux SOrtes dinstitutions, celles de l’art et celles de la nature. Les institutions de la feodalite sont des institutions artificielles, celles de la bourgeoisie sont des institutions naturelles. Ils ressemblent en ceci aux theologiens, qui exu aussi etablissent deux sortes de religions. Toute religion qui n’est pas la leur, est une invention des hommès, tandis que leur propre religion est une emanation de Dieu-Ainsi il y a eu de l’histoire mais il n’y en a plus.” (Karl Marx. Misere de la philosophie, Repones a la philosophie de la Misere par M. proudhon, 1847. P. 113). এম. বাস্তিয়ত কিন্তু বস্তুতঃই কৌতুকজনক। তার ধারণা, প্ৰাচীনকালের গ্রীকরা আর রোমানরা কেবল লুণ্ঠনবৃত্তি করেই জীবিকা চালাত। কিন্তু মানুষ যখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেবল লুণ্ঠনই চালায় তখন দখল করার মতো কিছু তো হাতের কাছে থাকতেই হবে; লুণ্ঠনের সামগ্ৰীগুলিকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদিত হতেই হবে; অতএব গ্রীক এবং রোমানদের মধ্যেও একটা উৎপাদন-ব্যবস্থা অর্থাৎ একটা অর্থনীতি নিশ্চয়ই ছিল। তাদের জগতের সেটাই ছিল বৈষয়িক ভিত্তি যেমন আমাদের আধুনিক জগতের বৈষয়িক ভিত্তি হচ্ছে বুর্জোয়। অর্থনীতি। অথবা বাস্তিয়াত হয়তো এটাও বলে থাকতে পারেন যে, গোলামির উপরে প্রতিষ্ঠিত যে উৎপাদন-পদ্ধতি ত। লুণ্ঠনেরই নামান্তর। সেক্ষেত্রে তিনি কিন্তু বিপজ্জনক জায়গায় পা বাড়াচ্ছেন। গোলাম-শ্রমের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে যদি অ্যারিস্তুতলের মতো। একজন বিরাট চিন্তাবিদের ভুল হতে পারে, তা হলে মজুপ্রিশ্রমের তাৎপর্য উপলব্ধি ব্যাপারে বাস্তিয়াতের মতো একজন বামন চিন্তাকারের ভুল হবে না কেন?’-এই সুযোগে আমি আমেরিকার একটি জার্মান পত্রিকা আমার বই “জর ক্রিটিক ডেব পলিটিক্যাল ইকোনমি’র বিরুদ্ধে যে আপত্তি তুলেছে, সংক্ষেপে তার উত্তর দিচ্ছি। ঐ পত্রিকার মতে, আমার এই বক্তব্য যে, প্ৰত্যেকটি বিশেষ বিশেষ উৎপাদন-পদ্ধতি এবং তার আনুষঙ্গিক উৎপাদন-সম্পর্কই, এক কথায় সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই, হল সেই আসল ভিত্তি যার উপরে আইনগত ও রাজনৈতিক উপরি কাঠামো গড়ে ওঠে এবং যার সঙ্গে তদনুযায়ী বিশেষ বিশেষ সামাজিক চিন্তা-প্ৰণালীর উদ্ভব ঘটে, উৎপাদনপদ্ধতিই সাধারণ ভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন নির্ধারণ করেএই সবই আমাদের কালের পক্ষে, যে-কালে বৈষয়িক স্বার্থের প্রাধান্য, সেই কালের পক্ষে সঠিক, কিন্তু মধ্যযুগে, যে-যুগে ক্যাথলিক ধর্মের ছিল একাধিপত্য কিংবা এথেন্স ও রোমের পক্ষে, যেখানে রাজনীতি ছিল সর্বেসর্বা, সেখানে সঠিক নয়। প্রথমতঃ কারো পক্ষে এটা ভাবা অদ্ভুত যে মধ্যযুগ ও প্রাচীন যুগ সম্পর্কে ঐ বস্তাপচা বুলিগুলি অন্যান্যের কাছে অপরিজ্ঞাত। অন্ততঃ এটা পরিষ্কার যে মধ্যযুগ বা প্ৰাচীন যুগ। ক্যাথলিক ধর্ম বা রাজনীতি খেয়ে বেঁচে থাকেনি। বরং, তারা কিভাবে তাদের জীবিকা অর্জন করত, তা থেকেই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কেন একজায়গায় ক্যাথলিক ধর্ম, অন্যত্র রাজনীতি প্ৰধান ভূমিকা গ্ৰহণ করেছিল। বাকিটার জন্য, রোমের ইতিহাসের সঙ্গে সামান্য পরিচয়ই যথেষ্ট; সেটুকু থাকলেই জানা যাবে, দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, তার গোপন ইতিবৃত্ত হল ভূমিগত সম্পত্তির ইতিবৃত্ত। অন্য দিকে অনেক দিন আগের ডন কুইক্সোটকে তার এই ভ্ৰান্ত কল্পনার জন্য দণ্ডভোগ করতে হয়েছিল যে, ‘নাইট’-সুলভ, অভিযান বুঝি সমাজের সমস্ত রকমের অর্থনৈতিক রূপের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
