যতদিন কারখানা-আইন সীমাবদ্ধ থাকে ফ্যাক্টরি, ফ্যাক্টরি ইত্যাদিতে কাজের ঘন্ট! নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে, ততদিন তাকে গণ্য করা হয় মূলধনের শোষণ করার অধিকারের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ বলে। কিন্তু যখন ত! বিস্তার লাভ ক?-তথাকথিত “ঘরোয়া শ্রম”[১৭] নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, তখনি তা পরিগণিত হয় “patria potestas, মাতা-পিতার কর্তৃত্বের উপরে প্রত্যক্ষ আক্রমণ বলে, কোমল-হৃদয় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দীর্ঘকাল এই পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত ছিল। অবশ্য, ঘটনার চাপে সে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হল স্বীকার করতে যে আধুনিক শিল্প চিরাচরিত পারিবারিক শ্রম যার উপরে প্রতিষ্ঠিত সেই অর্থনৈতিক বনিয়াদকে চুরমার করে দিচ্ছে এবং তার সঙ্গে জড়িত পারিবারিক শ্রমও ইতিপূর্বেই সমস্ত চিরাচরিত পারিবারিক বন্ধনকে শিথিল করে দিয়েছে। শিশুদের অধিকারসমূহ ঘোষণা করতে হয়েছিল। ১৮৩৬ সালে শিশু-নিয়োগ কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টে বলা হয়, সমগ্র সাক্ষ্যের ভিতর দিয়ে এটা দুঃখজনক ও যন্ত্রণাদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে হয়ে ওঠে যে, তাদের মাতা-পিতার হাত থেকে ছেলে-মেয়ে-নির্বিশেষে সমস্ত শিশুর যতটা সুরক্ষা দরকার আর কোনো তিন হাত থেকে ততটা নয়।” সাধারণভাবে শিশুশ্রমের এবং বিশেষভাবে তথাকথিত ঘরোয়া শ্রমের সমাহীন শোষণের এই যে ব্যবস্থা তা চালু থাকতে পারে একমাত্র এই কারণে যে, মাতা-পিতার। এদের কচিকাচা সন্তানদের উপরে তাদের স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষতিকারক কর্তৃত্বকে কোনো নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রয়োগ করতে সক্ষম। … তাদের শিশুদের কেবল “এতটা পরিমাণ সাপ্তাহিক মজুরি অর্জনের মেশিন” হিসাবে ব্যবহার করার কর্তৃত্ব নাতা-পিতাদের হাতে অবশ্যই থাকা উচিত নয়।
. সুতরাং এইরকম সকল পরিস্থিতিতে আইনসভার কাছে স্বাভাবিক অধিকার। হিসেবেই যৌক্তিকভাবে দাবি করতে পারে যে, যা তাদের অপরিণত বয়সেই শারীরিক শক্তিকে ধ্বংস করে এবং বুদ্ধিমান ও নীতিবান জীবের মাদণ্ডে নিচের স্তরে নামিয়ে দেয়, তার কবল থেকে তাদের পরিত্রাণের একটা ব্যবস্থা করা উচিত।”[১৮] অবশ্য, মাতা-পিতার কর্তৃত্বই যে শিশু-শ্রমের ধনতান্ত্রিক শোষণের প্রত্যক্ষই বা পরোক্ষই হোক—সৃষ্টি করেছে, তা নয়; বরং বিপরীত,–ধনতান্ত্রিক শোষণই মাতা পিতার কর্তৃত্বের ভিত্তিটিকে ভাসিয়ে দিয়ে তাকে অধঃপাত করল ক্ষমতার দুষ্ট অপব্যবহারে। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরনো পারিবারিক বন্ধনসমূহের ভাঙন যতই ভয়ংকর হোক না কেন, তবু আধুনিক শিল্প পারিবারিক পরিধির বাইরে নারী, তরুণ-তরুণী ও ছেলে-মেয়ে-নির্বিশেষে শিশুদেরকে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দান করায় পরিবার ও শারী-পুরুষের সম্পর্কের এক উচ্চতর রপের ভিত্তি সৃষ্টি করেছে। অবশ্য, পরিবারের টিউটনি খ্ৰীষ্টান রূপটিকেই পরম রূপ বলে ধরে নেওয়া হবে এক আজগুবি ব্যাপার, যেন আজগুবি ব্যাপার হত যদি প্রাচীন রোমে, প্রাচীন গ্রীক বা প্রাচ্য-দেশীয় পরিবারের উপরে ঐ অভিধানটি প্রয়োগ করা; আসলে একসঙ্গে করে দেখলে এই রূপগুলি হচ্ছে ঐতিহাসিক বিবর্তনের একটি পর্যায়ক্রম। অধিকন্তু, এটা স্পষ্ট যে যৌথ কী-গোষ্ঠী নারী ও পুরুষ এবং সব বয়সের মানুষদের নিয়ে গঠিত হওয়ায় তা অবশ্যই হয়ে উঠবে মানবিক বিকাশের একটি উৎসম্বরূপ, যদিও তার স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে গড়ে ওঠা, পাশবিক, ধনতান্ত্রিক রূপটি যেখানে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার জন্যই শ্রমিকের অস্তিত্ব, শ্রমিকের জন্য উৎপাদন-প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব নয়-সেখানে ঐ ঘটনাটি হল দুর্নীতি ও দাসত্বের জীবাণু-সংক্রামক উৎসবিশেষ।[১৯]
কারখানা আইনগুলির সার্বিকীকরণের আবশ্যকতা, কেবল মেশিনে সুতো কাটা ও কাপড় বোনর ক্ষেত্রে—মেশিনারির প্রথমতম দুটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ব্যতিক্রমস্বরূপ আইন থেকে সামগ্রিক ভাবে সামাজিক উৎপাদন সংক্রান্ত আইনে রূপান্তরিত করার আবশ্যকতা দেখা দিল আধুনিক শিল্প যে-পদ্ধতিতে ঐতিহাসিক ভাবে বিকশিত হয়েছিল, সেই পদ্ধতিটি থেকে, এটা আমরা আগেই দেখেছি। সেই শিল্পের পিছু পিছু ম্যানুফ্যাকচার, হস্ত শিল্প ও গৃহ-শিল্পের চিরাচরিত রূপটিও বিপ্লবায়িত হয়ে যায়; ম্যানুফ্যাকচার নিরন্তর পরিণতি লাভ করে ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থায় এবং হস্তশিল্প ম্যানুফ্যাকচারে; এবং সর্বশেষে হস্ত ও গৃহ-শিল্পের পরিধি, তুলনামূলক বিচারে আশ্চর্যজনক স্বল্প সময়ে, পরিণত হয় যন্ত্রণার নরককুণ্ডে, যেখানে ধনতান্ত্রিক শোষণ পায় তার জঘন্যতম অত্যাচারের অবারিত অবকাশ। দুটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় : প্রধমত, এই পৌনঃপুনিক অভিজ্ঞতা যে, মূলধন যখনি এক ক্ষেত্রে আইনের অধীনে পড়ে যায়, খনি সে অন্যান্য ক্ষেত্রে আরো বেপরোয়া হয়ে সেটা পুষিয়ে নেয়;[২০] দ্বিতীয়ত, ধনিকদের এই সোচ্চার দাবি যে, প্রতিযোগিতার অবস্থা গুলিতে সমতা-বিধান করা হোক অর্থাৎ শ্রমের সকল রকম শোষণের উপরে সমান নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হোক।[২১] এই প্রসঙ্গে, আসুন আমরা দুটি হৃদয়বিদারক চিৎকারে কর্ণপাত করি। ব্রিস্টলের পেরেক ও শিকল প্রস্তুতকারক মেসার্স কুকক্সি স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই তাদের কারখানায় কারখানা-াইনের নিয়ম-কানুনগুলি প্রবর্তন করল। “যেহেতু পুরনো অনিয়মিত ব্যবস্থাটা নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠানগুলিতে চালু আছে, যেহেতু মেসার্স কুকল্পি এক অসুবিধায় পড়ল, তারা দেখতে পেল যে তাদের ছেলেদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে অন্যত্র সন্ধ্যা ৬টার পরেও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। তারা স্বভাবতই বলল, “এটা আমাদের প্রতি একটি অন্যায় এবং আমাদের পক্ষে একটা লোকসান, যেহেতু এর ফলে ছেলেদের শক্তি-সামর্থ্যের একটা অংশ ফুরিয়ে যায়, যে-অংশটির সুযোগ আমরা নিতে পারতাম।[২২] লণ্ডনের কাগজ বাক্স ও থলি প্রস্তুতকারক মিঃ জে সিম্পসন শিশু নিয়োগ কমিশনাদের সামনে বক্তব্যে বলেন যে, “এ জন্য (আইন-সভার হস্তক্ষেপের জন্য) তিনি যে-কোনো দরখাস্তে সই দিতে প্রস্তুত।” “বাস্তবিক পক্ষে, রাতের বেলায় তিনি সব সময়েই খুব অস্বস্তিতে কাটনি, পাছে তিনি যখন তার কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন, তখন অন্যরা তাদের কাজ চালু রাখেন এবং পার পেয়ে যান।”[২৩] সংক্ষিপ্ত করে শিশু নিয়োগ কমিশন বলে, বড় বড় নিয়োগকদের প্রতি এটা হবে একটা অবিচার যদি তাদের কারখানাগুলিকে কাজ করতে দেওয়া হয় ঘণ্টার পরে ঘণ্ট। বিনা-নিয়ন্ত্রণে। এবং কাজের ঘণ্টার ক্ষেত্রে ছোট ছোট কারখানাগুলির উপরে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করায় প্রতিযোগিতার এই যে অসম অবস্থা তার দরুন যে-অৰচান ঘটে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়। বড় বড় মালিকদের পক্ষে আরো একটি অসুবিধা-তারা দেখতে পায় যে তাদের। নাবালক ও নারী শ্রমকে টেনে নেওয়া হচ্ছে সেই সব প্রতিষ্টানে, যেগুলি আইনগত নিয়ন্ত্রণ থেকে মু! অধিকন্তু, এর ফলে ছোট ছোট প্রতিরুন স্থাপনের দিকে প্রেরণা সৃষ্টি হয়, যেগুলি জনগণের স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য, শিক্ষা ও সাধারণ উন্নয়নের পক্ষে। অবশ্যভাবীরূপেই সবচেয়ে কম অনুকূল।”[২৪]
