আধুনিক শিল্প কখনো কোনো প্রক্রিয়ার উপস্থিত রূপটিকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ। করে না, বা সেভাবে তাকে ব্যবহারও করে না। সুতরাং, যেখানে উৎপাদনের পূর্ববর্তী সব কটি রূপই ছিল মূলতঃ স’রক্ষণশীল, সেখানে আধুনিক শিল্পের কৃৎ-কৌশলগত ভিত্তি হচ্ছে বৈপ্লবিক।[১৩] মেশিনারি, বিবিধ রাসায়নিক প্রক্রিয়া ও অন্যান্য পদ্ধতিসমূহের সাহায্যে, তা নিরন্তর পরিবর্তন সংঘটিত করছে—কেবল উৎপাদনের কৃৎকৌশলগত ভিত্তিতেই নয়, সেই সঙ্গে শ্রমিকের কার্যাবলীতে এবং শ্রম প্রক্রিয়ার সামাজিক সংযোজনসমূহেও। একই সময়ে, তা এইভাবে সমাজের অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগকেও বিপ্লবায়িত করে এবং উৎপাদনের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় মূলধন ও শ্রমিক-জনসমষ্টির অবিরাম স্থানান্তর ঘটায়। কিন্তু একদিকে যখন আধুনিক শিল্প তার নিজস্ব প্রকৃতিবশতই শ্রমের পরিবর্তন, কাজের সাবলীলতা, শ্রমিকের বিশ্বব্যাপী সচলতা দাবি করে, অন্যদিকে তা তখন তার ধনতান্ত্রিক রূপটিতে পুরনো শ্রম-বিভাজনকে তার শিলীভূত বিশেষত্বসমূহসহ পুনরুৎপাদন করে। আমরা দেখেছি কিভাবে আধুনিক শিল্পের কৃৎকৌশলগত প্রয়োজনসমূহ এবং ধনতান্ত্রিক রূপটির মধ্যে নিহিত সামাজিক চরিত্রের মধ্যেকার চুড়ান্ত দ্বন্দ্ব শ্রমিকের অবস্থিতিতে যাবতীয় নির্দিষ্টতা ও নিরাপত্তার অবলুপ্তি ঘটায়; কিভাবে তা সমস্ত শ্রম-উপকরণকে অধিগত করে তার হাত থেকে তার প্রাণ-ধারণের উপায়গুলিকে ছিনিয়ে নেয়[১৪] এবং তার প্রত্যংশ কাজকে দাবিয়ে দিয়ে তাকে অবান্তর করে তোলে। আমরা আরো দেখছি, এই দ্বন্দ্ব কিভাবে তার রেষিকে অভিব্যক্ত করে সেই কিভূত কাণ্ডের সৃষ্টিকর্যে, যাকে বলা হয় “মজদ বাহিনী এবং রাখা হয় দুঃখ দুর্দশার মধ্যে, যাতে করে তা সব সময়েই থাকে মূলধনের হাতের তলায়; অভিব্যক্ত করে শ্রমিক-শ্রেণীর মধ্য থেকে
অবিশ্রাম নর-বলির মধ্যে, শ্রমশক্তির সবচেয়ে বেপরোয়া অপচয়ের মধ্যে এবং সামাজিক নৈরাজ্য-ঘটিত ধ্বংসকাণ্ডের মধ্যে-যে-বিপর্যয় প্রত্যেকটি অর্থ নৈতিক অগ্রগতিকে পর্যবসিত করে একটি জাতীয় বিপত্তিতে। এটা হচ্ছে নেতিবাচক দিক। কিন্তু, একদিকে যখন কাজের পরিবর্তন বর্তমানে নিজেকে চাপিয়ে দেয় একটি প্রবল পরাক্রান্ত প্রাকৃতিক নিয়ম হিসাবে এবং চাপিয়ে দেয় এমন একটি প্রাকৃতিক নিয়মের অন্ধ বিপৎসী সক্রিয়তাসহ,[১৫] যাকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় সমস্ত বিন্দুতে, তা হলে আধুনিক শিল্প চাপিয়ে দেয়, তার বিপর্যয়গুলির মাধ্যমে, কাজের পরিবর্তন সাধন, অতএব বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিকের যোগ্যতা বিধান, অতএব তার বিভিন্ন প্রবণতার সর্বাধিক সম্ভব বিকাশ-সাধন ইত্যাদিতে উৎপাদনের একটি মৌল নিয়ম হিসাবে উপলব্ধি করার আবশ্যকতা। এই নিয়মটির স্বাভাবিক সক্রিয়তার সঙ্গে উৎপাদনের পদ্ধতিটিকে অভিযোজিত করার প্রয়োজনটি তখন সমাজের পক্ষে হয়ে ওঠে একটি জীবন-মরণ প্রশ্ন। বাস্তবিক পক্ষে, অন্যথা করলে মৃত্যুদণ্ড, এই শর্তে আধুনিক শিল্প সমাজকে বাধ্য করে, আজীবন অভিন্ন একটি তুচ্ছ কাজের পুনরাবৃত্তির দ্বারা পঙ্গুকৃত এবং এইভাবে একটি মানুষের ভগ্নাংশমাতে পর্যবসিত, আজকের প্রত্যংশ শ্রমিকের পরিবর্তে একজন পূর্ণ-বিকশিত ব্যক্তিকে প্রতিস্থাপিত করতে-এমন এক ব্যক্তি যে বিভিন্ন ধরনের শ্রমের পক্ষে উপযুক্ত উৎপাদনের যে-কোনো পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত এবং যার কাছে যে-সমস্ত সামাজিক কার্য সে সম্পাদন করে, সেই কাজগুলি তার নিজের প্রকৃতিগত ও উপার্জিত শক্তিসমূহকে অবাধ সুযোগ দানের কতকগুলি পদ্ধতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই বিপ্লব ঘটানোর দিকে একটি পদক্ষেপ যা ইতিমধ্যেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেওয়া হয়েছে, তা হল কারিগরি ও কৃষি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং “ecoles d’eneigne ment professionnel”-এর প্রতিষ্ঠা, যে প্রতিষ্ঠানগুলিতে শ্রমজীবী মানুষদের শিশু সন্তানের প্রযুক্তি-বিদ্যায় এবং শ্রমের বিভিন্ন হাতিয়ার হাতে-কলমে ব্যবহারে কিঞ্চিৎ শিক্ষা লাভ করে। যদিও কারখানা-আইনের আকারে মূলধনের হাত থেকে সর্বপ্রথম ও সামান্য-পরিমাণ যে সুবিধা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা কানায় কাজের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষাকে সংযোজিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তবু এ ব্যপারে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যখন শ্ৰমিক-শ্রেণী ক্ষমতায় আসে, যা তার! তনবার্গ ভবেই আসবে, তখন তত্বগত ও কার্যগত উভয় ধরনের কারিগরি শিক্ষাই শ্রমিক শ্রেণীর বিদ্যালয় গুলিতে যথাচিত স্থান পাবে। এ ব্যাপারেও সন্দেহে অবকাশ নেই যে, এই ধরনের বৈপ্লবিক আলোড়ন, যার চূড়ান্ত পরিণাম হল পুরনে’ শ্রম-বিভাগের অবসান, তা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-রূপ এবং সেই রূপ অনুযায়ী শ্রমিকের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, তার সম্পূর্ণ বিরোধী। কিন্তু কোন একটি নির্দিষ্ট কপের মধ্যে হত দ্বন্দগুশির ঐতিহাসিক বিকাশই হল একমাত্র পথ, যে পথে উৎপাদনে সেই পটিকে ভেঙে দেওয়া যায় এবং তার জায়গায় নোতুন একটি রূপ প্রতিষ্ঠা কর” যায়। “Ne sutor ultra crepidan” – হশিল্প সম্পর্কে জ্ঞানের এই “nec plus ultra” সেই মুহূর্ত থেকেই হয়ে পড়ল অথহীন, যে-মুহত থেকে ঘড়ি নির্মাণকারী ওয়েট উদ্ভাবন করলেন ‘ষ্টিম-ইঞ্জিন’, ক্ষৌরকার অর্কিরাইট করলেন ‘থশ এ কমরত জহুরী ফুলটন করলেন ‘স্টিমশিপ।[১৬]
