আমরা দেখেছি, আধুনিক শিল্প প্রযুক্তিগত উপায়ের মাধ্যমে ম্যানুফ্যাকচার ব্যবস্থার শ্রম-বিভাগকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যার অধীনে প্রত্যেকটি মানুষ একটিমাত্র প্রত্যশ কাজে আজীবন হাত-পা বাঁধ; অবস্থায় আটক থাকত। একই সময়ে আবার, অাধুনিক শিল্পের ধনতাধিক রূপটি সে একই শ্রম-বিভাগের পুনরাবির্ভাব ঘটায় আরো দানবীয় আকারে-কারখানার ভিতরে, শ্রমিককে মেশিনের একটি জীবন্ত উপাঙ্গে পর্যবসিত করে এবং কারখানার বাইরে সর্বত্র অংশত মেশিনারি ও মেশিন কর্মীদেরকেই[৮] বিক্ষিপ্ত ভাবে ব্যবহার করে এবং অংশত নারী ও শিশুদের শ্রম এবং সস্তা অদক্ষ শ্রমের ব্যাপক পতনের মাধ্যমে শ্রম বিভাগকে নোতুনতর ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থার শ্রম-বিভাগ এবং আধুনিক শিল্পের পদ্ধতিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সজোরে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যান্য ভাবে ছাড়াও এই দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করে এই ভয়াবহ ঘটনায় যে আধুনিক শিল্পে ও আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারে শিশুদের একটি বৃহৎ অংশই তাদের অতি কচি নল থেকে আটকে থাকে সবচেয়ে সরল কয়েকটা ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় এবং শোষিত হয় ছরের পর বছর অথচ তাদের শেখানো হয়না এমন একটি কাজও যার দৌলতে সে পরবর্তী জীবনে ফ্যাক্টরিতে বা ম্যানুফ্যাক্টরিতে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। নমুন। হিসাবে উল্লেখ করা যায়, ইল্যাণ্ডের ছাপাখানায় আগে পুরনো ম্যানুফ্যাকচ ও হস্তশিল্পের অনুরূপ একটা ব্যবস্থা ছিল, যাতে শিক্ষানবিশদের উন্নীত করা সহজ কাজ থেকে কঠিন এবং আরো কঠিন কাজে। তারা একটা ক্ষিধ্যে দিয়ে যেত, যত দিন তার উপযুক্ত মুকিয় হয়ে না উঠছে। পড়তে এবং লিখতে সক্ষম হওয়া ছিল তাদের কাজের আবশ্যক শর্ত। এই সব কিছুই বদলে গেল মুদ্রণ-যন্ত্র প্রবর্তনের ফলে। এই যন্ত্র নিযুক্ত করে ধরনের শ্রমিক-এক পনের ‘বয়স্ক’, টণ্টার’, অন্য ধরনের বালক, ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী, যাদের একমাত্র কাজ হল মেশিনের নীচে কাগজের ‘শিট বিছিয়ে দেওয়া কিংবা সেখান থেকে মুদ্রিত ‘শিট সরিয়ে নেওয়া। এই ক্লান্তিকর কাজ তাদের করতে হয়, বিশেষ করে লণ্ডনে, সপ্তাহে কয়েক দিন একটানা ১৪, ১৫ এমনকি ১৬ ঘণ্টা, অনেক সময়ে ৩৬ ঘণ্টা, যার মধ্যে তারা খাওয়া ও ঘুমের জন্য বিশ্রামের সময় পায় মাত্র ২ ঘণ্টা।[৯] তাদের অধিকাংশই পড়তে পারে না এবং, সাধারণ ভাবে, চরম বর্বর এবং অত্যন্ত অস্বাভাবিক জীব। “যে-কাজ তাদের করতে হয়, তার উপযুক্ততা অর্জনের জন্য তাদের কোন মেধাগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়না; এ কাজে দক্ষতার দরকার আছে সামান্যই এবং বিচার-বুদ্ধির দরকার নেই আদৌ; তাদের মজুরি বালকদের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি হলেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আনুপাতিক ভাবে বাড়েনা এবং তাদের অধিকাংশই আশা করতে পারেনা যে তারা ভবিষ্যতে মেশিন-চালকের দায়িত্বশীল পদে উন্নীত হবে ও বেশি মজুরি পাবে, কেননা যেখানে মেশিন-প্রতি বালক কাজ করে চার জন, সেখানে চালক লাগে একজন।[১০] যখন তারা এই কাজের তুলনায় বেশি বয়সী হয়ে পড়ে অর্থাৎ ১৭ বছরে প; দেয়, তখনি তাদের ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। তারা তখন নানাবিধ অপরাধের কাজের নবিশ হয়। তাদের অন্যত্র কর্মসংস্থানের একাধিক প্রচেষ্টা তাদের অজ্ঞতা, অমানুষিকতা এবং মানসিকতা ও শারীরিক অধঃপতনের দরুন ব্যর্থতায় পর্যবসিত
যেমন ম্যানুফ্যাকচারকারী কর্মশালার অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগের ক্ষেত্রে, তেমনি। সমাজের অভ্যন্তরস্থ শ্রম-বিভাগের ক্ষেত্রে। যতকাল হস্তশিল্প ও ম্যানুফ্যাকচার রচনা করে সামাজিক উৎপাদনের সাধারণ ভিত্তিভূমি, তত কাল পর্যন্ত একটি শাখার কাছে উংপাদকের একান্ত বশ্যতা তথ। তার কর্মসংস্থানের বহুমুখিতার সমাপ্তি[১১] বিকাশের পথে একটি আবশ্যক শর্ত। ঐ ভিত্তিভূমির উপরে উৎপাদনের প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র শাখা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করে সেই আকার যা কৃৎকৌশলগত ভাবে তার পক্ষে উপযোগী, তার পরে আস্তে আস্তে তা সেটিকে নিখুত করে তোলে এবং সেই আকারটিকে দ্রুত স্ফটিকায়িত করে। বাণিজ্যের মারফৎ প্রাপ্ত নোতুন কাঁচামাল ছাড়া আর একটি মাত্র জিনিস যা পরিবর্তন ঘটায় তা হল শ্রম উপকরণসমূহের ক্রমিক পরিবর্তন। কিন্তু সেগুলিরও রূপও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে একবার নির্দিষ্ট হয়ে গেলে তা-ও হয়ে যায় শিলীভূত-হাজার বছর ধরে সেগুলি যে একই রূপে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়, এটাই তার প্রমাণ। একটি বৈশিষ্ট্য সূচক নিদর্শন হচ্ছে এই যে, এমনকি এই অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্তও বিভিন্ন শিল্পকে অভিহিত করা হত “রহস্য” ( ‘মিষ্ট্রি’) বলে। যার গুপ্ত তথ্যে কেবল যথাবিহিত ভাবে দীক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারত না।[১২] তাদের নিজেদেরই সামাজিক উৎপাদনকে মানুষদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখত যে অবগুণ্ঠন, এবং স্বতঃস্ফত বিভিন্ন ভাবে আধুনিক শিল্প সেই অবগুণ্ঠনটিকে ছিন্নভিন্ন করে দিল বিভক্ত উৎপাদন শাখাকে, কেবল বাইরের লোকদের কাছেই নয়, ভিতরের লোকদের কাছেও পরিণত করত কতগুলি ধাধায় সেগুলি মানুষের হাতের সাহায্যে সম্পাদন করা সম্ভব কিনা সে দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই প্রত্যেকটি প্রক্রিয়াকে তার উপাদানগত কতকগুলি গতিক্রিয়ায় বিভক্ত করার যে নীতি আধুনিক শিল্প অনুসরণ কয়ে, তাই সৃষ্টি করল প্রযুক্তিতরে (টেকনোলজি’-র) আধুনিক বিজ্ঞানকে। শিল্প প্রক্রিয়াসমূহের বিভিন্ন-বিচিত্র, বাহত অসংলগ্ন, শিলীভূত রূপগুলি এখন নিজেদেরকে পর্যবসতি করল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য-সাধনে প্রকৃতি-বিজ্ঞানের কতকগুলি সচেতন ও সুশৃংখল প্রয়োগে। প্রযুক্তি বিজ্ঞান আরো আবিষ্কার করল গতির প্রধান প্রধান মৌল রূপ-কটিকে, ব্যবহৃত হাতিয়ারগুলির বিচিত্র বিভিন্নতা সত্ত্বেও গতির যে-রূপগুলিকে মানবদেহের প্রত্যেকটি উৎপাদনমুখী ক্রিয়া আবশ্যিক ভাবেই ধারণ করে থাকে; ঠিক যেমন বলৰিক্ত ন (মেকানিক্স’) সবচেয়ে জটিল মেশিনারির মধ্যেও দেখতে পায় কেবল কতকল সরল যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি—তা ছাড়া, আর কিছুই নয়।
