পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি সহজতম উপকরণের ব্যবস্থা করতেও যে পার্লামেন্টের আইন-প্রণয়নের সাহায্যে বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেবার আবশ্যকতা রয়েছে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির চরিত্র প্রদর্শনে এর তুলনায় আরো ভালো দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে? মৃৎশিল্প-কারখানাগুলিতে (পটারি) দীর্ঘকাল ধরে, কোন কোন ক্ষেত্রে ২০ বছর, আবার কোনটিতে আজন্মকাল পরিষ্কার করার কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার পরে” (এটাই বুঝি ধনিকদের ‘ভোগ-নিবৃত্তির’ তত্ত্ব। ১৮৩৪ সালের কারখানা-আইন সেগুলিকে করায় চুনকাম ও পরিষ্কার”, এই কারখানাগুলিতে কাজ করত ২৭,৮০০ শ্রমিক, যাদের এতকাল সারাদিন ও প্রায়শঃই সারা রাতভর কাজের সময়ে শ্বাস নিতে হত একটা পুতিগন্ধপূর্ণ আবহাওয়ায়, অন্য দিক থেকে ক্ষতিকারক না হলেও এই আবহাওয়ার দরুন এই পেশাটি হয়ে ওঠে রোগ ও মৃত্যুতে আকীর্ণ। এই আইনের ফলে আলো-হাওয়া চলাচলের অনেকটা উন্নতি ঘটে।”[২] একই সঙ্গে এই আইনটির এই অংশটি জাজ্বল্যমান ভাবে দেখিয়ে দেয় যে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি, তার নিজস্ব প্রকৃতির দরুণই, একটা নির্দিষ্ট মাত্রার পরে যাবতীয় যুক্তিসঙ্গত উন্নয়নের কাজকে পরিহার করে। একথা বারংবার বলা হয়েছে যে, ইংরেজ ডাক্তাররা এবিষয়ে একমত যে, যেখানে কাজ চলে একটানা সেখানে সবচেয়ে কম করে হলেও প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্য প্রয়োজন ৫০০ ফুট জায়গা। এখন, যদি কারখানা আইনগুলি তাদের বাধ্যতামূলক সংস্থানগুলির মাধ্যমে ছোট ঘোট কর্মশালাগুলির বড় বড় কারখানায় রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করে এবং এইভাবে পরোক্ষঃ ছোট ছোট ধনিকদের স্বত্বাধিকারকে আক্রমণ করে এবং বড় বড় ধনিকদের একচেটিয়া অধিকার স্থাপনকে সুনিশ্চিত করে, তা হলে প্রত্যেক কর্মশালায় প্রত্যেকটি কর্মীর জন্য উপযুক্ত স্থান সংকুলানের সংস্থানটিকে যদি বাধ্যতামূলক করা হয়, তার ফল দাড়াবে এই যে এক ধাক্কায় হাজার হাজার ছোট খনিক প্রত্যক্ষভাবে উচ্ছিন্ন হয়ে। যাবে ! ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির যেটি শিকড় তথা শ্রমশক্তির “অবাধ” ক্রয় ও ব্যবহারের মাধ্যমে ছোট বড় সমস্ত মূলধনের আত্মপ্রসারণ—সেই শিকই হবে আক্রান্ত। সুতরাং শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় এই ৫০০ ফুট জায়গার সামনে এসেই কারখানা-আইন প্রণয়নের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যায়। স্যানিটারি (স্বাস্থ বিভাগীর) অফিসার, শিল্প-তদন্ত কমিশনার, কারখানা-ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) সকলেই ঐ ৫০০ কিউবিক ফুটের আবশ্যকতার কথা এবং মূলধনের কাছ থেকে তা আদায় করে নেবার অসম্ভাব্যতার কথা বারংবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বস্তুতঃপক্ষে, তারা এইভাবে এটাই ঘোষণা করেছেন যে, শ্রমিক-জনসংখ্যার মধ্যে ক্ষয়-রোগ ও ফুসফুসের অন্যান্য রোগের অস্তিত্ব মূলধনের পক্ষে অত্যাবশ্যক পূর্বশর্ত।[৩]
কারখানা-আইনের শিক্ষা-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলি নগণ্য বলে প্রতিভাত হলেও, তা প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুদের কর্ম-নিয়োগের অপরিহার্য শর্ত বলে ঘোষণা করেছে।[৪] এই অনুচ্ছেদগুলির সাফল্য প্রথম বারের মত প্রমাণ করে দিল দৈহিক শ্রমের সঙ্গে শিক্ষা ও ব্যায়ামের মিলন ঘটাবার সম্ভাব্যতা।[৫] স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করে কারখানা-পরিদর্শকেরা অচিরেই আবিষ্কার করলেন যে, কারখানার শিশুরা যদিও নিয়মিত ডে-স্কুলগুলির শিক্ষার্থীরা যতটা শিক্ষালাভ করে তার অর্ধেকটা পায়, তা হলেও অন্যান্য বিষয়ে তাদের তুলনায় সমান বা তার বেশই শেখে। এর কারণ এই সহজ সত্যটি যে, মাত্র অর্ধেক সময় স্কুলে থাকে বলে তারা সব প্রাণবন্ত সময়েই এবং শিক্ষা গ্রহণে প্রায় সব সময়েই আগ্রহী। যে-প্রণালীতে তারা কাজ করে—অর্ধেক দৈহিক শ্রম, অর্ধেক শিক্ষা, তাতে এই দুটির মধ্যে একটিতে নিযুক্তি অন্যটিকে দেয় বিশ্রাম ও মুক্তি; কাজে কাজেই, একমাত্র একটিতে নিরন্তর নিযুক্ত থাকার চেয়ে দুটিতে নিযুক্ত থাকা শিশুদের পক্ষে টের বেশি অনুকূল। এটা খুবই স্পষ্ট যে, একটি বালক যে গোটা সকালটাই স্কুলে ব্যস্ত থাকে, সে, যে-বালকটি তার কাজ থেকে উজ্জীবিত ও উৎফুল্ল হয়ে ফিরল, তার সঙ্গে পেরে ওঠে না (বিশেষ করে, গরম আবহাওয়ায়)।[৬] এই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের জন্য ১৮৬৩ সালে এডিনবরায় অনুষ্ঠিত সামাজিক বিজ্ঞান সম্মেলনে সোশ্যাল সাইন্স কংগ্রেস’-এ প্রদত্ত সিনিয়রের ভাষণ দ্রষ্টব্য। অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, স্কুলের উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর শিশুদের একঘেয়ে ও অনর্থক দীর্ঘায়িত স্কুলষটাগুলি কেমন করে কেবল শিক্ষকদের কাজের ভারকেই অনর্থক ভাবে বাড়িয়ে তোলে, “যখন তিনি কেবল নিষ্ফলভাবেই নয়, সেই সঙ্গে চুড়ান্ত ভাবেও নষ্ট করেন শিশুদের সময়, স্বাস্থ্য ও শক্তি”।[৭] যে-কথা রবার্ট ওয়েন আমাদের সবিস্তারে বলেছেন, কারখানা-ব্যবস্থা থেকে কুসুমিত হয় ভবিষ্যতের শিক্ষার বীজ-যে-শিক্ষ। কেবল একটা নির্দিষ্ট বয়সের বেশ-বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে উৎপাদন-নৈপুণ্য বারাবার পদ্ধতি হিসাবেই শিক্ষা ও ব্যায়ামের সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমের মিলন ঘটাবে না, সেই সঙ্গে হয়ে উঠবে পূর্ব বিকশিত মানুষ গড়ে তোলার একমাত্র পদ্ধতি।
