নিছক প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকসমূহ ছাড়াও—যেগুলি প্রযুক্তিগত উপায়ের মাধ্যমে অপসারণ করা যায়, সেগুলি ছাড়াও, শ্রমিক-জনগণের বিবিধ অনিয়মিত আচার অভ্যাসও শ্রমের সময় নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে। যেখানে একক-পিছু মজুরি ( ‘পিস ওয়েজ) প্রথার প্রাধান্য থাকে কিংবা যেখানে দিনের বা সপ্তাহের একাংশের নষ্ট সময় অন্য অংশে উপরি-সময় খেটে বা নৈশকাজের মাধ্যমে-যে-নৈশ কাজের রেওয়াজ বয়স্ক শ্রমিককে পাশবিক করে তোলে এবং তার স্ত্রী ও শিশুদের সর্বনাশ ঘটায় সেই কাজের মাধ্যমে, পুষিয়ে নেওয়া যায়, বিশেষ করে সেখানে শ্রমিকের এই অনিয়মিত আচার অভ্যাসই মূলতঃ প্রাতবন্ধক হয়ে দাড়ায়।[১৯] যদিও শ্রমশক্তি-ব্যয়ের এই অনিয়মিকতা একঘেয়ে উঞ্ছবৃত্তির ক্লান্তিকরতার বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক ও রূঢ় প্রতিক্রিয়া, তা হলেও এর উৎপত্তি প্রধানতঃ ঘটে উৎপাদনক্ষেত্রে নৈরাজ্য থেকে—যে নৈরাজ্যের আবার কারণ হল ধনিকের দ্বারা শ্রমশক্তির বগাহীন শোষণ। শিল্পচক্রের সাধারণ পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন এবং বাজারের বিশেষ ওঠা-নামা, যা প্রত্যেকটি শিল্পকে শাসন করে, সেগুলি ছাড়াও, আমরা মরশুম”-কে বিবেচনার মধ্যে ধরতে পারি, যা নির্ভর করে নৌ-চলা চলের পক্ষে অনুকূল ঋতুগুলির উপরে কিংবা ফ্যাশন এবং, যথাসম্ভব স্বল্পকালের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে, এমন আকস্মিক বিরাট বায়নার উপরে। রেলওয়ে এবং টেলিগ্রাফের সম্প্রসারণের সুবাদে এই ধরনের বায়না দেবার রেওয়াজ ঘন ঘন ঘটে। “সারা দেশ জুড়ে রেলওয়ে-ব্যবস্থার প্রসার স্বল্পকালীন নোটিশ দেবার প্রবণতাকে খুবই। উৎসাহ যুগিয়েছে। এখন, আমরা যেসব পণ্যাগারে সরবরাহ যোগাই, গ্লাসগো, ম্যাঞ্চেস্টার। ও এডিনবরা থেকে ক্রেতারা সেখানে আসে; আগে যেমন তারা উপস্থিত স্টক থেকেই জিনিস কিনত, এখন তা না করে তারা ঘোট ঘোট বায়না দেয়, যেগুলিকে অবিলম্বে সরবরাহ করতে হয়। কয়েক বছর আগে আমরা আলগা সময়ে কাজ করতে পারতাম, যাতে করে পরের মরশুমের চাহিদা মেটাতে পারি, কিন্তু এখন কেউই আগে থেকে বলতে পারে না তখন চাহিদা কতটা হবে।[২০]
এখনো কারখানা-আইনের আওতায় আসেনি, এমন সব ফ্যাক্টরি ও ম্যানু ফ্যাক্টরিতে সবচেয়ে ভয়ানক অতিরিক্ত কাজ (ওভার-ওয়ার্ক”) কিছুকাল অন্তর অন্তর দেখা যায়, যাকে বলা হয় মরশুম’, সেই সময়ে, যা ঘটে থাকে আকস্মিক বায়না পেয়ে যাবার ফলে। ফ্যাক্টরি, ম্যানুফ্যাক্টরি ও ওয়্যার-হাউজ (পণ্যাগার )-এর বহিরবস্থিত বিভাগে, তথাকথিত গৃহকর্মীরা, যাদের কর্ম-নিয়োগ খুব ভাল হলে অনিয়মিত, তারা তাদের কাঁচামালের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করে ধনিকের বায়না বা খেয়ালের উপরে, যে এই শিল্পে তার বাড়িঘর বা যন্ত্রপাতির অবমূল্যায়নের ভাবনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং কাজ বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকের নিজের চামড়ার ঝুকি ছাড়া আর কোনো কিছুরই ঝুঁকি গ্রহণ করে না। এখানে তাই সে নিজেকে নিয়োজিত করে একটি মজুদ শিল্প-বাহিনী গড়ে তুলতে, যে-বাহিনী এক মুহূর্তের নোটিশে তৈরি হয়ে যাবে, বছরের একটি অংশে যে সবচেয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের দ্বারা এই বাহিনীর প্রতি দশজনের একজনকে মৃত্যুর কবলে ঠেলে দেয় এবং আরেকটি অংশে কাজের অভাবে অনাহারে থাকতে বাধ্য করে। “যখন এক ধাক্কায় কোনো বাড়তি কাজ করিয়ে নিতে হয়, তখন নিয়োগকর্তারা শ্রমিকের এই অভ্যাসগত অনিয়মিকতার সুযোগ নেয়, যার ফলে কাজ চলে রাত ১১টা, ১২টা, কিম্বা ২টা পর্যন্ত অথবা, চলতি কথায় যাকে বলা হয়, “চব্বিশ ঘণ্টা” এবং যেসব অঞ্চলে দুর্গন্ধে তোমার দম আটকে আসে, তুমি দরজার দিকে হঠে যাও, হয়তো খুলে ফেলল, কিন্তু তার পরে আর এক পা বাড়াতে গিয়ে কেঁপে ওঠে।”[২১] মনিবদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে একজন সাক্ষী, পাদুকাকার, বলেন, “এরা অদ্ভুত লোক; এরা ভাবে একটা ছেলেকে যদি বছরের ছমাস হাড়-ভাঙ্গা খাটুনি খাটানো হয় এবং বাকি ছমাস প্রায় অলস বসিয়ে রাখা হয় তা হলে ছেলেটার কোনো ক্ষতি হয় না।”[২২]
যে-ভাবে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকগুলিকে, ঠিক তেমনি “যেসব রীতি গড়ে উঠেছে। শিল্পের গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতিগুলিকে, স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ধনিকেরা আগেও যেমন ঘোষণা করত কাজের প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত প্রতিবন্ধক বলে, আজও তেমন করে। যখন তারা প্রথম কারখানা-আইনের শংকায় শংকিত হল, তখন এটা ছিল তুলাকল-মালিকদের পছন্দসই আওয়াজ। যদিও অন্য যে-কোনো শিল্পের তুলনায় তাদের শিল্প নৌ-চলাচলের উপরে বেশি নির্ভরশীল, তথাপি অভিজ্ঞতা তাদের মিথ্যাবাদী বলে প্রতিপন্ন করেছে। সেই থেকে, ব্যবসার পথে, ইচ্ছাকৃত যে-কোনো প্রতিবন্ধককে কারখানা-পরিদর্শকেরা গণ্য করেছেন নিছক ধাপ্পা বলে।[২৩] শিশু নিয়োগ কমিশনের সম্পূর্ণত নীতি-নিষ্ঠ সমীক্ষা প্রমাণ করে যে, শ্রমের ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের ফলে কয়েকটি শিল্পে পূর্ব-নিযুক্ত-শ্রম-সমষ্টি সারা বছর জুড়ে অধিকতর সমভাবে বিস্তার লাভ করেছে;[২৪] প্রমাণ করে যে, এই নিয়মই হচ্ছে প্রচলিত প্রথার মারণাত্মক, নিরর্থক যথেচ্ছাচারের উপরে প্রথম যুক্তিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ,-যথেচ্ছাচার যা আধুনিক শিল্পের সঙ্গে এত খারাপভাবে লগ্ন হয়ে থাকে;[২৫] প্রমাণ করে যে, সমুদ্রগামী নৌ-পরিবহন ও সাধারণভাবে যোগাযোগব্যবস্থার অগ্রগতি মরশুমি কাজের প্রযুক্তিগত ভিত্তিটিকে তথা অবলম্বনটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে;[২৬] এবং প্রমাণ করে দিয়েছে যে, আরো বড় বড় বাড়ি, আবো মেশিনারি, নিযুক্ত শ্ৰমিকসংখ্যায় আরো অগ্রগতি[২৭] এবং পাইকারি ব্যবসা পরিচালনায় এই সবের জন্য সংঘটিত রদবদলের মুখে অন্যান্য সর্বপ্রকারের তথাকথিত দুর্জয় সমস্যাগুলি অন্তর্হিত হয়ে যায়।[২৮] কিন্তু তথাপি মূলধন কখনো এই সব পরিবর্তন এবং তার প্রতিনিধিরাই বারংবার সেটা স্বীকার করেছেন—যতদিন না শ্রমের ঘন্টা বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে “পার্লামেন্টের সার্বিক আইন তার উপরে তা চাপিয়ে দেয়।]২৯]
