বিশেষ করে, কাজের দিনের দৈর্ঘ্য যখন নির্দিষ্ট, তখন কারখানা-ব্যবস্থার অস্তিত্বের একটি অত্যাবশ্যক শর্ত হচ্ছে ফল সম্পর্কে নিশ্চয়তা অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্যদ্রব্যের কিংবা একটি প্রয়োজনীয় পরিমাণের উৎপাদন সম্পর্কে নিশ্চয়তা। একটি শ্রম-দিবসে আইন-অনুসারে কয়েকটি ছেদ দিতে হয়। এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় যে, মাঝে মাঝে ও আকস্মিক এই যে কর্ম-বিরতি, তা উৎপাদন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রমণশীল জিনিসটির কোনো ক্ষতি করেনা। ফলের ব্যাপারে এই নিশ্চয়তা এবং কাজে বিরতি ঘটাবার এই সম্ভাব্যতা বিশুদ্ধ যান্ত্রিক শিল্পগুলিতে যত সহজে আয়ত্ত করা যায়, রাসায়নিক ও ভৌত প্রক্রিয়াসমূহ যেসব শিল্পে অংশ গ্রহণ করে সেখানে তত সহজে করা যায়না। যেমন দৃষ্টান্তস্বরূপ, মৃৎপাত্র শিল্পে, ‘ব্লিচিং’, ‘ডাইং’, ‘বেকিং’ এবং অধিকাংশ ধাতব শিল্পে, যেখানেই এমন শ্রম-দিবস রয়েছে যার দৈর্ঘ্যের উপরে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যেখানেই নৈশ কাজ ও মনুষ্য-জীবনের সীমাহীন অপচয় চালু আছে, সেখানেই কাজটির প্রকৃতিই যদি ভালোর দিকে পরিবর্তনের পথে সামান্যতম বাধাও সৃষ্টি করে, তা হলে অচিরেই সেই বাধাকে দেখা হয় প্রকৃতি কর্তৃক আরোপিত চিরস্থায়ী প্রতিবন্ধক হিসাবে। কারখানা-আইন যতটা নিশ্চিত ভাবে এই সব প্রতিবন্ধক অপসারণ করে, কোনো বিষয়ই তার চেয়ে বেশি নিশ্চিত ভাবে কীট-পতঙ্গের মৃত্যু ঘটায় না। “অসম্ভাব্যতা সম্পর্কে আমাদের বন্ধুরা, মৃৎপাত্র-প্রস্তুতকারকেরা যত হৈ-চৈ করেছিল তার চেয়ে বেশি আর কেউ করেনি। যাই হোক, ১৮৪৬ সালে তাদের এই আইনের আওতায় আনা হয়, এবং ষোল মাসের মধ্যেই সমস্ত “অসম্ভাব্যতা” অন্তহিত হয়ে যায়। বাষ্পীকরণের পরিবর্তে চাপের সাহায্যে স্লিপ তৈরির যে উন্নত পদ্ধতি এই আইনের ফলে সংঘটিত হল, মৃৎপাত্রকে তার কাঁচা অবস্থায় শুকিয়ে নেবার জন্য যে নোতুন স্টোভ আবিষ্কৃত হল —এই সবই মৃৎ-শিল্পকলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং এইগুলি এমন এক অগ্রগতির পরিচায়ক, যার সমকক্ষ পূর্ববর্তী শতাব্দীতে ছিলনা।….. এই উন্নত পদ্ধতি এমনকি স্টোভগুলির তাপও বহুল পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছে এবং জ্বালানির সাশ্রয় ঘটিয়েছে; পাত্রের উপরে যাতে চটপট ক্রিয়া করে তারও ব্যবস্থা করেছে।[১৪] সব রকমের ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও, মাটির জিনিসের উৎপাদন-ব্যয় বৃদ্ধি পায়নি অথচ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে—এবং বৃদ্ধি পেয়েছে এমন মাত্রায় যে ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বরে যে বারো মাস শেষ হল, সেই এক বছরে পূর্ববর্তী তিন বছরের গড়কে ছাড়িয়ে রপ্তানির পরিমাণ মূল্য হিসাবে বেড়ে গেল ১,৩৮,৬২৮ পাউণ্ড। দিয়াশলাই ম্যানুফ্যাকচারে এটাকে ধরে নেওয়া হত একটা অপরিহার্য প্রয়োজন বলে যে, বালকেরা যখন নাকে-মুখে তাদের খাবার গিলবে, তখন কাঠির মাথাগুলিকে গলানো ফসফোরামের মধ্যে ডুবিয়ে যাবে, আর ফসফোরাসের বিষাক্ত বাম্প তাদের মুখে গিয়ে লাগবে। (১৮৬৪) সালের কারখানা-আইন সময়ের সংকোচন-সাধনকে আবশ্যিক ব্যাপারে পরিণত করল এবং একটি ডোবানো যন্ত্রের (ডিপিং মেশিন-এর) আবিষ্কার ঘটাল, যার বাষ্প আর কর্মীদের গায়ে এসে লাগতে পারেনা।[১৫] অনুরূপ ভাবে, বর্তমানে লেস-ম্যানুফ্যাকচারের যেসব শাখাকে এখন পর্যন্ত কারখানা-আইনের আওতায় আনা হয়নি, সেই সব শাখায় এই খ্রীতি অনুসরণ করা হয় যে খাবারের জন্য কোনো নিয়মিত সময় নির্দিষ্ট করা যায়না, কেননা বিভিন্ন রকমের লেস শুকোবার জন্য বিভিন্ন সময়কালের দরকার হয়, যা কখনো হতে পারে তিন মিনিট, কখনো বা এক ঘণ্টা বা তারও বেশি। এর জবাবে শিশু নিয়োগ কমিশনের কমিশনার বলেন, এই ক্ষেত্রের অবস্থাবলী ঠিক কাগজ-রঞ্জকদের অবস্থাবলীর মত, যার কথা আমরা প্রথম রিপোর্টে আলোচনা করেছি। এই শিল্পের প্রধান কয়েকজন ম্যানুফ্যাকচারকারী বলেন, যেসব মাল-মশলা ব্যবহার করা হয় সেগুলির প্রকৃতি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার দরুন, তাদের পক্ষে গুরুতর লোকসান ছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময়কে খাবার খাওয়ার জন্য স্থির রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে দেখা গেল যে, একটু নজর দিলে এবং আগে থেকে ব্যবস্থা করলে, আশংকিত অসুবিধাকে অতিক্রম করা যায় এবং তদনুযায়ী পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশনে গৃহীত কারখানা সম্প্রসারণ আইন’-এর ৬ ধারার ৬ উপধারা বলে কারখানা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাবারের সময় চালু করার জন্য তাদেরকে আঠারো মাস সময় দেওয়া হল।”[১৬] এই আইনটি পাশ হতে না হতেই আমাদের ম্যানুফ্যাকচারকারী বন্ধুরা আবিষ্কার করে ফেলল, “আমাদের উৎপাদন-শাখায় কারখানা-আইনের সম্প্রসারণের ফলে যে সমস্ত অসুবিধা ঘটবে বলে আশংকা করেছিলাম, আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, সেগুলি ঘটেনি। উৎপাদনে আদৌ কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি না, বস্তুত এখন তারা একই সময়ে বেশি উৎপাদন করছি।[১৭] এটা সুস্পষ্ট যে ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট—যার বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই কেউ এই অপবাদ দিতে পারবেন না যে সেখানে প্রতিভার খুব আধিক্য রয়েছে, সেই পার্লামেন্ট–অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, কাজের ঘণ্টা কমানো ও নিয়মিত করার পালটা হিসাবে সংশ্লিষ্ট উৎপাদন-প্রক্রিয়ার প্রকৃতি যে-সমস্ত প্রতিবন্ধক খাড়া করেছে, সেগুলিকে একটা সাদাসিধে বাধ্যতামূলক আইন প্রণয়নের সাহায্যেই ভাসিয়ে দেওয়া যায়। অতএব, একটি নির্দিষ্ট শিল্পে কারখানা আইন চালু করার পরে ছয় থেকে আঠারো মাস সময় দেওয়া হচ্ছে যার মধ্যে উক্ত আইনটি কার্যকরী করার পক্ষে যেসব প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধক আছে, সেগুলিকে অপসারিত করা হবে ম্যানুফ্যাকচার কারীদের পক্ষে বাধ্যতামূলক। “Impossible! ne me dites jamais ce bete de mot !”—মিরাবোর এই উক্তিটি বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য আধুনিক প্রযুক্তি-বিজ্ঞানের (টেকনোলজি’-র) ক্ষেত্রে। কিন্তু যদিও ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থাকে ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থায় রূপান্তরণের জন্য, প্রয়োজনীয় বৈষয়িক উপাদানগুলিকে কারখানা-আইনসমূহ এইভাবে কৃত্রিম ভাবে পরিপক্ক করে তোলে, তবু কিন্তু সেই সময়ে বৃহত্তর পরিমাণ মূলধন নিয়োগের আবশ্যকতা ঘটিয়ে সেই আইনসমূহ ক্ষুদ্র মালিকদের অবক্ষয় এবং মূলধনের কেন্দ্রীভবনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।[১৮]
