উৎপাদনের উপকরণে বিপ্লবের অবশ্যিক ফল হল শিল্প-পদ্ধতিতে বিপ্লব, যা সংঘটিত হয় বিবিধ অতিক্রান্তিকালীন রূপের বিচিত্র এক সংমিশ্রণের দ্বারা। শিল্পের কোন-না কোন শাখায় যে-হারে সেলাই-কলের প্রচলন ঘটেছে, যে-সময় জুড়ে তা কাজ করে এসেছে, শ্রমিক-জনগণের পূর্ববর্তী অবস্থা যা ছিল, ম্যানুফ্যাকচার বা হস্তশিল্প বা গৃহ-শিল্পের কার কতটা প্রাধান্য, কাজের ঘরের ভাড়া কত ইত্যাদি অনুযায়ী এই রূপগুলিরও পরিবর্তন ঘটে।[৫] দৃষ্টান্ত হিসাবে, পোশাক-আশাকে তৈরির ক্ষেত্রে, যেখানে শ্রম প্রায় সর্বত্র সংগঠিত প্রধানতঃ সরল সহযোগের ভিত্তিতে, সেখানে সেলাই-কল গোড়ার দিকে সেই ম্যানুফ্যাকচার-শিল্পে দেখা দিত কেবল একটা নোতুন উপাদান হিসাবে। দর্জির কাজে, শার্ট তৈরিতে, জুতো তৈরি ইত্যাদিতে সব কটি রূপই পরস্পর-মিশ্রিত। এখানে নিয়মিত ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থা। সেখানে মধ্যবর্তী লোকেরা ধনিকের কাছ থেকে সরাসরি কাঁচামাল পায় এবং ১০ থেকে ৫০ জন বা তারও বেশি মেয়ে-কর্মীকে তাদের সেলাই-কলগুলিকে আলাদা আলাদা গ্রুপে—“কামরা” বা “চিলেকোঠায় ভাগ করে দেয়। সর্বশেষে, যেখানে মেশিনারি প্রণালী হিসাবে সংগঠিত নয় এবং যেখানে তাকে খর্বাকার অনুপাতেও ব্যবহার করা যায়, সেখানে, সর্বত্রই যা ঘটে থাকে, হস্তশিল্পী ও গৃহকর্মীরা তাদের পরিবারবর্গের সহায়তায় কিংবা বাইরে থেকে কিছুটা অতিরিক্ত শ্রমের সাহায্যে, তাদের নিজেদের সেলাই কলগুলিকেই কাজে লাগিয়ে থাকে।[৬] যে-ব্যবস্থাটা ইংল্যাণ্ডে বাস্তবে চালু আছে, তা এই যে, ধনিক তার মোকামে বহুসংখ্যক মেশিন কেন্দ্রীভূত করে এবং তার পরে ঐসব মেশিনে উৎপন্ন জিনিসগুলিতে বাকি কাজের জন্য সেগুলি বিলি করে দেওয়া হয় গৃহকর্মীদের মধ্যে।[৭] ক্রান্তিকালীন এই রূপগুলির বিচিত্র বিভিন্নতা কিন্তু নিয়মিত কারখানা ব্যবস্থায় রূপান্তরণের প্রবণতাকে প্রচ্ছন্ন রাখেনা। সেলাই মেশিনের যা প্রকৃতি, তাতে এই প্রবণতা আরো পরিপুষ্ট হর; আগে তার যে-বহুবিধ ব্যবহার সম্পাদিত হত একটি শিল্পের বিভিন্ন শাখায়, এখন সেগুলি সম্পাদিত হয় একই ছাদের নীচে, একই পরিচালনার অধীনে। এই প্রবণতা আরো উৎসাহ পায় এই ঘটনা থেকে যে, প্রাথমিক সুচের কাজ ও আরো কিছু ক্রিয়াকর্ম সবচেয়ে সুবিধাজনক ভাবে করা যায় সেই জায়গায়, যেখানে মেশিনটি কাজ করছে। সেই সঙ্গে যার হাতে সেলাই করে এবং যারা নিজেদের মেশিনে সেলাই করে, সেই গৃহকর্মীদের অবশ্যম্ভাবী উদ্বাসনও এই প্রবণতাকে উৎসাহ দেয়। এই ভবিতব্য ইতিমধ্যেই তাদের অংশত কবলিত করেছে। সেলাই-কলে[৮] বিনিয়োজিত মূলধনের নিরন্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্তির ফলে মেশিনেতৈরি জিনিসপত্রের উৎপাদনে প্রেরণা সঞ্চার করে এবং তা দিয়ে বাজারকে ভাসিয়ে দেয় আর এই ভাবে গৃহ-কর্মীদের নিশানা দেয় তাদের মেশিনগুলিকে বিক্রি করে দেবার জন্য। খোদ সেলাই-মেশিনেরই অতি উৎপাদন তাদের উৎপাদন কারীদের বাধ্য করে, সেগুলিকে বিক্রি করতে না পেরে, কিছু পরিমাণ টাকার বদলে সাপ্তাহিক হিসাবে ভাড়া দিতে এবং এই ভাবে মারাত্মক প্রতিযোগিতার দ্বারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেশিন-মালিককে ধ্বংস করে দিত।[৯] মেশিনগুলির গঠনে নিরন্তর পরিবর্তন এবং সেগুলির ক্রমবর্ধমান মূল্যহ্রাস পুরনো মেশিনগুলির দিন দিন অবমূল্যায়ন ঘটায় এবং অসম্ভব সস্তা দামে সেগুলিকে বড় বড় ধনিকদের কাছে বিক্রি করে দেবার ব্যবস্থা করে, একমাত্র যারা সেগুলিকে লাভজনক ভাবে কাজে লাগাতে পারে। সর্বশেষে, মানুষের জায়গায় স্টিম ইঞ্জিনের প্রবর্তন, যেমন অনুরূপ সব বিপ্লবে, তেমন এই বিপ্লবেও হানে শেষ আঘাত। প্রথমে বাম্প-শক্তির ব্যবহার কিছু নিছক কারিগরি সমস্যার সম্মুখীন হয়, যেমন মেশিনগুলির মধ্যে অনিয়মিক, সেগুলির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা, হালকা মেশিনগুলিতে অতিরিক্ত ক্ষয়-ক্ষতি ইত্যাদি; অচিরেই অভিজ্ঞতার কল্যাণে এই সমস্যাগুলি অতিক্রম করা সম্ভব হয়।[১০] যদি, এক দিকে বড় বড় ম্যানুফ্যাক্টরিতে অনেক মেশিনের কেন্দ্রীভবনের ফলে বাম্প-শক্তির প্রয়োগ সম্ভব হয়, অন্য দিকে তখন মানুষের পেশির সঙ্গে বাষ্পের প্রতিযোগিতার ফলে বড় বড় কারখানায় শ্রমিক ও মেশিনের কেন্দ্রীভবন ত্বরান্বিত হয়। যেমন বর্তমান ইংল্যাণ্ড, যেখানে আধুনিক শিল্পের প্রভাবে সম্পূর্ণ ভাবে পরিবর্তিত বিপর্যস্ত ম্যানুফ্যাকচার, হস্তশিল্প ও গৃহ-শিল্পের মত উৎপাদনের প্রত্যেকটি রূপই অনেক কাল আগেই কারখানা ব্যবস্থার বিভীষিকাগুলি পুনরুৎপাদন করেছে, এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ভাবেই করেছে, অথচ সেই ব্যবস্থার আনুষঙ্গিক সামাজিক প্রগতির কোনো উপাদানে অংশ গ্রহণ করেনি, সেই ইংল্যাণ্ড আজ প্রত্যক্ষ করছে ম্যানুফাকচার, হস্তশিল্প, গৃহশিল্প, প্রভৃতি প্রত্যেকটি উৎপাদন-রূপের কারখানা-ব্যবস্থায় রূপান্তরণ—কেবল পোশাক তৈরির শিল্পের মত বিশাল শিল্পেই নয়, উল্লিখিত অন্যান্য শিল্পগুলিরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে।[১১]
যে সমস্ত শিল্পে নারী, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা নিযুক্ত হয়, সেই সমস্ত শিল্পে কারখানা আইনের বিস্তার সাধন শিল্প বিপ্লবকে কৃত্রিম ভাবে সাহায্য করে, যদিও শিল্প-বিপ্লব ঘটে থাকে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে। কাজের দিনের দৈর্ঘ্য, ছেদ, শুরু ও শেষ সম্পর্কিত বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের দৌড়-প্রথা, নির্দিষ্ট বয়সের কমবয়সী সমস্ত শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদির কারণে, এক দিকে যেমন দরকার হয় আরো মেশিনারি,[১২] অন্য দিকে তেমন দরকার হয় সঞ্চলক শক্তি হিসাবে পেশিশক্তির বদলে বাষ্প-শক্তির প্রয়োগ।[১৩] অপর পক্ষে, সময়ের ক্ষতিকে পুষিয়ে দেবার জন্য যৌথ ভাবে ব্যবহার্য উৎপাদন-উপায় উপকরণের ফার্ণেস-এর ও বাড়ি-ঘরের সম্প্রসারণ ঘটে; এক কথায়, উৎপাদনের উপায় উপকরণের বৃহত্তর কেন্দ্রীভবন এবং সেই সঙ্গে শ্রমিক-জনসংখ্যার বৃহত্তর সমাবেশ। কারখানা-আইনের দ্বারা আহত প্রত্যেকটি ম্যানুফ্যাকচারকারী বারংবার আবেগভরে যে প্রধান আপত্তিটি উত্থাপন করে, তা আসলে এই যে, পুরাতন আয়তনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হলে বৃহত্তর পরিমান মূলধনের প্রয়োজন হবে। কিন্তু তথাকথিত গৃহ শিল্পগুলিতে এবং গৃহ-শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারের মধ্যবর্তী রূপগুলিতে শ্রমের বেলায়, যখনি কাজের দিন ও শিশুদের নিয়োগের উপরে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়, তখনি ঐ শিল্পগুলি কোণঠাসা হয়ে যায়। সস্তা শ্রমের সীমাহীন শোষণই হচ্ছে তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতার একমাত্র ভিত্তি।
