পরনের পোশাক-আশাকের উৎপাদন অংশতঃ সম্পাদিত হয় ম্যানুফ্যাক্টরিগুলিতে, যেখানে কর্মশালাসমূহে আমরা পাই সেই শ্রম-বিভাজনেরই পুনরুৎপাদন, যার ‘মেমব্রা ডিসজেক্টা প্রস্তুত অবস্থাতেই পাওয়া যায় হাতের কাছেই; আর অংশতঃ সম্পাদিত হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিক-হস্তশিল্পীদের দ্বারা; এরা অবশ্য আগে যেমন ব্যক্তিগত পরিভোকাদের জন্য কাজ করত, এখন তা করেনা, এখন কাজ করে ম্যানুফ্যাক্টরি ও গুদামঘরের জন্য এবং কাজ করে এমন মাত্রায় যে প্রায়ই গোটা শহর বা গোটা অঞ্চল একটি স্থানীয় বিশেষত্ব হিসাবে নিযুক্ত থাকে বিশেষ বিশেষ শাখায়, যেমন জুতো তৈরি; এবং সর্বশেষে, এক বিপুল আয়তনে সম্পাদিত হয় তথাকথিত গৃহশিল্প শ্রমিকদের দ্বারা, যারা পরিণত হয় ম্যানুফ্যাক্টরিগুলির বহিবস্থিত বিভাগে, এমনকি, ক্ষুদ্রতর মালিকদের কর্মশালায়।[১]
কাঁচামাল ইত্যাদির যোগান আসে যান্ত্রিক শিল্প থেকে, সস্তা মানবিক মালের সমষ্টি গঠিত হয় (Tailable a merci et misericorde) যান্ত্রিক শিল্পের দ্বারা এবং উন্নতকৃত কৃষি কর্মের দ্বারা “মুক্ত-কৃত ব্যক্তিদের দিয়ে। চাহিদার বৃদ্ধি ঘটলে তার প্রয়োজন মেটাতে ধনিকদের চাই হাতের কাছে প্রস্তুত একটি সুসজ্জিত বাহিনী-ধনিকদের এই প্রয়োজন থেকেই উল্লিখিত শ্রেণীর ম্যানুফ্যাকচারের উৎপত্তি।[২] যাই হক, এইসব ম্যানুফ্যাকচার কিন্তু একটি সুবিস্তৃত ভিত্তি হিসাবে এই বিক্ষিপ্ত হস্তশিল্প ও গৃহ-শিল্পগুলিকে বেঁচে থেকে কাজ চালিয়ে যেতে সুযোগ দেয়। শ্রমের এই শাখাগুলিতে উদাত্ত মূল্যের বিপুল উৎপাদন এবং তাদের উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর ক্রমবর্ধমান হারে মূল্যহ্রাসের কারণ হচ্ছে প্রধানতঃ শ্রমিকদেরকে প্রদত্ত মজুরির পরিমাণ, যা এত সামান্য যে তা দিয়ে কেবল কায়রেশে প্রাণ বাঁচানোই যায় এবং সেই সঙ্গে, কাজের সময়ের যথাসম্ভব সম্প্রসারণ, যা এত সাংঘাতিক যে মানবদেহের সহ্যের শেষ সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাস্তবিক পক্ষে, মানুষের যে ঘর্ম ও রক্ত রূপান্তরিত হয় পণ্যসামগ্রীতে, সেই ঘর্ম ও রক্তকে সস্তা করেই অতীতে বাজারগুলিকে নিরন্তর আরো বিস্তৃত করা হয়েছে এবং আজও প্রত্যহ করা হচ্ছে; এই ঘটনা আরো বিশেষভাবে লক্ষণীয় ইংল্যাণ্ডের ঔপনিবেশিক বাজারগুলি সম্বন্ধে, যেখানে, তা ছাড়াও, ইংরেজ রুচি ও অভ্যাসগুলি প্রাধান্য লাভ করে। শেষ পর্যন্ত সেই সংকট-বিন্দুটিতে উপনীত হতে হল। পুৰ্বনো পদ্ধতির ভিত্তিটি–শ্রমিক-জনগণের পাশবিক শোষণ এবং সেই সঙ্গে মোটামুটি প্রণালীবদ্ধ শ্রম-বিভাজন আর ক্রমবর্ধমান বাজারগুলির পক্ষে এবং ধনিকদের মধ্যে আরো দ্রুত-বর্ধমান প্রতিযোগিতার পক্ষে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হলনা। মেশিনারির আবির্ভাবের ঘণ্টা বেজে উঠল। চুড়ান্ত ভাবে বৈপ্লবিক যে মেশিন, যা সমভাবে আক্রমণ চালাল এই উৎপাদন-ক্ষেত্রটির সংখ্যাহীন শাখায় উপরে-পোশাক তৈরি, দর্জির কাজ, জুতো তৈরি, সেলাই-ফেঁাড়াই, টুপি-তৈরি এবং আরো অনেক কিছুর সামগ্রিক ব্যবস্থার উপরে, সেটি আর কিছু নয়—সিউয়িং মেশিন’, ‘সেলাই-কল’।
শ্রমিক-জনসংখ্যার উপরে তার আশু প্রতিক্রিয়া অন্যান্য সব মেশিনারির মতই, আধুনিক শিল্পের উদ্ভব থেকে যে মেশিনারি শিল্পের নোতুন শাখায় আত্ম-প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। অতি কচি বয়সের শিশুরা ভেসে যায়। মেশিন-কর্মীদের মজুরি গৃহ কর্মীদের মজুরির তুলনায় বৃদ্ধি পায়; এই গৃহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই গরিবদের মধ্যেও সবচেয়ে গরিব। অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে অবস্থিত হস্তশিল্পীদের সঙ্গে মেশিনারি প্রতিযোগিতা করে, ফলে তাদের মজুরি দারুণ নেমে যায়। এই নোতুন মেশিন-কর্মীরা একান্ত ভাবেই বালিকা ও যুবতী নারী। যান্ত্রিক শক্তির সাহায্যে তারা, ভারি কাজের উপরে পুরুষ শ্রমিকদের যে-একচেটিয়া অধিকার এতকাল ছিল, সেই অধিকারকে ভেঙ্গে দেয় এবং অপেক্ষাকৃত হাল্কা কাজ থেকে বৃদ্ধ নারী ও অতি কচি শিশুদের দলে দলে উৎখাত করে দেয়। প্রবল প্রতিযোগিতা দৈহিক শ্রমিকদের মধ্যে যারা দুর্বলতম তাদের চূর্ণ করে দেয়। গত ১০ বছরে লণ্ডনে অনাহার-মৃত্যুর ভয়াবহ বৃদ্ধি এবং মেশিনে-সেলাইয়ের বিস্তার পাশাপাশি অগ্রসর হয়েছে।[৩] নোতুন মেয়ে-শ্রমিকেরা মেশিনের বিশেষ গড়ন, ওজন ও আকার অনুযায়ী হাতে ও পায়ে কিংবা কেবল হাতে মেশিন চালায়-কখনো বসে, কখনো দাড়িয়ে এবং যথেষ্ট পরিমাণ শ্রমশক্তি ব্যয় করে। যদিও পুরনো ব্যবস্থায় কাজের ঘণ্টা যত দীর্ঘ ছিল, এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা থেকে কম, তবু কাজের ঘণ্টার এই দৈর্ঘ্যের জন্যই এই মেয়ে শ্রমিকদের কাজ হয়ে পড়ে অস্বাস্থ্যকর। যেখানেই একটি সেলাই-কলকে স্থাপন করা হয় সংকীর্ণ ও ইতিপূবেই জনাকীর্ণ কোন কাজের ঘরের মধ্যে, তা অস্বাস্থ্যকর প্রভাবগুলিকে বাড়িয়ে তোলে। মিঃ লর্ড বলেন, “নিচু ছাদ-ওয়ালা কাজের ঘর, যার মধ্যে কাজ করছে ৩০৪০ জন মেশিন-কমী—এমন একটি ঘরে প্রবেশ করার প্রথম প্রতিক্রিয়াই অসহনীয়।……ঘরের অভ্যন্তরস্থ উত্তাপ ভয়ংকর; অংশত যার কারণ হচ্ছে ইস্তিরি গরম করার জন্য ব্যবহৃত গ্যাস স্টোভ; এমনকি যখন কাজের ঘণ্টা পরিমিত, সকাল ৮টা থেকে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত, তখনো এই সব জায়গায় প্রতিদিন ৩৪ জন করে কর্মী অজ্ঞান হয়ে যায়।[৪]
