ইংল্যাণ্ডে বালিশের জন্য লেস তৈরির কাজ চলে প্রধানতঃ দুটি জেলায়। একটি হল হলিটন লেস ডিস্ট্রিক্ট, ডেভনশায়ারের দক্ষিণ তীর বরাবর যা ছড়িয়ে আছে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত; তা ছাড়া, নর্থ ডেভনের কয়েকটি স্থানও পড়েছে যার মধ্যে; আর অন্য জেলাটি গঠিত হয়েছে বাকিংহাম, বেডফোর্ড ও নর্দাম্পটনকে এবং, সেই সঙ্গে, অক্সফোর্ড শয়ার ও হান্টিংনশায়ারের সংলগ্ন অংশগুলিকে নিয়ে। কাজটি পরিচালিত হয় প্রধানত কৃষি-শ্রমিকদের কুটিগুলিতে। এমন অনেক ম্যানুফ্যাকচারকারী আছে যারা ৩০০০ এরও বেশি এই ধরনের লেস-তৈরিকারকে নিয়োগ করে। এরা প্রধানত শিশু এবং একান্তভাবেই মেয়ে—কিশোরবয়সী। লেস-ফিনিশিং-এর কাজের আনুষঙ্গিক যে সব অবস্থার কথা আগে বলা হয়েছে, এখানে তার সবই আছে—পার্থক্য কেবল এই যে, এখানে “মনিবানীর বাড়ি বদলে পাই “লেস-স্কুল”, যেগুলি গরিব মহিলারা পরিচালনা করে নিজেদের কুটিরে। শিশুরা তাদের পঞ্চম বছর বয়স থেকে, অনেক সময়ে তারও আগে থেকে, দ্বাদশ বা পঞ্চদশ বর্ষ বয়স পর্যন্ত এই স্কুলগুলিতে কাজ করে। প্রথম বছরে খুবই অল্পবয়সী শিশুরা কাজ করে চার থেকে আট ঘণ্টা অবধি এবং, পরবর্তী কালে, সকাল ছটা থেকে রাত দশটা অবধি। “ঘরগুলি সাধারণত ছোট ঘোট কুটিরের মামুলি প্ৰাকার ঘর; দমকা হাওয়া বাইরে রাখার জন্য চিমনি রাখা হয় বন্ধু এবং ঘরের বাসিন্দারা নিজেদের গরম রাখে কেবল গায়ের উত্তাপের সাহায্যে; শীতকালেও প্রায় এই একই ঘটনা ঘটে। অন্যান্য ক্ষেত্রে, এই তথাকথিত স্কুলগুলি হল ফায়ারপ্লেস’-ছাড়া ভাড়ার ঘরের মত।……এই কুঠরিগুলিতে ভিড়ের ঠাসাঠাসি এবং তারই ফলে বায়ু দূষণের বাড়াবাড়ি প্রায়ই চরম। এর উপরে আবার আছে নর্দমা, পায়খানা এবং এই ধরনের ঘোট ঘোট কুটির-সংলগ্ন আস্তাকুড়ে পচা জিনিস ও আবর্জনার ক্ষতিকর ফলাফল। জায়গার পরিসর সম্পর্কে : “একটা লেস-স্কুলে আঠারজন বালিকা ও একজন মনিবানী, মাথাপিছু ৩৫ কিউবিক ফুট, অন্য একটিতে, যেখানে দুর্গন্ধ ছিল অসহ, ১৮ জন, মাথাপিছু ২৪.৫ কিউবিক ফুট। এই শিল্পে কর্ম-নিযুক্তদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় ২ ও ২.২৫ বছরের শিশুদের পর্যন্ত।”[১৭]
বাকিংহাম ও বেডফোর্ডের কাউন্টিগুলিতে যখন লেস-বোনার কাজ শেষ হয়, তখন শুরু হয় খড়ের বিনুনি বানানোর কাজ এবং এই রেওয়াজ চালু আছে হার্টফোর্ডশায়ারের একটি বড় অংশে এবং ইসেক্স-এর পশ্চিম ও উত্তরাংশে। ১৮৬১ সালে খড়ের বিনুনি ও টুপি তৈরির কাজে নিযুক্ত ছিল ৪৩,০৪৩ জন ব্যক্তি। এদের মধ্যে সব বয়সের পুরুষ ছিল ৩,৮১৫ জন এবং বাকিরা ছিল নারী যাদের মধ্যে ৭০০০ শিশুকে ধরে ২০ বছরের কমবয়সী মেয়েদের সংখ্যা ছিল ১৪,৯১৩। লেস-স্কুলের বদলে আমরা এখানে দেখি খড়ের বিনুনি বানানোর স্কুল। শিশুরা খড়-বিহুনিতে হাতে খড়ি দেয় সাধারণত তাদের ৪ বছরে, প্রায়ই ৩ আর ৪ বছরের মাঝামাঝি সময়ে। অবশ্য, শিক্ষা তারা। কিছুই পায় না। শিশুরা নিজেরাই এক রক্তচোষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে পার্থক্য বোঝাবার জন্য প্রাথমিক স্কুলগুলিকে বলে “স্বাভাবিক স্কুল”; এই রক্তচোষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের কাজে রাখা হয় একমাত্র তাদের টাস্ক করিয়ে নেবার জন্য, যা হচ্ছে সাধারণত ৩০ গজ এবং এটা ঠিক করে দেয় তাদেরই অর্ধাশক্লিষ্ট মায়েরা। এই একই মায়েরাই আবার স্কুলের পরে তাদের বাড়িতে কাজ করায় রাত ১০, ১১, এমনকি ১২টা অবধি। অনবরত মুখে দিয়ে খড় ভিজিয়ে নেয় বলে তাদের মুখ কেটে যায়; খড়ে তাদের আঙুলও কেটে যায়। ডাঃ ব্যালার্ড লণ্ডনের সমস্ত মেডিক্যাল অফিসার্বদের বক্তব্য হিসাবে বলেন যে, শোবার ঘরে বা কাজের ঘরে প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যূনতম প্রয়োজন হল ৩০০ কিউবিক ফুট, কিন্তু খড় বিনুনির স্কুলগুলিতে লেস-বোনার স্কুলগুলির চেয়েও মাথাপিছু কম জায়গা বরাদ্দ করা হয়-“প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ১২.৬৭, ১৭, ১৮.৫ কিউবিক ফুট এবং ২২-এর কম কিউবিক ফুট।” কমিশনারদের মধ্যে একজন, মিঃ হোয়াইট বলেন, সব দিকে ৩ ফুট করে এমন একটি বাক্সের মধ্যে যদি একটি শিশুকে ঠেসে দেওয়া হয়, তাহলে সে যতটা জায়গা জুড়ে থাকবে, এই সংখ্যাগুলির মধ্যে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি তার অর্ধেকেরও কম। ১২ বা ১৪ বছর অবধি শিশুরা এই রকম একটা জীবনই উপভোগ করে। হতভাগ্য, অর্ধভুক্ত মা-বাবার আর কিছুই ভাবনা নেই—একমাত্র বাচ্চাগুলিকে নিঙড়ে যতটা আদায় করে নেওয়া যায়, তা ছাড়া বাচ্চাগুলিও আবার যখন বড় হয়, তখন তারা মা-বাবার জন্য এক কড়িও পরোয়া করে না, মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যায় এবং সেটাই স্বাভাবিক। “এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে এইভাবে যারা বড় হয়, তাদের মধ্যে অজ্ঞতা ও দুষ্পবৃত্তির প্রাবল্য দেখা যায়। তাদের নৈতিকতা থাকে সবচেয়ে নিচু স্তরে। মহিলাদের একটা বড় সংখ্যাই থাকে অবৈধ সন্তান এবং সেটা এমন একটা অপরিণত বয়সে যে, অপরাধ-পরিসংখ্যানের সঙ্গে যাদের সম্যক পরিচয় আছে, তারা পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে যান।”[১৮] আর এইসব আদর্শ পরিবারের জন্মভূমি হল ইউরোপের সামনে আদর্শস্থানীয় খ্ৰীষ্টান দেশ; একথা বলেছেন, কাউন্ট মন্টালেমবার্ট, যিনি নিশ্চয়ই খ্ৰীষ্টধর্মের উপরে একজন সুযোগ্য কর্তৃত্ব !
