আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারব্যবস্থায় (যার মধ্যে আমি ধরি নিয়মিত কারখানা বাদে বড় আকারের সব কর্মশালা) মূলধন কিভাবে ব্যয়-সংকোচন ঘটায়, সে সম্পর্কে সরকারি ও সুপ্রচুর তথ্য পাওয়া যায় পাবলিক হেলথ, রিপোর্ট (৪) এবং পাবলিক হেথ, রিপোর্ট (৬)’-এ (১৮৬৪)। কর্মশালাগুলির বর্ণনা, বিশেষ করে, লণ্ডনের মুদ্রাকর ও দরজিদের কর্মশালাগুলির বর্ণনা আমাদের খেয়ালী গল্প-লেখকদের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক উদ্ভট কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের উপরে এর প্রতিক্রিয়া স্বতঃস্পষ্ট। প্রিভি-কাউন্সিলের চীফ মেডিক্যাল অফিসার এবং পাবলিক হেস্থ, বিপোর্ট’-এর সরকারি সম্পাদক ডাঃ সাইমন বলেন, “আমার চতুর্থ রিপোর্টে (১৮৬৩) আমি দেখিয়েছিলাম, যেটি তাদের প্রথম স্বাস্থ্য-বিষয়ক অধিকার সেটি নিয়ে পীড়াপীড়ি করাও শ্রমিকদের পক্ষে বাস্তবে কত অসম্ভব; সেই অধিকারটি হল এই যে, কোন্ কাজের জন্য নিয়োগকর্তা তাদের এক জায়গায় জড়ো করেছেন, তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু সমস্ত পরিহার্য অস্বাস্থ্যকর অবস্থা থেকে শ্রমকে মুক্ত করতে হবে যতদূর পর্যন্ত নিয়োগকর্তার উপরে তা নির্ভর করে। আমি দেখিয়েছিলাম, যেখানে শ্রমিকেরা নিজেদের স্বাস্থ্যের স্বার্থে এই ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ে কার্যত অক্ষম থাকবে, সেখানে তারা স্বাস্থ্যরক্ষী পুলিশের বেতনভোগী প্রশাসন থেকে কোনো ফলপ্রসূ সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হবে না।……..হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন এখন নিরর্থক নির্যাতিত হয় এবং দীর্ঘায়ু থেকে বঞ্চিত হয় কেবল তাদের পেশাগত অবস্থা সঞ্জাত অন্তহীন শারীরিক ক্লেশ থেকে।”[১১] কিভাবে কাজের ঘরগুলি স্বাস্থ্যের অবস্থাকে প্রভাবিত করে, তা বোঝাবার জন্য ডাঃ সাইমন নিমোত সারণীটি উপস্থিত করেছেন।[১২]
ছবি— পৃষ্ঠা ১৭২
.
ঘ. আধুনিক গৃহ-শিল্প
আমি এখন আসছি তথাকথিত গৃহ-শিল্পের ক্ষেত্রে। এই ক্ষেত্রে, যেখানে মূলধন তার শোষণকার্য চালায় আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পের পটভূমিকায়—এই ক্ষেত্রে বিভীষিকাগুলি সম্পর্কে একটা ধারণা করতে হলে যেতে হবে বাহত খুবই নিরীহ দর্শন পেরেক-তৈরির শিল্পে,[১৩] যা পরিচালিত হয় ইংল্যাণ্ডের দূর দূর গ্রামে। অবশ্য, এখানে লেস-বোনাওখড়ের বিনুনি বানানোর শিল্প দুটির যেসব শাখা এখনো মেশিনারির সাহায্যে চালানো হয় না এবং কারখানায় বা ম্যানুফ্যাকচারে চালিত শাখাগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না, সেইসব শাখা থেকে গুটিকয়েক নমুনা দেওয়াই যথেষ্ট।
ইংল্যাণ্ডে লেস-উৎপাদনে নিযুক্ত ১,৫০,০০০ ব্যক্তির মধ্যে, ১০,০০০ জন ১৮৬১ সালের কারখানা-আইনের পরিধির মধ্যে পড়ে। বাকি ১,৪০,০০০ জনের মধ্যে প্রায় সকলেই মহিলা, তরুণ-তরুণী এবং ছেলে ও মেয়ে ছিল—অবশ্য, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্ষেত্র দুটিতে ছেলেদের সংখ্যা খুবই কম। শোষণের এই সন্তা-সুলভ সামগ্রীর স্বাস্থ্যের অবস্থাটি নিচেকার সারণীটি থেকেই পরিষ্কার হয়ে যাবে; এটি তৈরি করেছেন তা ট্রম্যান, নটিংহাম জেনারেল ডিসপেন্সারির চিকিৎসক। ৬৮টি রোগিণীর মধ্যে, যাদের সকলেই লেস বোনে এবং যাদের অধিকাংশই ১৭ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বয়স, ক্ষয়রোগাক্রান্তের সংখ্যা নিম্নরূপ :
১৮৫২-৪৫ জনে ১
১৮৫৩-২৮ জনে ১
১৮৫৪-১৭ জনে ১
১৮৫৫-১৮ জনে ১
১৮৫৬-১৫ জনে ১
১৮৫৭-১৩ জনে ১
১৮৫৮-১৫ জনে ১
১৮৫৯- ৯ জনে ১
১৮৬০- ৮ জনে ১
১৮৬১- ৮ জনে ১[১৪]
ক্ষয়রোগের এই অগ্রগতি সর্বাপেক্ষ। অশাবাদী প্রগতিবাদীদের পক্ষে এবং জার্মানির স্বাধীন বাণিজ্যের ধ্বজাধারীদের মধ্যে যে ব্যক্তিটি মিথ্যা প্রচারের সবচেয়ে বড় ফেরিওয়ালা তার পক্ষেও যথেষ্ট হবে বলে মনে হয়।
১৮৬১ সালের কারখানা-আইনটি মেশিনারি পরিচালিত লেস উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রন করে এবং ইংল্যাণ্ডে সেটা চালু আছে। এখানে আমরা সেই শাখাগুলির পর্যালোচনা করছি যেখানে শ্রমিকের কাজ করে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে-ম্যানুফ্যাক্টরি (শ্রম-কারখানা) বা গুদামঘরে নয়। এরা পড়ে দুটি ভাগে : (১) ফিনিশিং এবং (২) মেনডি’। প্রথম ভাগে যারা কাজ করে, তারা মেশিনে তৈরি লেসকে ‘ফিনিশিং টাচ’ দেয় এবং নানা উপভাগে ভাগ হয়ে কাজ করে।
লেস ফিনিশিং-এর কাজটা করা হয়, যাকে বলা হয় “মনিবানীর বাড়ি”, তাতে, অথবা মহিলাদের দ্বারা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে কখনো তাদের বাচ্চাদের সাহায্য নিয়ে, কখনো তা না নিয়ে। মনিবানীরা বায়না নেয় ম্যানুফ্যাকচারকারীদের কাছ থেকে বা গুদাম-ঘর-মালিকদের কাছ থেকে এবং তারপরে ঘরের আয়তন ও চাহিদার ওঠানামা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক মহিলা, বালিকা ও অল্পবয়সী বাচ্চাদের কাজে নিয়োগ করে। নিযুক্ত মহিলাদের সংখ্যা কোথাও হয় ২০ থেকে ৪০ অবধি এবং কোথাও ১০ থেকে ২০ অবধি। যে-বয়সে এই বাচ্চারা কাজ শুরু করে, তা গড়ে দাড়ায় ৬ বছর, কোন কোন ক্ষেত্রে ৫ বছরের কম। সাধারণ ভাবে কাজের ঘণ্টা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত, খাবার জন্য ১২ ঘণ্টা সমেত; অবশ্য, খাবার খেতে হয় এক-এক দিন এক-এক সময়ে এবং প্রায়ই সেই অপরিচ্ছন্ন কাজের ঘরের মধ্যেই।
যখন কাজ থাকে প্রচুর, তখন অনেক সময়েই কাজ করতে হয় সকাল ৮টা, এমন কি ৬টা থেকে রাত ১০টা, ১১টা, এমন কি ১২টা পর্যন্ত। ইংল্যাণ্ডের ব্যারাকগুলিতে সৈন্যদের মাথাপিছু জায়গা আইনতঃ বরাদ্দ করতে হয় ৫০০/৬০০ কিউবিক ফুট এবং সামরিক হাসপাতালগুলিতে মাথাপিছু ১,২০০ ফুট, কিন্তু ঐ ‘ফিনিশিং কর্মক্ষেত্রগুলিতে মাথাপিছু জায়গা ৬৭ থেকে ১০০ কিউবিক ফুটের বেশি হয় না। সেই সঙ্গে বাতাসের অম্লজান (অক্সিজেন) আবার নিঃশেষিত হয় ঘরের গ্যাস-বাতিগুলির দ্বারা। লেস যাতে পরিষ্কার থাকে সেইজন্য এমনকি শীতকালেও বাচ্চাগুলিকে পর্যন্ত বাধ্য করা হয় পায়ের জুতো খুলে ফেলতে-যদিও মেঝে টালি বা পাথরের ফলকে বাঁধানো থাকে। নটিংহামে এটা কোন বিরল দৃশ্য নয় যে, ছোট্ট একটা ঘরে, সম্ভবত ১২ বর্গফুট জায়গায়, ১৪ থেকে ২০ জন বাচ্চাকে ঠাসাঠাসি করে কাজ করানো হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টা—এমন কাজ, যা কেবল সম্ভাব্য সব রকমের অস্বাস্থ্যকর অবস্থার মধ্যেই পরিচালিত হয় না, সেই সঙ্গে যার ক্লান্তি ও একঘেয়েমি তাদের নিঃশেষ করে দেয়।……….এমন কি সবচেয়ে ঘোট যে বাচ্চাগুলি তাদেরও কাজ করতে হয় এমন অত্যধিক মনোযোগ ও ক্ষিপ্রতা সহকারে যে অবাক হয়ে যেতে হয়। তাদের আঙুল পায় না কোনো বিশ্রাম, গতি হয় না কখনো শ্লথ। যদি তাদের কোনো প্রশ্ন করা হয়, তারা কখনো তাদের মাথা তোলে না-পাছে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট হয়। যতই কাজের ঘন্টা আরো লম্বা করা হয়, ততই মনিবানীর লম্বা লাঠিটা আরো বেশি বেশি করে ব্যবহৃত হয় উদ্দীপক-অংকুশ হিসাবে। “শিশুগুলি ক্রমে ক্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘকাল ধরে একটা একঘেয়ে চোখ-আলাকারী কাজে আটকে থাকার দরুন এবং একই অনড় ভঙ্গিতে কাজ করে যাবার অবসাদেব দরুন দিনের শেষ দিকে তারা পাখির মত ছটফট করতে থাকে। তাদের কাজ ক্রীতদাসত্বের মত।”[১৫] যখন মহিলা ও শিশুরা বাড়িতে থেকে কাজ করে বাড়িতে মানে ভাড়া-করা একখানা ঘরে, প্রায়ই একটা চিলেকোঠায়, তখন পরিস্থিতি হয় সম্ভবতঃ আরো খারাপ। নটিংহামের চারদিকে ৪০ মাইলের বৃত্তের মধ্যে এই ধরনের কাজ দেওয়া হয়। রাত ৯টা বা ১০টার সময়ে কাজের বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় তাদেরকে প্রায়ই দিয়ে দেয়া হয় এক বাণ্ডিল লেস যাতে তারা নিজেদের কাজটি শেষ করে ফেলতে পারে। বাণ্ডিলটা দিয়ে দেবার সময়ে অবশ্য মালিকের এক চাকর ফ্যারিসি’-র মত ভণ্ডামির সঙ্গে বলে দেয়, “এ কাজটা মায়ের জন্য”, যদিও সে জানে যে বেচারা শিশুদেরই রাত জেগে ঐ কাজটি শেষ করতে সাহায্য করতে হবে।[১৬]
