নিয়মিত কারখানার তুলনায় আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারে সস্তা ও অপরিণত শ্রম শক্তিকে শোষণ করা হয় আরো নির্লজ্জ ভাবে। এর কারণ এই যে, কারখানা ব্যবস্থার কারিগরি ভিত্তি অর্থাৎ পেশিশক্তির জায়গায় মেশিনের প্রচলন, এবং শ্রমের লঘু চরিত্র ম্যানুফ্যাকচারে সম্পূর্ণ ভাবে অনুপস্থিত এবং সেই সঙ্গে আবার নারী ও অতি-কম-বয়সী শিশুদের নির্মম ভাবে অভ্যস্ত করা হয় বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক সব পদার্থের প্রভাবে। ম্যানুফ্যাকচারের তুলনায় তথাকথিত ঘরোয়া শিল্পে আবার এই শোষণ আরো বেশি নির্লজ্জ; কারণ শ্রমিকেরা যত ছড়িয়ে থাকে, তত তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়; কারণ লুঠের পরগাছাদের একটা গোটা বাহিনী নিজেদের স্থান করে নেয় নিয়োগকর্তা এবং কর্মীদের মাঝখানে; কারণ ঘরোয়া শিল্পকে সব সময়েই প্রতিযোগিতা করতে হয় একই উৎপাদন-শাখায় কারখানা-ব্যবস্থা ও ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থার সঙ্গে; কারণ শ্রমিকের পক্ষে সবচেয়ে জরুরি যে-সব জীবন-যাপনের ব্যবস্থা-জায়গা, আলো, হাওয়া-দারিদ্র্য তার কাছ থেকে সেগুলিকে কেড়ে নেয়; কারণ কর্ম-প্রাপ্তি ক্রমেই হয়ে ওঠে আরো আরো অনিয়মিত; এবং, সর্বশেষে, আধুনিক শিল্প ও কৃষি যাদের পরিণত করেছে “অপ্রয়োজনীয় বাহুল্যে, সেই বিপুল জনসমষ্টির এই শেষ আশ্রয়গুলিতেও কাজের জন্য প্রতিযোগিতা ওঠে চরমে। উৎপাদনের উপায়-উপকরণে ব্যয়সংকোচন, যা প্রথমে ধারাবাহিক ভাবে কার্যকরী করা হয়। কারখানা-ব্যবস্থায় এবং সেখানে যা শুরু থেকেই সংঘটিত হয় শ্রমশক্তির বেপরোয়া অপচয়ের সঙ্গে এবং, তৎসহ, শ্রমের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে প্রয়োজনীয় যেসব অবস্থা তা থেকে তার বঞ্চনার সঙ্গে—এই ব্যয়-সংকোচন এখন আরো বেশি করে আত্মপ্রকাশ করে তার বৈরিতাপূর্ণ ও মারণাত্মক রূপে; সেই শিল্প-শাখায় তা তত বেশি করে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে শ্রমের সামাজিক উৎপাদন ক্ষমতা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সংযোজনের কারিগরি ভিত্তি যত কম বিকশিত।
.
গ. আধুনিক ম্যানুফ্যাকচার
উপরে যে নীতিগুলি উপস্থাপিত হয়েছে, আমি এখন সেগুলিকে দৃষ্টান্তের সাহায্যে বোঝাতে অগ্রসর হব। বাস্তবিক পক্ষে, শ্রম-দিবসের অধ্যায়ে প্রদত্ত বহুসংখ্যক দৃষ্টান্তের সঙ্গে ইতিপূর্বেই পাঠকের পরিচয় ঘটেছে। বার্মিংহামের হার্ডওয়্যার (লোহা, তামা ইত্যাদি) ম্যানুফ্যাকচারগুলিতে এবং তার আশেপাশের এলাকায়, প্রধান খুবই ভারি কাজে নিযুক্ত ছিল ১০,০০০ মহিলা ছাড়াও, ৩০,০০০ শিশু ও তরুণ ব্যক্তি। সেখানে তাদের দেখা যেত অস্বাস্থ্যকর পেতল-ঢালাইয়ের ঘরে (ব্রাস ফ্রাউণ্ডি’-তে ), বোম কারখানায়, কলাই (এনামেলিং’) রাংঝালাই। (গ্যালভানাইজিং) ও বার্নিশ ( ‘ল্যাকারিং) করার বিভাগগুলিতে।[৬] প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক উভয় ধরনের শ্রমিকদের মাত্রাধিক খাটুনির জন্য লণ্ডনের যেসব ভবনে সংবাদপত্র ও বই ইত্যাদি ছাপা হয়, সেগুলিকে অভিহিত করা হয় “কশাইখানা” এই অশুভ নামে।[৭] একই ধরনের মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করানো হয় বই-বাঁধাইয়ের কারখানাগুলিতে, যেখানে বলি হয় প্রধানতঃ মহিলারা, বালিকারা ও শিশুরা; অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের ভারি কাজ করতে হয় দড়ি-পাকানোর কারখানায় এবং নৈশ কাজ করতে হয় মুনের খনি, মোম তৈরির কারখানা ও রাসায়নিক কারখানায়; রেশম-বোনায় তঁাত ঘোরানোর কাজ যখন মেশিনারি দিয়ে করানো হয় না, তখন বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের দিয়ে সেই কাজ করাতে করাতে তাদের প্রাণান্ত করা হয়।[৮] সবচেয়ে বেশি লজ্জাজনক, সবচেয়ে বেশি নোরা, সবচেয়ে কম মজুরি-দেওয়া কাজগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে ন্যাকড়া-বাছাইয়েয় কাজ; আর এই কাজে বেছে বেছে নিয়োগ করা হয় মহিলাদের ও তরুণী বালিকাদের। এটা সুপরিচিত যে, গ্রেট ব্রিটেনের নিজের বিপুল পরিমাণ ন্যাকড়ার যোগান থাকলেও, সে কাজ করে গোটা বিশ্বের ন্যাকড়া বাণিজ্যের বড় বাজার হিসাবে। ন্যাকড়ার চালান আসে জাপান থেকে, দক্ষিণ আমেরিকার দূর দূর রাষ্ট্র থেকে এবং ক্যানারি আইল্যাণ্ডস থেকে। কিন্তু ন্যাকড়া সরবরাহের প্রধান প্রধান উৎস হচ্ছে জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি, মিশর, তুরস্ক, বেলজিয়াম ও হল্যাণ্ড। ন্যাকড়া ব্যবহার হয় সারের জন্য, বিছানার জাজিমের জন্য, ফেসোর জন্য এবং কাজ করে কাগজের কাঁচামাল হিসাবে। ন্যাকড়ার ভাণ্ডারগুলি হচ্ছে বসন্ত ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির বাহন এবং তারা নিজেরাই হয় সেই সব ব্যাধির প্রথম শিকার।[৯] অতিরিক্ত কাজ, কঠিন ও অনুচিত শ্রমের, এবং শিশুকাল থেকেই শ্রমিকের উপরে তার পাশবিক প্রভাবের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত কেবল যে কয়লা খননকারীদের মধ্যে এবং সাধারণ ভাবে সমস্ত খননকারীদের মধ্যেই পাওয়া যায় তা নয়, সেই সঙ্গে পাওয়া যায় টালি তৈরি ও ইট-তৈরির কাজে লিপ্ত কর্মীদের মধ্যেওযে শিল্পটিতে সাম্প্রতিক কালে উদ্ভাবিত মেশিনটি ইংল্যাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে কেবল বিক্ষিপ্ত ভাবে। মে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিদিন কাজ চলে সকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা অবধি এবং, যেখানে খোলা হাওয়ায় কোনো হয়, সেখানে সকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা অবধি। সকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজকে ধরা হয় মাত্রানি” ও “পরিমিত কাজ বলে। ৬, এমনকি, ৪ বছরের ছেলে ও মেয়েদের পর্যন্ত নিয়োগ করা হয়। তারা বয়স্কদের সমান ঘণ্টা, এমনকি, অনেক সময়েই তাদের চেয়ে বেশি ঘণ্টা কাজ করে। কাজটা খুবই কঠিন এবং গ্রীষ্মের তাপ অবসাদ আরো বাড়িয়ে দেয়। মোসলে-তে একটা টালি খোলায় ২৪ বছর বয়সের এক যুবতী নারী ২টি ছোট ছোট বালিকার সাহায্যে দৈনিক নিয়মিত ভাবে ২০০০ করে টালি তৈরি করত; মেয়ে দুটি তার জন্য মাটি বয়ে আনত ও টালিগুলিকে সাজিয়ে রাখত। তাদের প্রতিদিন ১০ টন মাটি ৩০ ফুট গভীর মাটির খাদ থেকে খাদের পিছল গা বেয়ে উপরে নিয়ে আসতে হত এবং তার পরে আরো ২১০ ফুট দূরে বয়ে নিয়ে যেতে হত। “নিদারুণ নৈতিক অধঃপতন ছাড়া কোন শিশুর পক্ষে টালি খোলার সংশোধনাগারের ভিতর দিয়ে পার হওয়া অসম্ভব।……..”যে অশ্লীল ভাষা শুনতে তারা তাদের কোমলতম বয়স থেকে অভ্যস্ত হয়, যে নোংরা কদর্য ও ন্যাক্কারজনক অভ্যাসের পরিবেশে তারা অজানিত ও অর্ধ-বন্য ভাবে বড় হয়, তা পরবর্তী জীবনে তাদেরকে করে তোলে উচ্ছংখল, উড়নচণ্ডে ও দুশ্চরিত্র। জীবন-যাপনের পদ্ধতিটাই হচ্ছে নৈতিক অধঃপতনের একটি ভয়াবহ উৎস। প্রত্যেক ঢালাইকার (মোল্ডার’ ), যে সব সময়েই একজন দক্ষ শ্রমিক এবং একটি গ্রুপের প্রধান, তাকে তার কুটিরে তার অধীন ৭ জন কর্মীকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হয়। তারা তার পরিবারের সদস্য হোক বা না হোক, সকলকে পুরুষ, বালক, বালিকা সকলকে—শুতে হয় ঐ একই কুটিরে, যাতে থাকে সাধারণতঃ দুটি ঘর, বিরল ক্ষেত্রে তিনটি ঘর এবং যে ঘরগুলি সবই একতলার এবং প্রায় আলো-হাওয়া শূন্য। সারা দিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরে এই লোকগুলি হয়ে পড়ে এত অবসন্ন যে স্বাস্থ্যের বা পরিচ্ছন্নতার বা। শালীনতার কোনো বিধি-নিয়ম তারা এতটুকুও মানতে পারে না। এই ধরনের অধিকাংশ কুটিরই অপরিচ্ছন্নতা, অশ্লীলতা ও ধুলো-ময়লার তোশাখানা।………এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পাপ এই যে, এতে নিযুক্ত করা হয় তরুণী মেয়েদের এবং শিশুকাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের দৃঢ় ভাবে বেঁধে রাখা হয় সবচেয়ে লম্পট এক দঙ্গলের সঙ্গে। তারা যে মেয়ে, প্রকৃতি তাদের তা শেখাবার আগেই, তারা হয়ে ওঠে একদল বেয়াড়া ‘ছেলে’, যাদের মুখে সব সময়েই লেগে আছে খারাপ কথা। পরনে কয়েক টুকরো ন্যাকড়া, হাঁটুর উপর পা অনেকটাই নগ্ন, চুল ও মুখ ময়লায়। মাখা—এই মেয়েরা শালীনতা ও সংকোচের সমস্ত অনুভূতিকে অবজ্ঞাভরে ঝেড়ে ফেলে। খাবার সময়ে তারা তারা মাঠের মধ্যে সটান শুয়ে পড়ে, বা কাছের কোন খালে ছেলেদের স্নান করার দৃশ্য দেখে। সারা দিনের ভারি কাজের শেষে অপেক্ষাকৃত ভাল জামা-কাপড় পরে পুরুষদের সঙ্গ ধরে সরাইখানায় যায়। এই সমগ্ৰ শ্ৰেণীটির মধ্যে যে শিশুকাল থেকে শুরু করে বাকি জীবন-ভর মাত্রাহীন অমিতাচারের প্রকোপ দেখা যাবে, তা তো স্বাভাবিক। সবচেয়ে খারাপ জিনিস এই যে, ইট প্রস্তুতকারীরা নিজেরাই নিজেদের সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে একটু ভাল এমন একজন সাউদলফিল্ড-এর এক যাজককে বলেছিল, মহাশয়, ইট-ওয়ালার মত শয়তানকে উপরে টেনে তোলার, ভাল কবার চেষ্টা করুন।”[১০]
