.
অষ্টম পরিচ্ছেদ–ম্যানুফ্যাকচার, হস্তশিল্প, ও গৃহ-শিল্পে আধুনিক শিল্প কর্তৃক সংঘটিত বিপ্লব
ক. হস্তশিল্প ও শ্রম-বিভাগের উপরে ভিতিশীল সহযোগের অবসান।
হস্তশিল্পের উপরে ভিত্তিশীল সহযোগের এবং হস্তশিল্প-শ্রমের বিভাজনের উপরে ভিত্তিশীল ম্যানুফ্যাকচারের অবসান মেশিনারি কিভাবে ঘটায় আমরা তা দেখছি। প্রথম ধরনের একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে ফসলকাটাই যন্ত্র (মোইং মেশিন’ ); ফসল-কাটা কর্মীদের মধ্যে যে সহযোগ, এই যন্ত্র তার স্থান দখল করে নেয়। দ্বিতীয় ধরনের একটি জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হচ্ছে সুচ তৈরির যন্ত্র (নিডল-মেকিং মেশিন’)। অ্যাডাম স্মিথের তথ্যানুসারে, তার সময়কালে ১০ জন মানুষ সহযোগের ভিত্তিতে তৈরি করত দিনে ৪৮,০০০-এরও বেশি সুচ। অন্য দিকে, একটি মাত্র সুচ তৈরির মেশিন ১১ ঘণ্টার একটি কাজের দিনে তৈরি করে ১,৪৫,০০০-এরও বেশি সুচ। একজন মহিলা বা একজন বালিকা তদারক করে এইরকম চারটি মেশিন; সুতরাং দিনে উৎপাদন করে প্রায় ৬,০০,০০০ সুচ এবং সপ্তাহে ৩০,০০,০০০-এরও বেশি।[১] যখন তা সহযোগের বা ম্যানুফাকচারের স্থান দখল করে, তখন একটি একক মেশিন নিজেই হতে পারে একটি হস্তশিল্প-জাতীয় শিল্পের ভিত্তি। কিন্তু হস্তশিল্পে এই ধরনের প্রত্যাবর্তন কারখানা-ব্যবস্থায় অতিক্রমণ ছাড়া কিছুই নয়, যার আবির্ভাব ঘটে তখনি যখন মেশিন চালানোর জন্য মানুষের পেশির স্থলাভিষিক্ত হয় বাষ্প বা জলের মত কোন যান্ত্রিক শক্তি। এখানে সেখানে, কিন্তু কেবল কিছুকালের জন্যই, একটি শিল্প ক্ষুদ্র আয়তনে, যান্ত্রিক শক্তির সাহায্যে চালিত হতে পারে। এটা সংঘটিত হয় বাম্পশক্তি ভাড়া করার মাধ্যমে, যেমন করা হয় বার্মিংহামের শিল্পগুলিতে কিংবা ছোট ঘোট ক্যাকেরিক ইঞ্জিনের মাধ্যমে, যেমন করা হয় বয়নের (উইভিং-এর) কয়েকটি শাখায়।[২] কভেন্টি, রেশম-বয়ন শিল্পে “কুটির কারখানা”র পরীক্ষা যাচাই করা হয়েছিল। সারি সারি কুটির-বেষ্টিত একটি চত্বরের কেন্দ্রস্থলে একটি ইঞ্জিন-ঘর তৈরি করা হয়েছিল এবং ঐ কুটিগুলির মধ্যে অবস্থিত ‘লুম’গুলির সঙ্গে ‘শ্যাফট’-এর সাহায্যে সেগুলিকে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ‘লুম’-পিছু একটা টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়েছিল। লুম কাজ করুক আর নাই করুক ভাড়া দিতে হত প্রতি সপ্তাহে। প্রত্যেকটি কুটিরে ছিল ২-৬টা করে লুম; কতকগুলির মালিক ছিল তাঁতীরা নিজেরাই, কতকগুলি আনা হয়েছিল ধারে এবং কতকগুলি আনা হয়েছিল ভাড়ার ভিত্তিতে। এই কুটির-কারখানাগুলির সঙ্গে নিয়মিত কারখানাগুলির সংগ্রাম চলে ১২ বছর ধরে। এর পরিণতি ঘটে ৩…টি কুটির-কারখানারই সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্তিতে।[৩] যেখানে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটির প্রকৃতিতে বৃহদায়তন উৎপাদনের আবশ্যিকতা ছিলনা, সেখানে গত কয়েক দশকে নোতুন যেসব শিল্প গড়ে উঠেছে, যেমন লেফাফা-তৈরি, ইস্পাতের কলম তৈরি ইত্যাদি, সেখানেই, সাধারণ নিয়ম অনুসারে, তা প্রথম পার হয়েছে হস্তশিল্পের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এবং পরে ম্যানুফ্যাকচারের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে কারখানা-পর্যায়ে অতিক্রমণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অধ্যায় হিসাবে। যেখানে ম্যানুফ্যাকচারের দ্বারা জিনিসটির উৎপাদন কেবল এক প্রস্ত ক্রমান্বয়ী প্রক্রিয়া দিয়ে গঠিত নয়, বহুসংখ্যক সংলগ্ন প্রক্রিয়া দিয়ে গঠিত, সেখানে এই অতিক্রমণ খুবই দুরূহ। ইস্পাত-কলম তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠার পথে এই ঘটনাটা বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়ে ছিল। যাইহোক, প্রায় ১৫ বছর আগে একটি মেশিন আবিষ্কৃত হয় যা একই সঙ্গে ছটি বিচ্ছিন্ন কর্ম-প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। প্রথম ইস্পাত-কলমটিকে সরবরাহ করেছিল হস্তশিল্প-ব্যবস্থা, ১৮২০ সালে, প্রতি গ্রস। পাউণ্ড ৪ শিলিং দামে; তারপরে সেগুলিকে সরবরাহ করে ম্যানুফ্যাকচার-ব্যবস্থা প্রতি গ্রস’ ৮ শিলিংএ; আর আজ কারখানা-ব্যবস্থা সেগুলিকে সরবরাহ করে প্রতি গ্রস ২ শিলিং ৬ পেলে।[৪]
.
খ. ম্যানুফ্যাকচার ও গৃহ-শিজের উপরে কারখানাখ্যার প্রতিক্রিয়া
কারখানা-ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে এবং তার সহগামী কৃষি-ব্যবস্থায় বিপ্লবের সঙ্গে, শিল্পের অন্যান্য শাখায় উৎপাদন কেবল বিস্তার লাভই করেনা, তার চরিত্রও বদলে দেয়। কারখানা-ব্যবস্থায় অনুসৃত নীতিই হচ্ছে উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে তার সংগঠনী পর্যায়সমূহে বিশ্লেষণ করা এবং এই ভাবে উপস্থাপিত সমস্যাগুলিকে ‘মেকানিক্স, ‘কেমিস্ত্রি এবং তাবৎ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রয়োগের দ্বারা সমাধান করা; এই নীতিটিই হয়ে ওঠে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ামক নীতি। অতএব, মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারকারী শিল্পে নিজেকে সবলে অনুপ্রবিষ্ট করায় প্রথমে একটি প্রত্যংশ (ডিটেল) প্রক্রিয়ার জন্য, পরে আরেকটির জন্য। এই ভাবে, পুরান শ্রম বিভাজনের ভিত্তিতে গঠিত তাদের সংগঠন-রূপ অখণ্ড স্ফটিকটি খণ্ড হয়ে যায় এবং নিরন্তর পরিবর্তনের পথ করে দেয়। এ থেকে স্বতন্ত্র ভাবেও, যৌথ শ্রমিকটির গঠনবিন্যাসে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটে যায় সম্মিলিত ভাবে কর্মরত ব্যক্তিদের পরিবর্তন। ম্যানুফ্যাকচার-আমলের সঙ্গে প্রতি-তুলনায়, থেকে শ্রম-বিভাজন গড়ে ভোলা হয়, যেখানেই সম্ভব সেখানেই, মহিলাদের, সব বয়সের শিশুদের ও অদক্ষ শ্রমিকদের নিয়োগের ভিত্তিতে, এক কথায়, সস্তা শ্রমের ভিত্তিতে ইংল্যাণ্ডের যে যে ভাষায় একে বৈশিষ্ট্য-সূচক ভাবে অভিহিত করা হয়। মেশিনারি নিয়োগ করুক আর নাই করুক, সমস্ত বৃহদায়তন উৎপাদনের ক্ষেত্রেই যে এটা চলছে, কেবল তাই নয়, তথাকথিত গৃহ-শিল্পের ক্ষেত্রেও এটা চলছে, তা শ্রমিকের নিজের ঘরেই চালু থাক বা ছোট ছোট কর্মশালাতেই চালু থাক। আধুনিক গৃহ-শিল্পের নামটি ছাড়া আর কিছুই পুরানো প্রথার গৃহ-শিল্পের সঙ্গে অভিন্ন নেই—পুরানো প্রথার গৃহ-শিল্পের অস্তিত্বের পূর্বশর্ত ছিল স্বতন্ত্র শহুরে হস্তশিল্প, স্বতন্ত্র কৃষক-খামার, এবং সর্বোপরি, শ্রমিক ও তার পরিবারের বাসের জন্য একটি বাসা-বাটি। পুরানো প্রথার শিল্প এখন রূপান্তরিত হয়েছে কারখানার একটি বহির্বিভাগে ম্যানুফ্যাক্টরিতে (শ্রম কারখানায়) বা ওয়্যারহাউজে (গুদোম-ঘরে)। কারখানা-শ্রমিক, ম্যানুফ্যাকচার শ্রমিক এবং হস্তশিল্প-শ্রমিক—যাদেরকে সে দলে দলে একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে এবং প্রত্যক্ষ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদেরকে ছাড়াও, মূলধন অদৃশ্য সূত্রের মাধ্যমে আরো একটি সেনাবাহিনীকে গতিশীল করে; সেই বাহিনীটি হল ঘরোয়া শিল্পগুলির কর্মীবৃন্দ, যারা বাস করে বড় বড় শহরে এবং ছড়িয়ে থাকে সারা দেশ জুড়ে। একটি দৃষ্টান্ত : লণ্ডনভেরিতে অবস্থিত মেসার্স টিল্লির শার্ট-কারখানা : কারখানাটি নিজের ভিতরেই খাটায় ১,০০০ শ্রমিক; ছাড়াও খাটায় আরো ৯০০০ মানুষ, যারা ছড়িয়ে আছে দেশের সর্বত্র এবং কাজ করেছে নিজ নিজ বাড়িতে।[৫]
