উৎপাদনে যখন স্বাধীনভাবে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগসুত্ৰ স্থাপিত হবে এবং তার নিয়ন্ত্ৰণ চলবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে সচেতনভাবে, তার আগে বাস্তব উৎপাদন পদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজে জীবনধারা থেকে কুঞ্জটিকার আবরণ ও অপসারিত হবে না। অবশ্য, সমাজে তার জন্য চাই উপযুক্ত ক্ষেত্র-প্রস্তুতি এবং অনুকূল অবস্থার স্বাক্ট। আবার তারও উদ্ভব ঘটবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুদীর্ঘ এবং যন্ত্রণাময় ক্রমবিকাশের ভিতর দিয়ে।
রাষ্ট্ৰীয় অর্থশাস্ত্র, অবশ্য, মূল্য এবং তার পরিমাণ বিশ্লেষণ করেছে, তা সে বিশ্লেষণ যতই অসম্পূর্ণ হোক না কেন(৬); এই দুটো রূপের মূলে কি আছে। অর্থনীতি তাও আবিষ্কার করেছে। কিন্তু অর্থশাস্ত্র এ প্রশ্ন একবারও জিজ্ঞাসা কৰ্বেনি যে কেন শ্রমোৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য দ্বারা শ্রমের পরিচয় দেওয়া হয় এবং মূল্যের পরিমাণ বোঝানো হয় শ্ৰম-সময় দ্বারা।(৭) এই দুটো সমীকরণের মধ্যে নিঃসন্দেহে এই সত্যই চিহ্নিত হয়ে আছে যে এগুলো যে সমাজের জিনিস, সে সমাজে উৎপাদনের পদ্ধতির উপর মানুষের কোনো কর্তৃত্ব নেই, উৎপাদনের পদ্ধতিই সেখানে মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে। কিন্তু বুর্জোয়া অৰ্থশাস্ত্রীরা মনে করেন যে উৎপাদনক্ষম শ্রমের মতই ঐ সমীকরণ স্বতঃসিদ্ধ প্ৰাকৃতিক নিয়ম। কাজেই গীর্জার পাদ্ৰীরা খ্রীস্টধর্মের রূপের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী ধৰ্মসমূহকে যে-চোখে দেখেন, বুর্জোয়া সামাজিক উৎপাদনের পূর্ববর্তী সামাজিক উৎপাদনের রূপগুলিকে বুর্জোয়া পণ্ডিতেরা সেই চোখেই দেখে থাকেন।(৮)
পণ্যের ভিতর যে কুহেলিকা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং শ্রমের সামাজিক চরিত্র যে ভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যক্ত হয়, তা কোন কোন অর্থনীতিবিদদের মনে কতখানি বিভ্ৰান্তি উৎপাদন করেছে, তা বেশ বোঝা যায় যখন দেখি যে বিনিময়-মূল্য রচনার প্ৰাকৃতিক অবদান কতখানি এই নিয়েও তারা শুষ্ক এবং ক্লান্তিকর বিতর্কে মেতে উঠেছেন। যেহেতু বিনিময়-মূল্য হচ্ছে প্ৰাকৃতিক পদার্থের মধ্যে কি পরিমাণ শ্ৰম দেওয়া হয়েছে তা প্ৰকাশ করবার একটা নির্দিষ্ট সামাজিক পদ্ধতি, সেহেতু বিনিময়মূল্য নির্ধারণে প্ৰকৃতির কোন ভূমিকা নেই, যেমন বিনিময়ের ধারা নির্ধারণেও তার কোন ভূমিকা নেই।
যে উৎপাদন-পদ্ধতিতে উৎপন্ন দ্রব্য পণ্যরূপ ধারণ করে, অর্থাৎ সরাসরি বিনিময়ের জন্য উৎপন্ন হয়, তা বুর্জোয়া উৎপাদনের সর্বাপেক্ষা সাধারণ এবং ভ্ৰাণাকার রূপ। তাই ইতিহাসে তার আবির্ভাব ঘটেছে অনেক আগেই, যদিও আজকালকার মতো এমন আধিপত্যশীল ও বিশিষ্ট চরিত্র তখন তার ছিল না। ক্লাজেই তখন তার পৌত্তলিক চরিত্র উপলব্ধি করা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। কিন্তু যখন আমরা তাকে আরো মূর্তরূপে দেখি, তখন এই বাহ সরলতাটুকুও বিলুপ্ত হয়ে যায়। অর্থ ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভ্ৰান্ত ধারণার উৎপত্তি হলো কোথা থেকে? সোনা এবং রূপে অৰ্থরূপে ব্যবহৃত হবার সময় অর্থবিনিময়ের ব্যবস্থার মধ্যে উৎপাদনকাৰীদেব সামাজিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলেনি, ফুটিয়ে তুলেছে অদ্ভুত সামাজিক গুণের অধিকারী প্রাকৃতিক পদার্থরূপে। যে আধুনিক অর্থশাস্ত্র অর্থব্যবহারের ব্যবস্থাকে এত ঘূণার চোখে দেখে, তার অন্ধবিশ্বাস কি মূলধনের আলোচনার মধ্যে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি? খাজনার উৎপত্তি সমাজে নয়, জমিতে-প্ৰকৃতি-তন্ত্রীদের (ফিজিওক্র্যাটদের) এই ভ্ৰান্ত ধারণ; অর্থশাস্ত্ৰ কদিন হলো বর্জন করেছে?
কিন্তু পরের কথা পরে হবে, আপাততঃ আমরা পণ্যরূপের আর একটা উদাহরণ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি। পণ্যেত্ব যদি ভাষা থাকতো। তবে বলতে; আমাদের ব্যবহারমূল্য মানুষের চিত্তাকর্ষণ করব মতো একটি জিনিস হতে পারে। এটা আমাদের কোন বস্তুগত অংশ নয়। বস্তুরূপে আমাদের যা আছে তা হচ্ছে আমাদের মূল্য। পণ্যস্বরূপ আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক থেকেই তার প্রমাণ মেলে।! নিজেদের পরস্পরের চোখে আমরা বিনিময় মূল্য ছাড়া আর কিছুই নই। এবার শুনুন অর্থনীতিবিদদের মুখ দিয়ে পণ্য কি কথা বলায় :
“মূল্য (অর্থাৎ বিনিমযযুল্য) হচ্ছে জিনিসের ধনসম্পদ (অর্থাৎ ব্যবহার মূল্য)। মানুষের গুণ। এই অর্থে মূল্য অবশ্যই বিনিময়-সাপেক্ষ, ধনসম্পদ। কিন্তু তা নয়।( “ধনসম্পদ (ব্যবহারমূল্য) হল মানুষের গুণ, মূল্য হল পণ্যের গুণ। একজন মানুষ বা একটি সম্প্রদায় ধন্যবান। কিন্তু একটি মুক্ত বা হীরা হল মূল্যবান। — মুক্তা বা হীরা হিসাবেই একটি মুক্ত বা একটি হীরা মূল্যবান”(১০) এ পর্যন্ত কোন রসায়নবিজ্ঞানীর পক্ষেই সম্ভব হয়নি একটি মুক্ত বা একটি হীরার মধ্যকার বিনিময়মূল্য আবিষ্কার করা। যাই হোক এই রাসায়নিক উৎপাদনটির অর্থনৈতিক আবিস্ক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে কোন সামগ্রীর ব্যবহার মূল্য তার বস্তুগত গুণাবলী থেকে নিরপেক্ষ এবং ঐ সামগ্ৰীটিই তার ব্যবহার মূল্যের অধিকারী, অপর পক্ষে তার মূল্য কিন্তু বস্তু হিসেবেই তারই অংশ বিশেষ। এটা আরও সমথিত হয় এই বিশিষ্ট ঘটনার দ্বারা যে কোন সামগ্রীর ব্যবহার মূল্য বাস্তবায়িত হয় বিনিময়ের মাধ্যম ছাড়াই, তা বাস্তবায়িত হয়। ঐ সামগ্রী এবং মানুষের মধ্যে প্ৰত্যক্ষ সম্পর্কের দ্বারা কিন্তু, অন্য দিকে, তার মূল্য কিন্তু বাস্তবায়িত হয়। কেবল বিনিময়ের মাধ্যমেই অর্থাৎ একটি সামাজিক প্রক্রিয়ার দ্বারা। এই প্রসঙ্গে কার না মনে পড়ে আমাদের বন্ধুবর ডগবেরির কথা তার প্রতিবেশী সীকোলকে ডেকে বলেছিল, “লক্ষ্মীমন্ত হওয়া ভাগ্যের দান, কিন্তু লেখাপড়া আসে স্বভাব থেকে।”(১১)
