এখন একবার আলোকস্মাত রবিনসনের দ্বীপ থেকে ইউরোপের তিমিরাচ্ছন্ন মধ্যযুগের দিকে চোখ ফেরানো যাক। এখানে স্বাধীন মানুষটির পরিবর্তে পাই ভূমিদাস আর ভূস্বামী, জায়গীরদার আর সামন্তরাজ, শিস্য এবং পাত্রী; প্রত্যেকেই পরনির্ভরশীল। উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক এখানে ব্যক্তিগত পরাধীনতা দ্বারা চিহ্নিত, এই উৎপাদনের ভিত্তিতে সমাজের আর যা কিছু গড়ে উঠেছে তাবুও এই বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যেহেতু ব্যক্তিগত পরাধীনতা এই সমাজের ভিত্তি, সুতরাং শ্রমের এবং শ্রমজাত দ্রব্যের পক্ষে এখানে বাস্তবতাবজিত কোন পৌত্তলিক রূপ গ্ৰহণ করার আবশ্যকতা নেই। এখানকার সামাজিক আদান প্ৰদানে সরাসরি শ্রম দিয়ে দ্রব্য পেতে হয়। শ্রমের প্রত্যক্ষ সামাজিক রূপ। এখানে তার বিশিষ্ট স্বাভাবিক রূপে বিরাজিত, পণ্যময় সমাজের মতো নিবিশিষ্ট সাধারণ রূপে নয়। পণ্যপ্ৰসু শ্রমের মত বাধ্যতামূলক শ্রমও সময় দিয়ে ঠিকমতো মাপ হয়; কিন্তু প্ৰত্যেক ভূমিদাসই জানে তার ভূস্বামীকে সে যত শ্ৰম দিয়েছে তা তার ব্যক্তিগত শ্রমশক্তির একটি নিদিষ্ট অংশ। পুরোহিতকে যে প্ৰণামী দিতে হয় তা তার আশীর্বাদের চেয়ে অধিকতর বাস্তব। এই সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিকা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা যাই হোক না কেন, শ্রমরত ব্যক্তি-সমূহের সামাজিক সম্পর্ক এখানে সর্বদাই তাদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্করূপেই দেখা দেয়, শ্ৰমোৎপন্ন দ্রব্যসমূহের ভিতরকার সামাজিক সম্পর্কের ছদ্মবেশ ধারন করে না।
সমবেত এবং প্রত্যক্ষভাবে সহযুক্ত শ্রমের উদাহরণ দেখবার জন্য সমস্ত জাতির সভ্যতার ইতিহাসের প্রথমাবস্থায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিকশিত সেই শ্রমরূপের দিকে ফিরে যাবার কোন সুযোগ আমাদের নেই।(৫) আমাদের হাতের কাছে একটি উদাহরণ আছে, সেটি হচ্ছে কৃষক পরিবারের মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক নিয়মে গঠিত শিল্প, যা থেকে শস্য, গবাদি পশু, সুতো, ছিট এবং পোশাক-পরিচ্ছদ তৈরী হয় নিজ পরিবারের ব্যবহারের জন্য। এই সমস্ত দ্রব্যই পরিবারের নিজস্ব শ্ৰমোৎপন্ন দ্রব্য কিন্তু পরিবারস্থ ব্যক্তির কাছে এগুলো পণ্য নয়। এই সমস্ত দ্রব্যের উৎপাদনে যে বিভিন্ন ধরনের শ্ৰম আছে, যথা ভূমিকৰ্ষণ, পশুপালন, সুত্রবয়ন, বস্ত্রবয়ন এবং দেহবাস সীবন প্ৰভৃতি প্ৰত্যেকটিই অবিকল প্ৰত্যক্ষ সামাজিক কাজ; কারণ, এগুলি হলো পরিবারের ভিতর স্বতঃস্ফুর্ত শ্রম-বিভাগের অন্তর্ভুক্ত, ঠিক যেমন পণ্যময় সমাজেও স্বতস্ফুর্তভাবে বিকশিত শ্রমবিভাগ। পরিবারের ভিতর কে কোন শ্রম কত পরিমাণে করবে, তা নির্ধারিত হয়। যেমন বয়স এবং স্ত্রী-পুরুষ ভেদ অনুসারে, তেমনি ঋতুভেদে প্রাকৃতিক অবস্থার বৈচিত্র অনুযায়ীও। এক্ষেত্রে পরিবারস্থ প্রত্যেক ব্যক্তির শ্রমশক্তি, স্বভাবতই পরিবারের সমগ্ৰ শ্ৰমশক্তির একটি অংশ; সুতরাং, শ্ৰমের জন্য কে কত সময় ব্যয় করল সেই সময় দিয়ে যখন সবার শ্রমের পরিমাপ করা হয় তখন স্বভাবতই শ্রমের সামাজিক চরিত্র মেনে নেওয়া হয়েছে।
এবার ছবিটা একটু পরিবর্তন করে ধরে নেওয়া যাক যে একাধিক স্বাধীন ব্যক্তি সমবেত হয়ে একটা গোষ্ঠী তৈরী করেছে, তারা যে সমস্ত উপকরণ নিয়ে উৎপাদন চালাচ্ছে তারা সমবেতভাবে তার মালিক, এই সমস্ত ব্যক্তি তাদের নিজ নিজ শ্ৰমশক্তি সচেতনভাবে সমগ্ৰ গোষ্ঠীর সমবেত শক্তিরূপে প্রয়োগ করছে। এখানে বিবিনসনের শ্রমের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই বর্তমান, পার্থক্য কেবল এই যে এদের শ্রম ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক, রবিনসন যা কিছু তৈরী করেছে তা-ই তার ব্যক্তিগত শ্রমের ফল, সুতরাং তা শুধুমাত্র তার নিজস্ব ভোগের বস্তু। আমাদের ঐ গোষ্ঠীর সমস্ত দ্রব্য সামাজিক পদার্থ। তার একাংশ ব্যবহৃত হয় পুনরায় উৎপাদনের জন্য এবং তার সামাজিক সামগ্ৰী থাকে অব্যাহত। কিন্তু অপর অংশটি সদস্যদের জীবনধারণের জন্য ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এদের মধ্যে এই অংশের ভাগ-বাটোয়ারা প্রয়োজন। এই ভাগ-বাটোয়ারা কিভাবে হবে তা নির্ভর করে গোষ্ঠীর উৎপাদন কিভাবে সংগঠিত হয়েছে এবং উৎপাদনকারীরা ঐতিহাসিক ক্ৰমবিকাশ সুত্রে কতটা অগ্রসর হয়েছে তার উপরে। কেবল পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে তুলনা করবার জন্য ধরে দেওয়া যাক যে প্ৰত্যেকটি উৎপাদনকারী জীবনধারণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ঠিক সেই অনুপাতে প্ৰাপ্য পাচ্ছে, যে অনুপাতে সে শ্ৰমসময় দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে শ্রমসময়ের ভূমিকা দ্বিবিধ। একটা নির্দিষ্ট সামাজিক পরিকল্পনা অনুসারে তার বণ্টন গোষ্ঠীর বিভিন্ন কাজ এবং বিভিন্ন অভাব এর সঙ্গে একটা অনুপাত রক্ষা করে। চলে। সঙ্গে সঙ্গে, এই শ্ৰম-সময় দিয়েই ঠিক করা হয় যে গোষ্ঠীর সমগ্র শ্রমের কতটা অংশ একজন দিয়েছে এবং যে সমস্ত জিনিস সকলেরই ভোগে লাগবে তার কতটা অংশ এক ব্যক্তির পাওনা। তাদের শ্রম এবং শ্রমোৎপন্ন দ্রব্য এই উভয় বিষয়েই উৎপাদনকারীদের সামাজিক সম্পর্ক এখানে সম্পূর্ণ সরল এবং বোধগম্য এবং কেবল উৎপাদনেই নয়, বণ্টনেও।
ধর্মীয় জগৎটা বাস্তব জগতেরই প্ৰতিফলন। পণ্যোৎপাদন যে সমাজের ভিত্তি, সে সমাজে উৎপাদনকারীরা শ্ৰমোৎপন্ন দ্রব্যকে পণ্য এবং মূল্যস্বরূপ ব্যবহার করে নিজেদের সামাজিক সম্পর্ক রচনা করে বলে তাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত শ্ৰম সমজাতিক মনুষ্যশ্রমে পরিণত হয়, এরূপ সমাজের সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ধর্ম হল অমূর্ত মানববন্দনার বাণী প্রচারক খ্ৰীষ্টধর্ম, বিশেষতঃ তার বুর্জোয়। যুগের রূপগুলি, যেমন প্রটেস্টাণ্ট মতবাদ, ঈশ্বরবাদ প্রভৃতি। আমরা জানি যে প্রাচীন এশীয় উৎপাদনপদ্ধতিতে এবং অন্যান্য প্ৰাচীন উৎপাদন পদ্ধতিতে শ্রমোৎপন্ন দ্রব্যের পণ্যে রূপান্তর এবং তার ফলে মানুষেরও পণ্যে রূপান্তরণ সমাজে গৌণ স্থান লাভ করেছিল, অবশ্য আদিম গোষ্ঠীসমাজগুলি যতই ভাঙনের মুখে এগোতে লাগল ততই পণ্যে রূপান্তরণের এই ব্যাপারটা বেশী বেশী গুরুত্ব লাভ করতে থাকল! বাণিজ্য প্ৰধান জাতি বলতে যথার্থ অর্থে যে-সব জাতিকে বোঝায় তাদের অস্তিত্ব ছিল প্ৰাচীন জগতের ফাঁকে-ফাঁকে, ইণ্টারমুণ্ডিয়াতে এপিকিউরাসের দেবদেবীর মতো অথবা পোলিশ সমাজের ফাঁকে ফাঁকে অবস্থিত ইহুদীদের মতো। প্ৰাচীন সমাজে উৎপাদনের সেই সামাজিক সংগঠনগুলি ছিল বুর্জোয়া সমাজের তুলনায় অত্যন্ত সরল এবং স্বচ্ছ। কিন্তু তার ভিত্তি ছিল ব্যক্তি-মানুষের অপরিণত বিকাশের উপরেযে মানুষ আদিম গোষ্ঠীসমাজের শহরবাসীদের সঙ্গে তখনো ছিন্ন করতে পারেনি। তার নাড়ীর বন্ধন অথবা তার ভিত্তি ছিল সরাসরি বশ্যতামূলক সম্পৰ্কসমূহের উপরে। এই ধরনের সংগঠনের উদ্ভব এবং অস্তিত্ব কেবল তখনি সম্ভব, যখন শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি একটি নিচুস্তরের উপরে উঠতে সক্ষম হয়নি এবং তার ফলে বাস্তব জীবনে মানুষে মানুষে সম্পর্ক এবং মানুষে প্ৰকৃতিতে সম্পর্কও অনুরূপভাবে সংকীর্ণ। এই সংকীর্ণতার প্রতিফলন প্ৰাচীনকালের প্রকৃতি পূজায় এবং অন্যান্য লৌকিক ধর্মমতে। যাই হোক বাস্তব জগতের ধর্মীয় প্রতিক্ষেপণের চূড়ান্ত অবসান ঘটতে পারে। কেবল তখনি যখন দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সম্বন্ধের ভিতর দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পৰ্কট হয়ে দাঁড়াবে সম্পূৰ্ণ বোধগম্য এবং যুক্তিসঙ্গত।
