তুলা দুর্ভিক্ষের ইতিহাস এত বৈশিষ্ট্য-সুচক যে একটু আলোচনা না করে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ১৮৬০ ও ১৮৬১ সালে বিশ্বের বাজারগুলির অবস্থা সম্পর্কে যেসব ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা থেকে আমরা দেখি যে সেই দুর্ভিক্ষটি এসেছিল কল-মালিকদের পক্ষে ঠিক সময়মত এবং কিছু পরিমাণে হয়েছিল তাদের পক্ষে সুবিধাজনক—একটা ঘটনা যা স্বীকৃত হয়েছিল ম্যাঞ্চেস্টার চেম্বার অব কমার্স-এর রিপোর্টে, পামারস্টোন এবং ডার্বি কর্তৃক ঘোষিত হয়েছিল পার্লামেন্টে এবং সমর্থিত হয়েছিল ঘটনাবলীর দ্বারা।[১১] কোনো সন্দেহ নেই যে, ১৮৬১ সালে যুক্তরাজ্যে ২৮৮৭টি তুলা কলের মধ্যে অনেকগুলি ছিল ছোট আকারে। মিঃ রেডগ্রেড-এর রিপোর্ট অনুসারে তাঁর জেলার অন্তর্ভূক্ত ২,১০৯টি মিলের মধ্যে ৩৯২টি অর্থাৎ শতকরা ১৯টি প্রত্যেকে নিয়োগ করত ১০ অশ্বশক্তিরও কম; ৩৪৫টি অর্থাৎ শতকরা ১৬টি প্রত্যেকে ২০ অশেরও কম; এবং ১৩৭২টি প্রত্যেকে ২০ অশ্ব থেকে বেশি।[১২] ছোট মিলগুলির অধিকাংশই ছিল কাপড় বোনার শেভ; নির্মিত হয়েছিল ১৮৫৮ সালের পরে সমৃদ্ধির সময়ে; নির্মাতারা বেশির ভাগই ছিল ফাটকাবাজ, যাদের মধ্যে কেউ যোগাত সুতো, কেউ মেশিনারি, কেউবা বাড়িঘর; এগুলি চালাত তত্ত্বাবধায়কেরা বা অন্যান্য স্বল্প বিত্তের লোকজনেরা। এই সব ছোট ছোট উৎপাদনকারীরা বেশির ভাগই কোণঠাসা হয়ে গেল। একই অদৃষ্ট তাদের বাণিজ্যিক সংকটে পর্যুদস্ত করত, যদি তুলা-দুর্ভিক্ষ তা প্রতিহত না করত। যদিও তারা ছিল, উৎপাদনকারীদের মোট সংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, তবু তাদের মিলগুলিতেও বিনিয়োজিত ছিল তুলা-শিল্পের মোট মূলধনের একটি আরো অল্পতর অংশ। কত মিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার প্রামাণ্য হিসাবে দেখা যায়, ১৮৬২ সালে ৬৩ শতাংশ শিওল, ৫৮ শতাংশ লুম কর্মরত ছিল। এটা হল সমগ্রভাবে তুলা-শিল্পের পরিসংখ্যান, বিশেষ বিশেষ জেলায় যার কিছুটা অদল-বদল করে নিতে হয়। কেবল খুব স্বল্পসংখ্যক মিলই পুরো সময় (সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করেছে, বাকি সব কাজ করেছে মাঝে মাঝে। এমনকি সেই স্বল্পসংখ্যক মিল, যেগুলি পুরো সময় কাজ করেছে এবং প্রথানুসারে একক-পিস হারে ( পিস-রেটে) মজুরি দিয়েছে, সেগুলিতেও শ্রমিকদের মজুরিখারাপ তুলো ভালো তুলোর জায়গা নেবার দরুন, মিশরীয় তুলো সি-আইল্যাণ্ডের তুলোর জায়গা (সূক্ষ্ম সুতো কাটার মিলগুলিতে), সুরাটের তুলো মার্কিন ও মিশরীয় তুলোর জায়গা এবং ফালতু ও সুরাটি মেশাল তুলে খাঁটি তুলোর জায়গা নেবার দরুন কমে গিয়েছিল। সুরাটি তুলোর ক্ষুদ্রতর তত্ত্ব এবং তার অপরিচ্ছন্ন অবস্থা, সুতোর অধিকতর ভঙ্গুরতা এবং টানা সুতোয় আঠা মাখাবার জন্য ময়দার বদলে যাবতীয় ভারি উপাদানের ব্যবহার—এই সবকিছু মেশিনারির গতিবেগ, কিংবা একজন তাঁতী যতগুলি তঁত তদারক করতে পারে তার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছিল, মেশিনারির ত্রুটিজনিত শ্ৰম বেড়ে গিয়েছিল এবং উৎপাদনের মোট পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে একক-পিছু মজুরিও কমিয়ে দিয়েছিল। যখন সুটের তুলো ব্যবহার করা হত, তখন যে-শ্রমিক পুরো সময় কাজ করত, তার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াত ২০,৩০ কিংবা তারও বেশি শতাংশ। কিন্তু এ ছাড়াও, অধিকাংশ মিল-মালিক একক-পিছু মজুরির হারে ৫,, এবং ১০ শতাংশ ছাটাই করত। সুতরাং, যে সমস্ত শ্রমিক সপ্তাহে মাত্র ৩, ৩ বা ৪ দিনের জন্য অথবা দিনে ৬ ঘণ্টার জন্য নিযুক্ত হত, তাদের অবস্থা যে কী ছিল, তা আমরা ধারণা করে নিতে পারি। এমনকি ১৮৬৩ সালে, তুলনামূলক ভাবে অবস্থার উন্নতি শুরু হবার পরেও সুতো কাটুনি ও তাঁতীদের মজুরি ছিল ৩শি ৪পে, ৩শি ১০পে, ৪ শি ৬ পে এবং এশি ১ পে।[১৩] অবশ্য, এই শোচনীয় পরিস্থিতিতেও মনিবদের উদ্ভাবনী উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে যায়নি; তা সক্রিয় ছিল মজুরি থেকে কিছু কিছু ছাট-কাট করার প্রচেষ্টায়। এই ছাটকাট কিছু পরিমাণে করা হত তৈরি মালে ত্রুটি থাকার দণ্ড হিসাবে, যে-ত্রুটির আসল কারণ কিন্তু খারাপ তুলা বা অনুপযুক্ত মেশিনারি। অধিকন্তু, যেখানে মিলমালিক নিজেই শ্রমিকদের কুঁড়েঘরগুলির মালিক, সেখানে সে তাদের শোচনীয় মজুরি থেকে ভাড়া কেটে রেখে নিজেকেই তা দিত। মিঃ রেডগ্রেভ আমাদের এমন স্বয়ংক্রিয় তদারককারীদের (একজোড়া স্বয়ংক্রিয় মিউল যারা তদারক করে, তাদের কথা বলেছেন, যারা এক পক্ষ কালের পুরো কাজের শেষে আয় করত ৮শি ১১পে, যা থেকে আবার মিল-মালিক কেটে নিত তার ঘর-তাড়া; অবশ্য, এই কেটে নেওয়া ঘর-ভাড়ার অর্ধেকটা আবার সে ফিরিয়ে দিত দান হিসাবে। তদারককারীরা পেত ৬শি ১১পে। ১৮৬২ সালের পরবর্তী অংশে অনেক জায়গায় স্বয়ংক্রিয় তদারককারীরা মজুরি পেত সপ্তাহে ৫শি থেকে ৯শি এবং তাঁতীরা পেত ২শি থেকে ৬শি।[১৪] এমনকি যখন কারখানাগুলি আংশিক সময় কাজ করত, তখনো বাড়িভাড়া শ্রমিকদের মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হত।[১৫] ব্যাংকাশায়ারের কোন কোন অঞ্চলে যে কোন রকমের দুর্ভিক্ষ হয়নি, তাতে বিস্ময়ের কোন কারণ নেই। কিন্তু এসব থেকেও বৈশিষ্ট্যসূচক ব্যাপারটি এই যে উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় এই যে, বিপ্লব ঘটল, তা ঘটল শ্রমিকদের বিনিময়ে। Experimenta in corpore vili, ব্যাঙের উপরে অ্যানাটমিস্ট ( অঙ্গ-ব্যবচ্ছেদকারীরা) যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়, আনুষ্ঠানিক ভাবে তেমনই চালানো হত। মিঃ রেডগ্রেভ বলেন, যদিও আমি কয়েকটি মিলের শ্রমিকদের সত্যকার আয়ের হিসাব দিয়েছি, তা থেকে এই সিদ্ধান্ত করা যায় না যে তারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ঐ একই পরিমাণ আয় করে থাকে। কল-মালিকদের নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরুন শ্রমিকদের দারুণ ঠা-নামার মধ্যে থাকতে হয়।……… বিভিন্ন জাতের তুলোর মেশালের গুণমানের দরুনও মজুরির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, কখনো এই হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে থাকে পূর্বতন আয়ের ১৫ শতাংশের মধ্যে এবং তার পরে এক সপ্তাহের মধ্যে তা নেমে যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে।[১৬] কেবল শ্রমিকের জীবন ধণর উপায়-উপকরণের বিনিময়েই এই সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হত না। ও পাঁচটি ইন্দ্রিয়কেও দণ্ড ভোগ করতে হত। “সুরাটি তুলে নিয়ে কাজ করার :- যাদের নিযুক্ত করা হত তাদের অভিযোগ ছিল অনেক। তারা আমাকে জানায় যে, তুলোর গাঁট খোলার সঙ্গে সঙ্গে এক অসহ দুর্গন্ধ বেলোয়, যাতে গা গুলিয়ে ওঠে। ……….‘মিক্সিং’, ‘বিলিং’; ও কার্ভিং ঘরগুলিতে যে ধুলো-ময়লা ছাড়ানো হয়, তা বায়ু চলাচলের পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, কাশির উদ্রেক করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস কষ্টকর করে তোলে। সুরাটি তুলোয় এমন এক রকম ময়লা থাকে যা এক ধরনের চর্মরোগ ঘটায়।……….তন্তু এত ছোট যে জান্তব ও উভয় প্রকারের আঠাই বিপুল পরিমাণে লাগাতে হয়।…….. ধুলোর জন্য ব্রংকাইটিসের প্রকোপ ঘটে। একই কারণে গলায় প্রদাহ ও ক্ষত খুব ব্যাপক। মাকুর ছিদ্র দিয়ে তাতী যখন পড়েন চুষে নেয়, তখন পড়েনটি বারবার ভেঙে যাবার দরুণ অসুস্থতা ও অজীর্ণতা দেখা দেয়। অন্য দিকে, ময়দার বিকল্পগুলি ছিল মিল-মালিকের কাছে একটি ‘ফচুনেটাস’ এর মানিব্যাগ-স্বরূপ-সেগুলি বাড়িয়ে দিয়েছিল সুতোর ওজন। সেগুলির দৌলতে ১৫ পাউণ্ড কাচামালের ওজন বোনার পরে দাড়াতে ২৬ পাউণ্ড।[১৭] ১৮৬৪ সালের ৩০শে এপ্রিলের জন্য কারখানা-পরিদর্শকের বিপোর্টে আমরা পাই : “এই উপকরণটি শিল্প এখন এমন এক মাত্রা পর্যন্ত কাজে লাগাচ্ছে, যা এমনকি কলংকজনক। আমি খুব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এমন একটি কাপড়ের কথা শুনেছি যার ৮ পাউণ্ড ওজন তৈরি হয়েছিল ৫৪ পাউণ্ড তুলল আর ২ পাউণ্ড আঠা দিয়ে; এবং আরো একটি কাপড়ের কথা শুনেছি যার ৫৪ পাউণ্ড ওজনের মধ্যে ২ পাউণ্ডই আঠা। কাপড় ছিল রপ্তানির জন্য মামুলি শার্টের কাপড়। অন্যান্য প্রকারের কাপড়ে কখনো কখনো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আঠা যোগ করা হত; যার ফলে মিল-মালিক বড়াই করে বলতে পারত, এবং সত্য সত্য বলত যে, যে-সুতো দিয়ে সেই কাপড় বোনা হয়েছে, সেই সুতোর জন্য সে যা খরচ করেছে, তা থেকেও পাউণ্ড-পিছু কম টাকায় সে তা বিক্রি করে ধনী হচ্ছে।[১৮] কিন্তু কেবল ভিতরে মিল-মালিকের এবং বাইরে মিউনিসিপ্যালিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে, কেবল মজুরি হ্রাস ও কাজের অভাব থেকে, অনটন থেকে এবং বদান্যতা থেকে এবং লর্ড সভা ও কমন্স সভার প্রশস্তিবাচক বক্তৃতাগুলি থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় না। “তুলা দুর্ভিক্ষের দরুন গোড়াতেই যে দুর্ভাগা নারী-শ্রমিকেরা কর্মচ্যুত, তারা কিন্তু আজও যখন শিল্পে ঘটেছে পুনর্জাগরণ, কাজ রয়েছে প্রচুর, তখন তারা থেকে যায় সেই দুর্ভাগা শ্রেণীরই অন্তর্ভূক্ত, এবং থেকেও যাবে তাই। ‘বরো’-তে এখন এত যৌবনবতী বারবনিতা আছে, গত ২৫ বছরে যা আমি জানিনি।”[১৯]
