মিঃ গ্যাভস্টোনের প্রস্তাব অনুযায়ী কমন্স সভা, ১৮৬৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, নির্দেশ দেয় যে ১৮৩১ ও ১৮৬৬-র মধ্যে যুক্তরাজ্যে আমদানিকৃত এবং যুক্তরাজ্য থেকে রপ্তানিত সমস্ত রকমের খাদ্যশস্য ও আটা-ময়দার বিবরণী (রিটার্ণ) দাখিল করতে হবে। নিয়ে আমি উক্ত ফলাফলের একটি সংক্ষিপ্ত সংকলন দিলাম। আটা-ময়দার হিসাব দেওয়া হয়েছে শস্যের কোয়ার্টারের হিসাব।
দমকে দমকে সম্প্রসারণের যে বিপুল শক্তি কারখানা-ব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত এবং বিশ্বের বাজারের উপরে তার যে নির্ভরতা, তা অনিবার্যভাবেই প্রচণ্ড উৎপাদনের সূচনা করে, যার ফলে বাজারগুলি মাত্ৰাধিক দ্রব্যসামগ্রীতে ছাপিয়ে যায় এবং তখন শুরু হয় বাজারে সংকোচন এবং উৎপাদনের পঙ্গুতাসাধন। আধুনিক শিল্পের জীবন হয়ে ওঠে পরিমিত তৎপরতা, সমৃদ্ধি, অতি-উৎপাদন, সংকট ও অচলাবস্থার একটি পরম্পরা। শ্রমিকদের কর্মনিয়োগে এবং স্বভাবতই অস্তিত্বের অবস্থায়, মেশিনারি যে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে তা শিল্পচক্রের এই পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে হয়ে ওঠে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। একমাত্র সমৃদ্ধির পর্যায় ছাড়া, অন্যান্য পর্যায়ে ধনিকদের পরস্পরের মধ্যে প্রচণ্ড ভাবে চলে বাজারে প্রত্যেকের ভাগ পাবার জন্য সবচেয়ে সাংঘাতিক লড়াই। উৎপন্ন দ্রব্যটি কত সস্তা করা যায়, এই লড়াই তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে আনুপাতিক। এই লড়াই শ্রমশক্তির জায়গায় উন্নত মেশিনারি ও নোতুন উৎপাদন-পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দেয়, তা ছাড়াও প্রত্যেক শিল্প-চক্র এমন একটা পর্যায় আসে যখন পণ্যসামগ্রীকে আরো সস্তা করা জন্য শ্রমশক্তির মূল্যের নীচে মজুরি কমিয়ে আনার চেষ্টা হয়।[১০]
সুতরাং কারখানা-কর্মীর সংখ্যাবৃদ্ধির একটি আবশ্যিক শর্ত হল, কল-কারখানায় বিনিয়োজিত মূলধনের পরিমাণে অনুপাতের তুলনায় অধিকতর বেগে বৃদ্ধিসাধন। অবশ্য, এই বৃদ্ধি শিল্পচক্রের জোয়ার-ভাটা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। তা ছাড়া, তা কৃৎকৌশলগত অগ্রগতির দ্বারা নিরন্তর বাধাপ্রাপ্ত হয়যে অগ্রগতি এক সময়ে নোতুন। শ্রমিকের স্থান করে দেয়, অন্য সময়ে সত্য সত্যই পুরনো এমিকেরও স্থান কেড়ে নেয়। যান্ত্রিক শিল্পে এই গুণগত পরিবর্তনের ফলে কারখানা থেকে ক্রমাগত শ্রমিক ছাটাই হয় কিংবা নোতুন নিয়োগের স্রোতের মুখে কারখানার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। যেখানে বিশুদ্ধ মাত্রাগত সম্প্রসারণের ফলে কেবল কর্মচ্যুত লোকগুলির পুনর্নিয়োগেই হয় না, দলে দলে নোতুন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হয়। এইভাবে শ্রমিকেরা ক্রমাগত আহুত ও বিতাড়িত হয়, একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে তাড়া খায় এবং সেই সময়েই চলতে থাক নোতুন নিয়োগে নারী-পুরুষে, বয়সে ও দক্ষতায় অনবরত অদল-বদল।
কারখানা-কর্মীদের ভাগ্য সবচেয়ে ভালো ভাবে আঁকা যায় যদি আমরা ইংল্যাণ্ডের তুলা শিল্পের একটি দ্রুত সমীক্ষা করে ফেলি।
১৭৭০ সালের ১৮১৫ সাল পর্যন্ত এই শিল্পটি মন্দায় আক্রান্ত হয়েছিল বা অচলাবস্থায় নিপতিত হয়েছিল মাত্র ৫ বছরের জন্য। এই ৪৫ বছর কাল ইংরেজ শিল্পপতিরা ভোগ করত মেশিনারির উপরের এবং বিশ্বের বাজারগুলির উপরে একচেটিয়া অধিকার। ১৮১৫ থেকে ১৮২১ মন্দা; ১৮২২ এবং ‘২৩ তেজি; ১৮২৪ ট্রেড ইউনিয়ন-বিরোধী আইনের অবলুপ্তি, সর্বত্র কল-কারখানার বিরাট প্রসার; ১৮২৫ সংকট; ১৮২৬ কারখানা-শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক দুর্দশা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা; ১৮২৭ অবস্থার সামান্য উন্নতি; ১৮২৮ পাওয়ারলুমের এবং রপ্তানি-পরিমাণের বিরাট বৃদ্ধি; ১৮২৯ রপ্তানি, বিশেষ করে ভারতে রপ্তানি, ছাড়িয়ে যায় পূর্ববর্তী সমস্ত বছরকে; ১৮৩০ পরিপ্লাবিত বাজার, দারুণ দুর্গতি; ১৮৩১ থেকে ১৮৩৩ একটানা মন্দা, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারত ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চালাবার একটি অধিকার প্রত্যাহার; ১৮৩৪ কারখানা ও মেশিনারির বিপুল বৃদ্ধি, শ্রমিক-স্বল্পতা। নোতুন গরিব আইন’-এর ফলে কৃষি-শ্রমিকদের কারখানায় অভিপ্রয়াণ আরো বৃদ্ধি। মফস্বলের অঞ্চলগুলি থেকে শিশু উধাও। শ্বেতাঙ্গ দাস-ব্যবসা; ১৮৩৫ দারুণ সমৃদ্ধি একই সময়ে হাতে-চালানো তাঁতের তাঁতীদের অনাহার; ১৮৩৬ দারুণ সমৃদ্ধি, ১৮৩৭ ও ১৮৩৮ মন্দা ও সংকট; ১৮৩৯ পুনর্জাগরণ; ১৮৪৭ দারুণ মন্দা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সৈন্য তলব; ১৮৪১ ও ৪২ কারখানা-শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ দুর্গতি; ১৮৩৩ শত আইন’-এর প্রত্যাহার সকলে কার্যকরী করার জন্য কল-কারখানায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তালা বন্ধ (লক-আউট’ )। ল্যাংকাশায়ার ও ইয়র্কশায়ার শহর হাজার হাজার শ্রমিকদের প্রবাহ সামরিক বাহিনীর দ্বারা প্রতিহত এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে ল্যাংকাশায়ায়ারে বিচারের জন্য উপস্থাপিত; ১৮৪৩ দারুণ দুর্দশা; ১৮৪৪ পুনর্জাগরণ; ১৮৪৫ বিপুল সমৃদ্ধি; ১৮৪৬ গোড়ার দিকে ক্রমাগত উন্নতি, তারপরে প্রতিক্রিয়া। শস্য আইন প্রত্যাহার; ১৮৪৭ ‘বড়া খানা’-র প্রতি সম্মানার্থে শতকরা দশ বা ততোধিক হারে মজুরি ছাটাই, ১৮৪৮ ক্রমাগত মা; সামরিক প্রহরাধীনে ম্যাঞ্চেস্টার; ১৮৪৯ পুনর্জাগরণ; ১৮৫ . সমৃদ্ধি, ১৮৫১ পড়তি দাম, কমতি মজুরি, ঘন ঘন ধর্মঘট; ১৮৫২ উন্নতির সূচনা, ধর্মঘট অব্যাহত, মালিকদের দ্বারা বিদেশী মজুর আমদানির হুমকি; ১৮৫৩ রপ্তানি বৃদ্ধি। ৮ মাস ধর্মঘট, প্রেস্টনে দারুণ দুর্গতি; ১৮৫৪ বিপুল সমৃদ্ধি, পরিপ্লাবিত বাজার; ১৮৫৫ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও প্রাচ্যের বাজারগুলি থেকে ক্রমাগত ব্যর্থতার সংবাদ; ১৮৫৬ বিপুল সমৃদ্ধি; ১৮৫৭ সংকট; ১৮৫৮ উন্নতি; ১৮৫৯ বিপুল সমৃদ্ধি কল-কারখানায় অগ্রগতি; ১৮৬০ ইংল্যাণ্ডের তুলো শিল্পে উন্নতির চুড়ান্ত, ভারত অস্টেলিয়া ও অন্যান্য বাজার এমন পণ্য-প্লাবিত যে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত তা সব পরিভুক্ত হয়নি; ফরাসী বানিজ্য চুক্তি কারখানা ও মেশিনারির বিরাট বাড় বাড়ন্ত; ১৮৬১ কিছু কাল পর্যন্ত সমৃদ্ধি, তারপরে প্রতিক্রিয়া, আমেরিকার গৃহযুদ্ধ; তুলা-দুর্ভিক্ষ; ১৮৬২ থেকে ১৮৬৩ সম্পূর্ণ বিপর্যয়।
