যাই হোক, বিপুল কর্মীসংখ্যা কৰ্মচ্যুত ও কার্যত মেশিনের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও, আমরা বুঝতে পারি যে, একটি নির্দিষ্ট শিল্পে আরো কল-কারখানা নির্মাণ এবং পুরনো কল-কারখানাগুলির সম্প্রসারণের মাধ্যমে, কারখানা-শ্রমিকের সংখ্যা ম্যানুফ্যাকচার ও হস্তশিল্প থেকে কর্মচ্যুত শ্রমিক-সংখ্যা থেকে আরো বহুলতা লাভ করতে পারে। দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক, পুরনন উৎপাদন-পদ্ধতিতে, প্রতি সপ্তাহে ৫০০ পাউণ্ড করে বিনিয়োগ করা হয়, যার দুই-পঞ্চমাংশ স্থির মূলধন এবং বাকি তিন-পঞ্চমাংশ অস্থির মূলধন অর্থাৎ ২০০ পাউণ্ড খাটানো হচ্ছে উৎপাদনের উপায়ে এবং ৩০০ পাউণ্ড, ধরুন, মাথাপিছু ১ পাউণ্ড হিসাবে, শ্রমশক্তিতে। মেশিনারি প্রবর্তনের সঙ্গে, এই সঙ্গে এই অনুপাতটি পরিবর্তিত হয়ে যায়। আমরা ধরে নেব যে তখন চার-পঞ্চমাংশ হবে স্থি মূলধন এবং এক-পঞ্চমাংশ অস্থির মূলধন, যার মানে এখন মাত্র ১০০ পাউণ্ড লাগানো হয় শ্রম-শক্তির বাদে। কাজে কাজেই দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক সংখ্যার কর্মচ্যুতি ঘটে। এখন যদি ব্যবসা বিস্তার লাভ করে এবং বিনিয়োজিত মূলধন বেড়ে দাড়ায় ১,৫০০ পাউণ্ড, অথচ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তা হলে নিযুক্ত শ্রমিক সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়াবে ৩০০-মেশিনারি প্রবর্তনের আগে যা ছিল ঠিক সেই সংখ্যায়। যদি মূলধন আরো বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২,০০ পাউণ্ড, তা হলে নিযুক্ত শ্রমিক-সংখ্যা হবে ৪ ০ ০ অর্থাৎ আগেকার ব্যবস্থায় যা ছিল, তার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। তথ্যের দিক থেকে, তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেবল আপেক্ষিক ভাবে; অর্থাৎ আগাম-খাটানো মূলধনের হিসাবে তাদের সংখ্যা ৮০০ জন হ্রাস পেয়েছে, কেননা আগেকার অবস্থা বজায় থাকলে ২০০০ পাউণ্ড মূলধন নিযুক্ত করত ৪০০ জনের জায়গায় ১২০০ জন। অতএব, শ্রমিকসংখ্যায় আপেক্ষিক হ্রাস এবং বাস্তবিক বৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। উপরে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে, যখন মোট মূলধন বাড়ে, তখন তার গঠন-বিন্যাস একই থাকে, কেননা উৎপাদনের অবস্থাবলী অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, মেশিনারির ব্যবহারে প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে মূলধনের স্থির উপাদানটি যে অংশটি গঠিত হয় মেশিনারি, কাচামাল ইত্যাদি দিয়ে, সেই অংশটি—বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়; অন্য দিকে, অস্থির উপাদানটি—যে অংশটি ব্যয়িত হয় শ্রমশক্তি বাবদে, সেই অংশটি হ্রাস-প্রাপ্ত হয়। আমরা আরো জানি, কারখানা ব্যবস্থার মত অন্য কোন উৎপাদন ব্যবস্থায় উন্নয়ন এত নিরবচ্ছিন্ন নয় এবং বিনিয়োজিত মূলধনের গঠন-বিন্যাসও এত নিরন্তর পরিবর্তনশীল নয়। অবশ্য, এই পরিবর্তনগুলি কিছুকাল অন্তর-অন্তর বাধাপ্রাপ্ত হয় সাময়িক বিশ্রামের দ্বারা, যখন উপস্থিত কৃৎকৌশলগত ভিত্তির উপরেই কারখানা গুলির কেবল মাত্রাগত সম্প্রসারণই ঘটে। এই ধরনের সময়কালে শ্রমিকদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে। যেমন, ১৮৩৫ সালে যুক্তরাজ্যে তুলল, উল, পশম, শণ ও রেশম কারখানাগুলিতে মোট শ্রমিক-সংখ্যা ছিল মাত্র ৪,৪৪,৬৮৪, যেখানে ১৮৩১ সালে একমাত্র পাওয়ারলুম তন্তুবায়দের নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে ও আট বছর থেকে উপরের দিকে সব বয়সের কর্মী-সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২,৪০,৬৫৪। নিশ্চয়ই, এই বৃদ্ধির গুরুত্ব কমে যায় যখন আমরা মনে করি যে, ১৮৩৮ সালে তখনো হস্তচালিত তাঁতে নিযুক্ত তন্তুবায়দের সপরিবারে সংখ্যা ছিল ৮,০০,০০০;[৫] এশিয়ায় ও ইউরোপীয় ভূখণ্ডে যাদের কাজ থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, তাদের কথা নাইবা উল্লেখ করলাম।
এই প্রসঙ্গে আমার যে-সামান্য কটি মন্তব্য এখনো বাকি আছে, সেগুলিতে আমি সত্য সত্যই বর্তমান আছে এমন কয়েকটি সম্পর্কের উল্লেখ করব—যে সম্পর্ক-সমূহের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত আমাদের অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়নি।
যতকাল পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট শিল্প-শাখায়, কারখানা-ব্যবস্থা আত্ম-বিস্তার করে পুরনো হস্তশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারের বিনিময়ে, ততকাল পর্যন্ত তার ফল হয় একদিকে বন্দুক-কামানসজ্জিত সেনাবাহিনী এবং অন্যদিকে তীর-ধনুকে সজ্জিত সেন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষেরই অনুরূপ। এই প্রথম যুগটি, যখন মেশিনারি তার কর্মক্ষেত্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে—এই যুগটি চুড়ান্ত গুরুত্বপুর্ণ, কেননা তা অসাধারণ পরিমাণে মুনাফা অর্জনে সাহায্য করে। এই মুনাফা যে কেবল দ্রুতগতি সঞ্চয়নের উৎস গড়ে তোলে, তাই নয়, সেই সঙ্গে, নিরন্তর সৃষ্টি হচ্ছে যে সামাজিক মূলধন এবং যা খুজে বেরোচ্ছে নতুন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র, তার বৃহত্তর অংশটিকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসে উৎপাদনের অনুকূল ক্ষেত্রে। প্রথম যুগের এই ক্ষিপ্র ও প্রচণ্ড তৎপরতার বিশেষ সুবিধাগুলি অনুভূত হয় মেশিনারি কর্তৃক আক্রান্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে। যখন কারখানা-ব্যবস্থা দাড়াবার মত প্রশস্ত ভিত্তি পেয়ে গিয়েছে এবং একটা নির্দিষ্ট মাত্রার পরিপক্কতা লাভ করেছে, বিশেষ করে, যখন তার নিজের কারিগরি ভিত্তি যে মেশিনারি, সেই মেশিনারি নিজেই উৎপাদিত হচ্ছে মেশিনারির দ্বারা, যখন কয়লা খনন ও লৌহ খননে, ধাতব শিল্পসমূহ এবং পরিবহণ-ব্যবস্থায় ঘটে গিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন; সংক্ষেপে, যখন আধুনিক শিল্পের দ্বারা উৎপাদনের জন্য আবশ্যক অবস্থাগুলি তৈরি হয়ে গিয়েছে, তখনি এই উৎপাদন পদ্ধতি এমন একটা প্রসারণশীলতা, লাফে লাফে আচমকা বিস্তারলাভের এমন একটা ক্ষমতা অর্জন করে যে, তার পথে কাঁচামালের সরবরাহে এবং উৎপন্ন সম্ভারের বিক্রি-বন্দেজ ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে কোনো বাধা থাকে না। একদিকে মেশিনারির আশু ফল হয় কাঁচামালের সরবরাহ বৃদ্ধি করা, যেমন কটন জিন বৃদ্ধি করেছিল কটনের উৎপাদন।[৬] অপরদিকে মেশিনারির দ্বারা উৎপাদিত জিনিসের সস্তায় সুলভতা এবং পরিবহণ ও যোগাযোগের উপায়সমূহের উন্নতি যোগায় বিদেশী বাজার জয় করার হাতিয়ার। অন্যান্য দেশের হস্তশিল্প-উৎপাদনকে ধ্বংস করে দিয়ে, মেশিনারি তাদের বলপূর্বক রূপান্তরিত করে কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে। এই ভাবেই ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল গ্রেট ব্রিটেনের জন্য তুলা, পশম, শণ, পাটি ও নীল উৎপাদন করতে।[৭] যেসব দেশে আধুনিক শিল্প শিকড় গেড়েছে, সেসব দেশে কর্মীসংখ্যার একাংশকে তা চিরকাল “অনুপুরক” হিসাবে দেশান্তরী হতে এবং বিদেশের ভূখণ্ডগুলিতে উপনিবেশ স্থাপন করতে প্রেরণা যোগায়, যে-ভূখণ্ডগুলি তার ফলে রূপান্তরিত হয় মূলদেশটির জন্য কাঁচামাল উৎপাদনের উপনিবেশে, ঠিক যেমন, নমুনা হিসাবে, অস্ট্রেলিয়া রূপান্তরিত হয়েছিল উল উৎপাদনের উপনিবেশে।[৮] একটি নোতুন ও আন্তর্জাতিক শ্রম-বিভাগের, আধুনিক শিল্পের প্রধান কেন্দ্রের প্রয়োজন সমূহের পক্ষে উপযোগ এমন এক শ্রম-বিভাগের, উদ্ভব ঘটে এবং ভূমণ্ডলের একটি অংশকে রূপান্তরিত করে প্রধানত কৃষি-উৎপাদনের ক্ষেত্রে যার কাজ হবে ভূমণ্ডলের অন্য অংশটিকে—যা থেকে যায় শিল্প-প্রধান, সেই অংশটিকে কাঁচামালের মোগান দেওয়া। এই বিল্পব যুক্ত হয় কৃষিতে আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে, যে সম্পর্কে এখানে আমরা আর অনুসন্ধান চালাব না।[৯]
